১৭
রমজান। ইসলামের প্রথম
ফায়সালাকারী "বদর
যুদ্ধ" দ্বিতীয়
হিজরীর এই দিনে
অনুষ্ঠিত হয়। আসুন,
বদর যুদ্ধ সম্পর্কে
কিছু জেনে নিই....
কোরায়েশদের সর্দার আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি ব্যাবসায়ী কাফেলা সিরিয়া হতে মদিনার পাশ দিয়ে মক্কা ফিরছিল। এক হাজার উটের এই কাফেলায় পঞ্চাশ হাজার দিনার মূল্যের বিভিন্ন ব্যাবসায়িক পণ্য ছিল যা দুইশত সাড়ে বাষট্টি কিলোগ্রাম স্বর্ণের তুল্য। অথচ এই মালের রক্ষক মাত্র চল্লিশজন! এই মাল হারানো মক্কাবাসীদের জন্য ছিলো সামরিক, রাজনৈতিক বিশেষত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট ক্ষতির কারণ এবং মুসলমানদের জন্য কল্যাণের।
রাসুলুল্লাহর সা. -এর কাছে যখন এই খবর পৌছল তিনি বললেন, "এই কাফেলার উদ্দেশে তোমরা বেরিয়ে পড়।" রাসুলুল্লাহর এই আদেশ বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই অনেকেই এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন নাই।
"মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা এবং দায়িত্বভার"
৩১৩ জন বা কিছু বেশি সাহাবীদের এই কাফেলায় ছিল ৭০টি উট এবং দুইটি ঘোড়া। তাঁদের ৮২ বা কিছু বেশি ছিলেন মুহাজির আর অবশিষ্ট সকলেই আনসার সাহাবী। মদিনায় ইমাম হিসেবে নিযুক্ত করা হয় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাখতুম এবং পরবর্তীতে আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মানজারকে রা.। যুদ্ধক্ষেত্রে আনসার দলের পতাকাবাহী ছিলেন সাদ ইবনে মুআয এবং মুহাজির দলের পতাকাবাহী ছিলেন আলী রা.। উভয় দলের পতাকা বহন করেছিলেন মাছআব ইবনে উমায়র আবেদীন রা.। সেনাবাহিনীর ডান বাহুর অধিনায়ক ছিলেন জোবায়ের ইবনে আওয়াম এবং বাম বাহুর অধিনায়ক ছিলেন মেকদাদ ইবনে আমর রা.। এই দুজন ছিলেন সমগ্র বাহিনীতে সর্বাধিক যুদ্ধবিশারদ। কায়েস ইবনে আবু সাআ ছিলেন অন্যতম অধিনায়ক এবং সর্বাধিনায়ক ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
বদর অভিমুখে অগ্রগমন
মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে রাসুলুল্লাহ সা. আট বা ১২ই রমজানে মক্কার পথে রওনা হলেন। নাযিরাহ, রাহকান উপত্যকা অতিক্রম করে সাফরার পথে দাররাহ প্রান্তরে উপনীত হলেন। অতঃপর জুহাইনা গোত্রের দুই ব্যক্তিকে কোরায়েশ কাফেলার খবর নিতে বদর প্রান্তরে পাঠিয়ে দিলেন।
আবু সুফিয়ান খুবই সতর্কতার সাথে পথ চলছিল। প্রতিটি কাফেলার নিকট সে পথের খোঁজখবর নিত। সে মুসলমানদের হামলার খবর পেয়ে গেল এবং জামজাম ইবনে আমর গিফারীকে অনেক অর্থের বিনিময়ে সাহায্য চেয়ে মক্কা প্রেরণ করল। সে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মক্কা পৌঁছে আরবরীতি অনুসারে সাহায্য পার্থনা করল।
এই বিপদজনক সংবাদ শোনে মক্কার প্রভাবশালী লোকজন একত্র হল। অল্প সময়ের মধ্যে প্রত্যেকটি সক্ষম লোক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। বনু আদী ব্যতীত পার্শ্ববর্তী সকল গোত্রের যুবকদেরও সৈন্য দলে ভর্তি করা হল। একশত ঘোড়া, ছয়শত লৌহবর্ম, অগনিত উট এবং তেরোশত যোদ্ধা বদর অভিমুখে রওনা হল। তাদের নেতা ছিল আবু জেহেল। নয়জন বাবুর্চি ঠিক করা হল এবং প্রতিদিন নয়টি বা দশটি উট জবেহ করা হত।
এদিকে আবু সুফিয়ান বদরের নিকট পৌছে উটের মল এবং তাতে খেজুরের বীচি পরীক্ষা করে বুঝল মুসলিম বাহিনী আশপাশেই আছে। সে বদর বামে রেখে সমুদ্র ঘেষে মক্কার রাস্তা ধরল এবং যখন কোরায়েশ যুহফা নামক স্থানে পৌছল তখন আবু সুফিয়ানের নিকট হতে খবর আসল, আমরা নিরাপদে আছি তোমরা মক্কায় ফিরে যাও।
কিন্তু আবু জেহেল অহংকার করে বলল, আমরা বদরে তিনদিন অবস্থান করে তবেই মক্কা যাব। আখরাস ইবনে সুরাইক তার তিনশত সৈন্য নিয়ে মক্কায় ফিরে আসল এবং আবু জেহেল এক হাজার সৈন্য নিয়ে বদরের পথ ধরল। অতঃপর তারা বদরের দক্ষিণে একটি টিলার পাশে তাঁবু স্থাপন করল।
এই খবর রাসুলুল্লাহ সা. শোনে একটি পরামর্শ সভা ডাকলেন। কী নিশ্চয়তা আছে তারা মদিনায় আক্রমণ করবে না! মুহাজির, আনসার এবং বিশিষ্ট সাহাবাদের সাহসী বক্তৃতায় রাসুলুল্লাহ সা. সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
রাসুলুল্লাহ সা. নিজে এবং আবু বকর রা. কোরায়েশদের খবরাখবর নিতে গোপনে বের হলেন এবং পরবর্তীতে অন্য তিনজনকে পাঠালেন। তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পেলেন।
সেই রাতে খুব বৃষ্টি হল যা মুসলমানদের জন্য ছিল রহমত এবং কোরায়েশদের জন্য গজব। এরপর রাসুলুল্লাহ সা. সবাইকে নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং সঙ্কীর্ণ একটি জায়গায় পৌঁছলেন। অতঃপর হাকাম ইবনে মুনযিরের পরামর্শে রাত্রের মাঝামাঝি সময়ে শত্রুদের নিকটবর্তী জলাশয়ের কাছে পৌছে তাঁবু খাটালেন। সাহাবাগণ হাউজ তৈরি করে জলাশয় বন্ধ করে দিলেন।
সাদ ইবনে মুআয রা. -এর পরামর্শে যুদ্ধ ক্ষেত্রের উত্তর-পূর্ব দিকে রাসুলুল্লাহ সা. -এর জন্য তাঁবু খাটানো হল। এবং তার নেতৃত্বে একটি দল রাসুলুল্লাহর পাহারায় নিযুক্ত হল।
সেনাবিন্যাস করে রাসুলুল্লাহ সা. রণাঙ্গনে এসে আঙ্গুলের ইশারায় দেখাচ্ছিলেন, এখানে অমুক নিহত হবে এখানে অমুক। অতঃপর তিনি একটি গাছের শিকড়ের নিকট এসে রাত যাপন করেন। আল্লাহর বিশেষ ওয়াদার কথা স্মরণ করে সাহাবারাও প্রশান্তির সাথে রাত অতিবাহিত করেন। এই রাতটিই ১৭ই রমজান।
প্রত্যুষে কোরায়েশের একদল পানি পান করতে হাওজের নিকট আসল। রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, বাঁধা দিও না। পরবর্তীতে দেখা গেল তাদের একজন ছাড়া সবাই এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে।
এদিকে কোরায়েশের গুপ্তচর সব দেখে যুদ্ধবিরোধী মত প্রকাশ করল। আরও কয়েকজন নেতা তার সাথে একমাত্র পোষণ করল। কিন্তু আবু জেহেল যুদ্ধ করবে বলে অটল থাকল।
উভয় দল পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়াতে থাকল। রাসুলুল্লাহ সা. মুসলিম সৈনিকদের ব্যূহ রচনা করলেন। অতঃপর বললেন, শত্রুরা যখন দূর থেকে আসবে তোমরা তীর নিক্ষেপ করবে এবং যতক্ষণ না তোমাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে নেয় তরবারি চালাবে না। এবং আল্লাহর কাছে তার ওয়াদাকৃত সাহায্য পার্থনা করলেন। এদিকে আবু জেহেল আল্লাহর নিকট দুআ করল, আমাদের মধ্যে যে দল তোমার কাছে অধিক পছন্দের তাদেরকে সাহায্য করো।
সর্বপ্রথম কাফেরদের থেকে আসওয়াদ ইবনে আহাদ বের হয়ে আসল। হামযা রা. দুইবার আঘাত করে তাকে হত্যা করলেন।
ওতবা, শাইবা এবং অলিদ বের হয়ে আসল। মোকাবেলার আহ্বান জানাল। তিন আনসার অগ্রসর হলেন। তারা অস্বীকৃতি জানায়। রাসুলের নির্দেশে হামযা, আলী এবং ওবায়াদা ইবনে হারেস বের হন। কাফেরদের তিনও জন নিহত হয়। ওবায়দা রা. আহত হন।
যুদ্ধে পৌত্তলিকদের অমঙ্গলের সূচনা হল। দিশেহারা হয়ে তারা একযোগে হামলা শুরু করল। মুসলমানরা আল্লাহর সাহায্যে দৃঢ়তার সাথে পাল্টা আক্রমণ করলেন।
রাসুলুল্লাহ সা. দুআয় আত্মনিমগ্ন হলেন। "হে আল্লাহ, আজ মুসলমানদের এই দল নিশ্চিহ্ন হলে দুনিয়ায় তোমার ইবাদত করার কেউ থাকবে না। তুমি কি এটাই চাও?
আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, আমি তোমাদের সাথে আছি। তোমরা মুমিনদেরকে দৃঢ়পদ এবং অবিচল রাখ। কাফেরদের কাঁধে ও সর্বাঙ্গে আঘাত কর।
জিব্রাইল আ. একহাজার ফেরেশতা নিয়ে আসলেন। রাসুলুল্লাহ সা. বর্মাবৃত হয়ে অগ্রসর হলেন। অতঃপর এক মুঠ বালু কাফেরদের উদ্দেশে নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, ওদের মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন হোক।
রাসুলুল্লাহকে বর্মাবৃত দেখে সাহাবাদের মনোবল বৃদ্ধি পেল। তিনি সবাইকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী এবং ফেরেশতাগণ প্রচণ্ড বেগে কাফেরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের শত্রুব্যূহ তছনছ হয়ে গেল।
মাআয এবং মুআউয়িজ আবু জেহেলকে হত্যা করল।
যুদ্ধে উভয়পক্ষের হতাহতের সংখ্যা
বদর যুদ্ধ মুসলমানদের বিজয় এবং মুশরিকদের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। মুসলমানদের ১৪ জন ব্যক্তি শহীদ হন যাদের ছয়জন মুহাজির আটজন আনসার। মুশরিকদের সত্তরজন নিহত এবং সত্তরজন বন্দী হয়। এবং এদের সকলেই নেতৃস্থানীয় এবং গোত্রের সর্দার ছিল।
বদরের নোংরা একটি কূপে চব্বিশজন সর্দারের লাশ ফেলা হল। ফেরার পথে সেখানে দাঁড়িয়ে রাসুলুল্লাহ সা. তাদেরকে সম্বোধন করে কিছু কথা বলেছেন।
পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে মক্কার মুশরিকদের মন ভেঙে যায়। এর সাতদিন পর প্লেগ রোগে আবু লাহাব মারা যায়।
বিজয়ের সংবাদ পেয়ে মদিনাবাসীর মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় এবং মুনাফেকদের মুখে ভাঁজ পড়ে।
#আর_রাহিকুল_মাখতুম থেকে খুবই সংক্ষেপে এতটুকুই লেখালাম।
কোরায়েশদের সর্দার আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি ব্যাবসায়ী কাফেলা সিরিয়া হতে মদিনার পাশ দিয়ে মক্কা ফিরছিল। এক হাজার উটের এই কাফেলায় পঞ্চাশ হাজার দিনার মূল্যের বিভিন্ন ব্যাবসায়িক পণ্য ছিল যা দুইশত সাড়ে বাষট্টি কিলোগ্রাম স্বর্ণের তুল্য। অথচ এই মালের রক্ষক মাত্র চল্লিশজন! এই মাল হারানো মক্কাবাসীদের জন্য ছিলো সামরিক, রাজনৈতিক বিশেষত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট ক্ষতির কারণ এবং মুসলমানদের জন্য কল্যাণের।
রাসুলুল্লাহর সা. -এর কাছে যখন এই খবর পৌছল তিনি বললেন, "এই কাফেলার উদ্দেশে তোমরা বেরিয়ে পড়।" রাসুলুল্লাহর এই আদেশ বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই অনেকেই এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন নাই।
"মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা এবং দায়িত্বভার"
৩১৩ জন বা কিছু বেশি সাহাবীদের এই কাফেলায় ছিল ৭০টি উট এবং দুইটি ঘোড়া। তাঁদের ৮২ বা কিছু বেশি ছিলেন মুহাজির আর অবশিষ্ট সকলেই আনসার সাহাবী। মদিনায় ইমাম হিসেবে নিযুক্ত করা হয় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাখতুম এবং পরবর্তীতে আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মানজারকে রা.। যুদ্ধক্ষেত্রে আনসার দলের পতাকাবাহী ছিলেন সাদ ইবনে মুআয এবং মুহাজির দলের পতাকাবাহী ছিলেন আলী রা.। উভয় দলের পতাকা বহন করেছিলেন মাছআব ইবনে উমায়র আবেদীন রা.। সেনাবাহিনীর ডান বাহুর অধিনায়ক ছিলেন জোবায়ের ইবনে আওয়াম এবং বাম বাহুর অধিনায়ক ছিলেন মেকদাদ ইবনে আমর রা.। এই দুজন ছিলেন সমগ্র বাহিনীতে সর্বাধিক যুদ্ধবিশারদ। কায়েস ইবনে আবু সাআ ছিলেন অন্যতম অধিনায়ক এবং সর্বাধিনায়ক ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
বদর অভিমুখে অগ্রগমন
মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে রাসুলুল্লাহ সা. আট বা ১২ই রমজানে মক্কার পথে রওনা হলেন। নাযিরাহ, রাহকান উপত্যকা অতিক্রম করে সাফরার পথে দাররাহ প্রান্তরে উপনীত হলেন। অতঃপর জুহাইনা গোত্রের দুই ব্যক্তিকে কোরায়েশ কাফেলার খবর নিতে বদর প্রান্তরে পাঠিয়ে দিলেন।
আবু সুফিয়ান খুবই সতর্কতার সাথে পথ চলছিল। প্রতিটি কাফেলার নিকট সে পথের খোঁজখবর নিত। সে মুসলমানদের হামলার খবর পেয়ে গেল এবং জামজাম ইবনে আমর গিফারীকে অনেক অর্থের বিনিময়ে সাহায্য চেয়ে মক্কা প্রেরণ করল। সে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মক্কা পৌঁছে আরবরীতি অনুসারে সাহায্য পার্থনা করল।
এই বিপদজনক সংবাদ শোনে মক্কার প্রভাবশালী লোকজন একত্র হল। অল্প সময়ের মধ্যে প্রত্যেকটি সক্ষম লোক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। বনু আদী ব্যতীত পার্শ্ববর্তী সকল গোত্রের যুবকদেরও সৈন্য দলে ভর্তি করা হল। একশত ঘোড়া, ছয়শত লৌহবর্ম, অগনিত উট এবং তেরোশত যোদ্ধা বদর অভিমুখে রওনা হল। তাদের নেতা ছিল আবু জেহেল। নয়জন বাবুর্চি ঠিক করা হল এবং প্রতিদিন নয়টি বা দশটি উট জবেহ করা হত।
এদিকে আবু সুফিয়ান বদরের নিকট পৌছে উটের মল এবং তাতে খেজুরের বীচি পরীক্ষা করে বুঝল মুসলিম বাহিনী আশপাশেই আছে। সে বদর বামে রেখে সমুদ্র ঘেষে মক্কার রাস্তা ধরল এবং যখন কোরায়েশ যুহফা নামক স্থানে পৌছল তখন আবু সুফিয়ানের নিকট হতে খবর আসল, আমরা নিরাপদে আছি তোমরা মক্কায় ফিরে যাও।
কিন্তু আবু জেহেল অহংকার করে বলল, আমরা বদরে তিনদিন অবস্থান করে তবেই মক্কা যাব। আখরাস ইবনে সুরাইক তার তিনশত সৈন্য নিয়ে মক্কায় ফিরে আসল এবং আবু জেহেল এক হাজার সৈন্য নিয়ে বদরের পথ ধরল। অতঃপর তারা বদরের দক্ষিণে একটি টিলার পাশে তাঁবু স্থাপন করল।
এই খবর রাসুলুল্লাহ সা. শোনে একটি পরামর্শ সভা ডাকলেন। কী নিশ্চয়তা আছে তারা মদিনায় আক্রমণ করবে না! মুহাজির, আনসার এবং বিশিষ্ট সাহাবাদের সাহসী বক্তৃতায় রাসুলুল্লাহ সা. সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
রাসুলুল্লাহ সা. নিজে এবং আবু বকর রা. কোরায়েশদের খবরাখবর নিতে গোপনে বের হলেন এবং পরবর্তীতে অন্য তিনজনকে পাঠালেন। তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পেলেন।
সেই রাতে খুব বৃষ্টি হল যা মুসলমানদের জন্য ছিল রহমত এবং কোরায়েশদের জন্য গজব। এরপর রাসুলুল্লাহ সা. সবাইকে নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং সঙ্কীর্ণ একটি জায়গায় পৌঁছলেন। অতঃপর হাকাম ইবনে মুনযিরের পরামর্শে রাত্রের মাঝামাঝি সময়ে শত্রুদের নিকটবর্তী জলাশয়ের কাছে পৌছে তাঁবু খাটালেন। সাহাবাগণ হাউজ তৈরি করে জলাশয় বন্ধ করে দিলেন।
সাদ ইবনে মুআয রা. -এর পরামর্শে যুদ্ধ ক্ষেত্রের উত্তর-পূর্ব দিকে রাসুলুল্লাহ সা. -এর জন্য তাঁবু খাটানো হল। এবং তার নেতৃত্বে একটি দল রাসুলুল্লাহর পাহারায় নিযুক্ত হল।
সেনাবিন্যাস করে রাসুলুল্লাহ সা. রণাঙ্গনে এসে আঙ্গুলের ইশারায় দেখাচ্ছিলেন, এখানে অমুক নিহত হবে এখানে অমুক। অতঃপর তিনি একটি গাছের শিকড়ের নিকট এসে রাত যাপন করেন। আল্লাহর বিশেষ ওয়াদার কথা স্মরণ করে সাহাবারাও প্রশান্তির সাথে রাত অতিবাহিত করেন। এই রাতটিই ১৭ই রমজান।
প্রত্যুষে কোরায়েশের একদল পানি পান করতে হাওজের নিকট আসল। রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, বাঁধা দিও না। পরবর্তীতে দেখা গেল তাদের একজন ছাড়া সবাই এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে।
এদিকে কোরায়েশের গুপ্তচর সব দেখে যুদ্ধবিরোধী মত প্রকাশ করল। আরও কয়েকজন নেতা তার সাথে একমাত্র পোষণ করল। কিন্তু আবু জেহেল যুদ্ধ করবে বলে অটল থাকল।
উভয় দল পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়াতে থাকল। রাসুলুল্লাহ সা. মুসলিম সৈনিকদের ব্যূহ রচনা করলেন। অতঃপর বললেন, শত্রুরা যখন দূর থেকে আসবে তোমরা তীর নিক্ষেপ করবে এবং যতক্ষণ না তোমাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে নেয় তরবারি চালাবে না। এবং আল্লাহর কাছে তার ওয়াদাকৃত সাহায্য পার্থনা করলেন। এদিকে আবু জেহেল আল্লাহর নিকট দুআ করল, আমাদের মধ্যে যে দল তোমার কাছে অধিক পছন্দের তাদেরকে সাহায্য করো।
সর্বপ্রথম কাফেরদের থেকে আসওয়াদ ইবনে আহাদ বের হয়ে আসল। হামযা রা. দুইবার আঘাত করে তাকে হত্যা করলেন।
ওতবা, শাইবা এবং অলিদ বের হয়ে আসল। মোকাবেলার আহ্বান জানাল। তিন আনসার অগ্রসর হলেন। তারা অস্বীকৃতি জানায়। রাসুলের নির্দেশে হামযা, আলী এবং ওবায়াদা ইবনে হারেস বের হন। কাফেরদের তিনও জন নিহত হয়। ওবায়দা রা. আহত হন।
যুদ্ধে পৌত্তলিকদের অমঙ্গলের সূচনা হল। দিশেহারা হয়ে তারা একযোগে হামলা শুরু করল। মুসলমানরা আল্লাহর সাহায্যে দৃঢ়তার সাথে পাল্টা আক্রমণ করলেন।
রাসুলুল্লাহ সা. দুআয় আত্মনিমগ্ন হলেন। "হে আল্লাহ, আজ মুসলমানদের এই দল নিশ্চিহ্ন হলে দুনিয়ায় তোমার ইবাদত করার কেউ থাকবে না। তুমি কি এটাই চাও?
আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, আমি তোমাদের সাথে আছি। তোমরা মুমিনদেরকে দৃঢ়পদ এবং অবিচল রাখ। কাফেরদের কাঁধে ও সর্বাঙ্গে আঘাত কর।
জিব্রাইল আ. একহাজার ফেরেশতা নিয়ে আসলেন। রাসুলুল্লাহ সা. বর্মাবৃত হয়ে অগ্রসর হলেন। অতঃপর এক মুঠ বালু কাফেরদের উদ্দেশে নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, ওদের মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন হোক।
রাসুলুল্লাহকে বর্মাবৃত দেখে সাহাবাদের মনোবল বৃদ্ধি পেল। তিনি সবাইকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী এবং ফেরেশতাগণ প্রচণ্ড বেগে কাফেরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের শত্রুব্যূহ তছনছ হয়ে গেল।
মাআয এবং মুআউয়িজ আবু জেহেলকে হত্যা করল।
যুদ্ধে উভয়পক্ষের হতাহতের সংখ্যা
বদর যুদ্ধ মুসলমানদের বিজয় এবং মুশরিকদের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। মুসলমানদের ১৪ জন ব্যক্তি শহীদ হন যাদের ছয়জন মুহাজির আটজন আনসার। মুশরিকদের সত্তরজন নিহত এবং সত্তরজন বন্দী হয়। এবং এদের সকলেই নেতৃস্থানীয় এবং গোত্রের সর্দার ছিল।
বদরের নোংরা একটি কূপে চব্বিশজন সর্দারের লাশ ফেলা হল। ফেরার পথে সেখানে দাঁড়িয়ে রাসুলুল্লাহ সা. তাদেরকে সম্বোধন করে কিছু কথা বলেছেন।
পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে মক্কার মুশরিকদের মন ভেঙে যায়। এর সাতদিন পর প্লেগ রোগে আবু লাহাব মারা যায়।
বিজয়ের সংবাদ পেয়ে মদিনাবাসীর মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় এবং মুনাফেকদের মুখে ভাঁজ পড়ে।
#আর_রাহিকুল_মাখতুম থেকে খুবই সংক্ষেপে এতটুকুই লেখালাম।
No comments:
Post a Comment