Monday, January 12, 2015

“তাওবা” - ইছলাহে নফস ও আত্মসংশোধনের প্রথম সিঁড়ি



শয়তান মানুষের মনে এই দুশ্চিন্তা ঢেলে দিয়ে তার সামনে তাওবার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেয় যে, তুমি তো মারদূদ হয়ে গেছো! তুমি তো এত বেশী গোনাহ করেছো এবং এত জঘন্য নাফরমানি করেছো যে, এখন তোমার নাজাতের কোন উপায় নেই। সুতরাং বাকি জীবন গোনাহ থেকে বেঁচে থেকে আর কী লাভ, তার চেয়ে যত পারো ভোগ-উপভোগ করে নাও।
আল্লাহ তাআলা তো কোরআন শরীফে পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন-

قل ياعبادي الذين أسرفوا على أنفسهم لا تقنطوا من رحمة الله إن الله يغفر الذنوب جميعا إنه هو الغفور الرحيم

অর্থাৎ বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা যুমারঃ ৫৩)

মাশায়েখ ও বুযুর্গানে দ্বীনের তরীকা এটাই যে, আল্লাহ তাআলা যখন কাউকে নিজের ইছলাহ ও সংশোধনের ফিকির দান করেন আর সে ইছলাহের নিয়তে তাদের খেদমতে  হাযির হয় তখন প্রথমেই তারা তাকে তাওবার তালকীন করেন, যেন সে খাঁটি তাওবার মাধ্যমে পিছনের সমস্ত গোনাহের নাজাসাত ও গান্দেগি থেকে নিজেকে পাকছাফ করে নেয়।


♦♦♦ তাওবার প্রকারভেদঃ

তাওবা দুপ্রকারঃ ইজমালি তাওবা ও তাফসীলি তাওবা।

ইজমালি তাওবাঃ ইজমালি তাওবা হলো একসঙ্গে পিছনের সমস্ত গোনাহ থেকে তাওবা করা। অর্থাৎ প্রথমে দুরাকাত ছালাতে তাওবাপড়ে এভাবে দুআ করবে, ‘হে আল্লাহ! জীবনে আমার যত গোনাহ হয়েছে, যত ভুল-ভ্রান্তি ও পদস্খলন ঘটেছে, সমস্ত কিছু থেকে আমি আপনার কাছে মাফ চাই। হে আল্লাহ, আমি তাওবা করছি, ইসতিগফার করছি, এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করছি যে, বাকি জীবনে কখনো কোন গোনাহ করবো না। আপনি কবুল করুন এবং তাওফীক দান করুন, আমীন।এটা হলো ইজমালি তাওবা, যা ইছলাহে নফসের প্রথম কাজ।

তাফছীলি তাওবাঃ অর্থাৎ প্রতিটি গোনাহ থেকে আলাদা আলাদা তাওবা করা। এই তাওবার নিয়ম এই যে, যে গোনাহ থেকে তাওবা করা হচ্ছে যদি তার ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হয় তাহলে তার ক্ষতিপূরণ করতে হবে। যেমন কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে; এখন ক্ষতিপূরণ না করে বসে বসে তাওবা করছে। তো এমন তাওবা কীভাবে কবুল হতে পারে! আগে তো পয়সা ফেরত দিতে হবে,  কিংবা যার পয়সা তার কাছ থেকে মাফ নিতে হবে, তারপর তাওবা  করতে হবে। এটা হচ্ছে হুকূকুল ইবাদ বা বান্দার হক থেকে তাওবা করার  বিষয়। আল্লাহর হক থেকে তাওবা করা সম্পর্কেও একই কথা। যেমন কেউ যাকাত আদায় করেনি। তো যেহেতু পিছনের যাকাত আদায় করার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব সেহেতু  যাকাত আদায় না করে শুধু তাওবা করলে তা কবুল হওয়ার কথা নয়। তদ্রূপ যদি  নামায-রোযা কাযা হয়ে থাকে,  আগে সেগুলোর কাযা আদায় করো, তারপর তাওবা করো। এখন তো এমন মাসআলা খুব শোনা যায় যে,  উমরী কাযা বলে কোন কিছু নেই। এটা ভূল।

অছিয়ত করে যাওয়াঃ নামায, রোযা ও যাকাতের অছিয়ত করে যাওয়া।  অর্থাৎ পিছনের জীবনে কত নামায, রোযা ও যাকাত কাযা হয়েছে তার সঠিক হিসাব, কিংবা সতর্কতার সঙ্গে আনুমানিক হিসাব খাতায় লিখবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে তা আদায় করা শুরু করবে। তারপর তা কতটুকু আদায় হয়েছে সে হিসাবও লিখতে থাকবে এবং এভাবে ওছীয়ত লিখে  রাখবে যে, আমার যদি মউত এসে যায় তাহলে বাকিটুকুর  ফিদয়া যেন আমার সম্পত্তি  থেকে আদায় করা হয়।  যদি ওছীয়ত করে না যায় তাহলে অঢেল সম্পদ রেখে গেলেও ওয়ারিছদের উপর ফিদয়া আদায় করা ওয়াজিব হবে না। ওছীয়ত করে গেলেই শুধু ওয়াজিব হবে, সেটাও শুধু সম্পত্তির একতৃতীয়াংশের ভিতরে। এর বাইরে ওছীয়ত কার্যকর হবে না।
ইছলাহে নাফস ও আত্মসংশোধনের জন্য কেউ যখন নিজেকে শায়খের হাতে সোপর্দ করে তখন তাকে দিয়ে ইজমালি ও তাফছীলি এদুটি তাওবা করানো হয়।

******
******

♦♦♦ তওবার পর পুনরায় গোনাহঃ 

কোরআন কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ

নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন। (সূরা বাক্বারাহঃ ২২২)
এখানে আল্লাহ তাআলা তাওয়াবীনবলেছেন, যার অর্থ হলো বারবার তাওবাকারী এবং বেশী বেশী তাওবাকারী। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বারবার তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।
আলোচ্য আয়াতের তাওয়াবীনশব্দটিই প্রমাণ করে যে, তোমার কাছে শরীয়াতের দাবী এই যে, তুমি নিজের পক্ষ থেকে মযবূত তাওবা করো, তারপর তাওবার উপর অবিচল থাকার পূর্ণ চেষ্টা করো। পরিপূর্ণ চেষ্টার পরো যদি তোমার পদস্খলন  ঘটে, এবং তা ঘটতেই পারে, তখন তুমি হতাশ হয়ো না এবং হিম্মতহারা হয়ো না, বরং আবার তাওবা করে আল্লাহর কাছে ফিরে এসো। তাওবা মানেই তো ফিরে আসা। সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, ‘আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের ভালোবাসেন যারা বারবার পথ থেকে বিচ্যুত হয়েও আল্লাহরই কাছে ফিরে আসে।


♦♦♦ পিছনের গোনাহ স্মরণ হলেঃ

হযরত হাকীমুল উম্মত (রাহ) দুটি বিষয় এরশাদ করেছেন।

প্রথমঃতাওবাতুন-নাছূহকরার পর সেই গোনাহ বারবার  মনে পড়তে থাকে এবং ঐ দৃশ্য কল্পনায় আসতে থাকে। এসম্পর্কে হযরত বলেন, জেনেবুঝে ইচ্ছা করে পিছনের গোনাহ স্মরণ করা তো অন্যায়। না,  ইচ্ছা করে কখনো  পিছনের গোনাহ স্মরণ করবে না, এমনকি আবার তাওবা করার নিয়তেও তা মনে আনবে না।

দ্বিতীয়ঃ আর যদি নফসের লয্যতের উদ্দেশ্যে পিছনের গোনাহ কল্পনা করে যে, তখন এমন স্বাদ ও আনন্দ হয়েছিলো, তাহলে তো সেটা খুবই খতরনাক। হাঁ, অনিচ্ছায় যদি গোনাহ মনে পড়েই যায় তখন এভাবে আবার তাওবা ইস্তেগফার করে নেবে-আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বী মিন কুল্লি যাম্বিন ওয়া আতূবু ইলাইহি’ ‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আস্তাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইকাকারণ

(১) পিছনের গোনাহের অনিচ্ছাকৃত চিন্তার জন্য আল্লাহর দরবারে কোন পাকড়াও নেই, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে গোনাহের কল্পনা করাও বিরাট গোনাহ! তো এই ভয়ে সে আবার তাওবা করছে। এজন্য নয় যে, আগের তাওবা কবুল হওয়ার ইয়াকীন তার দিলে নেই। কারণ, তাওবা-ইস্তিগফার করার সময় আল্লাহর রহমতের কাছে এটাই আশা করা চাই যে, ইনশাআল্লাহ আমার তাওবা কবুল হয়েছে। তাওবার কবুলিয়াতের বিষয়ে সন্দিহান হওয়া কিছুতেই উচিত নয়।

(২) নতুন তাওবা করার আরেকটি হিকমত এই যে, বিগত গোনাহের চিন্তা-কল্পনা বারবার মনে আসার কারণে আবার তাতে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সে পুনঃ তাওবা-ইস্তিগফার করছে এ আশায় যে, এর বরকতে আল্লাহ তাআলা তাকে হিফাযত করবেন।

******

******
তথ্যসূত্রঃ
মাসিক আল-কাউসার

No comments:

Post a Comment