Sunday, July 13, 2025

জুলফিকার আলি ভুট্টো ও সিমলা চুক্তি- মাওলানা আতিক উল্লাহ ২৯.০৪.২০২৫

 বিসমিল্লাহ

জুলফিকার আলি ভুট্টো ও সিমলা চুক্তি
—--
১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর, জুলফিকার আলি ভু্ট্টো পরাজিত, বিধ্বস্ত পাকিস্তানের শাসক হলেন। তখনো পাকিস্তানের কোনো সংবিধান ছিল না। সামরিক শাসনের নিয়ম মেনেই জেনারেল ইয়াহিয়া খান ভু্ট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। ভু্ট্টো হলেন চীপ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ও প্রেসিডেন্ট। সেই রাতে জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে ভুট্টো বলেছিলেন,
আমি শপথ করছি, বিভক্ত, দ্বিখণ্ডিত দেশকে এক করে নতুন পাকিস্তান গড়ব।
সদ্যগঠিত বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। ভু্ট্টোর খাহেশ ছিল যে কোনো ভাবেই হোক, আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে মিলিয়ে কনফেডারেশন (যুক্তরাজ্য) গঠন করে পাকিস্তানের ভাঙন ঠেকাবেন। ভুট্টো মসনদে বসেই শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করলেন। রাওয়ালপিন্ডির এক বাংলোতে এনে আলোচনা শুরু করলেন।
ভুট্টোর জীবনীকার স্ট্যানলি ঔলপোর্ট লিখেছে,
শেখ মুজিবকে ভু্ট্টো প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী যা ইচ্ছা হতে পারেন, পবিত্র কুরআন হাতে শপথ করছি, আপনাকে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে আমি রাজনীতি থেকে অবসরগ্রহণ করতে প্রস্তুত। এছাড়া শেখ মুজিবকে ৫০,০০০ ডলার দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভুট্টো। শেখ মুজিব উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কনফেডারেশন গঠনের ব্যাপারে শেখ মুজিব বলেছিলেন, বাংলাদেশে গিয়ে জনগণের সাথে কথা বলার পর সিদ্ধান্ত নিবেন।
শেখ মুজিব সরাসরি ঢাকায় আসতে পারেননি। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতের আকাশপথে পাকিস্তান-বাংলাদেশ ফ্লাইট চলাচল নিষিদ্ধ করেছিল ইন্ডিয়া। এজন্য পাক সরকার শেখ মুজিবকে লন্ডনে পাঠিয়েছিল। সেখান থেকে শেখ মুজিব যেখানে ইচ্ছা যেতে পারবে। ৮ জানুয়ারি রাতে শেখ মুজিবকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল। শেখ মুজিব লন্ডন থেকে প্রথমে দিল্লি তারপর ঢাকায় এসেছিল। ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিয়েছিল। কনফেডারেশনের প্রস্তাবও শেখ মুজিব প্রত্যাখ্যান করেছিল। মুজিব বলেছিল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে আর কোনো ধরণের সম্পর্ক থাকতে পারে না। সম্পর্ক চিরদিনের জন্য ভেঙে গেছে। পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব বলেছিল, আপনারা শান্তিতে থাকুন, আমাদেরও শান্তিতে থাকতে দিন।
কনফেডারেশন গঠনের উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর ভুট্টোর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ভারতের মাটিতে আটকে থাকা ৯৩ হাজার বন্দীকে মুক্ত করা ও ভারত অধিকৃত ভূমি উদ্ধার করা। ভুট্টো বন্দীমুক্তির বিষয়টি আপাতত স্থগিত রেখে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিলেন। ভুট্টো তার অর্থনৈতিক পলিসির নাম দিলেন-ইসলামিক সোশালিজম’। ভুট্টো প্রায়ই তার ভাষণে বলতেন, সোশালিজম ইসলামবিরোধী মতবাদ নয়। সোশালিজম আমাদের ধর্মবিশ্বাসবিরোধী নয়। ভুট্টোর ভাষায় সোশালিজম হল ‘মুসাওয়াতে মুহাম্মাদি’, মুহাম্মাদ সা.-এর আদর্শনির্ভর সামাজিক সাম্য। ভুট্টোর মতে, শিল্পকলকারখানা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি সরকারি কব্জায় অধিগ্রহণ করে, সবার মাঝে সমানভাবে বণ্টন করে দেয়া ইসলামী শিক্ষার অনুকূল। ইসলাম সমতার শিক্ষাই প্রদান করে। ইসলামিক সোশালিজম-এর স্লোগানের মাধ্যমে ভুট্টো মূলত সম্পদের জাতীয়করণ, শ্রমআইন ও ভূমিসংস্কার আইন ঘোষণা করেছিলেন। জাতীয়করণের ঘোষণা প্রথমবার ঘোষিত হয়েছিল ২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। এই ঘোষণার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বৃহৎ শিল্পকারখানায় পাকিস্তানের বিখ্যাত ২২ পরিবার একচেটিয়া মালিকানা ভেঙে দেয়া। সাবেক একনায়ক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তার অর্থনৈতিক পলিসি ২২ পরিবারকে ধনী থেকে ধনীতর করেছিল, বাকি জনগোষ্ঠী গরিব থেকে গরিবতর হয়ে চলছিল। ২২ পরিবারের মধ্যে ছিল দাউদ, সেহগাল, আদমজি, কলোনি, ফ্যান্সি, ওয়ালিকা, জলিল, বাওয়ানি, ক্রিসেন্ট, ওয়াজির আলি, গান্ধারা, ইসফাহানি, হাবিব, খাইবার, নিশাত, হাফিজ, বেকো, গুল আহমাদ, আরাগ, করিম, মিলওয়ালা, দাদা গ্রুফ।
এই বাইশ পরিবার পাকিস্তানের ৬৬% শিল্পকারখানা, ৮৭% ব্যাংকিং, ইনশুরেন্স নিয়ন্ত্রণ করত। প্রেসিডেন্ট ভু্ট্টো টেলিভিশন ভাসনে জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২২ পারিবারের একচেটিয়া ব্যবসায়িক সুবিধা ভাঙার জন্য, ১০-টি শ্রেনীতে ৩১-টি শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করেছিলেন। কারাখানাগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এসবের মধ্যে লোহা, স্টীল, অটোমোবাইল, কেমিক্যাল, সিমেন্ট, বিদ্যুত, গ্যাস, তেল পরিশোধনসহ অন্যান্য ভারী কলকারখানা শামিল ছিল। জেনারেল আইয়ুব খানের আত্মীয়ের গান্ধারা ইন্ড্রাস্ট্রি, শরিফ পরিবারের ইত্তেফাক ফাউন্ড্রিস, স্টীল মিল, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, হাবিব ব্যাংকও জাতীয়করণ করা হয়েছিল। ৪৩ টি ইনসুরেন্স কোম্পানিকে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। সর্বমোট ৩১ টি বড় শিল্পকারখানা, ১৩-টি ব্যাংক, ১০ টি শিপিং কোম্পানি, দুটি পেট্রোলিয়াম কোম্পানি জাতীয়করণ করা হয়েছিল। টেক্সটাইল ও ফুড ইন্ড্রাস্ট্রিকে জাতীয়করনের তালিকার বাইরে রাখা হয়েছিল। বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানিকেও জাতীয়করণ করা হয়নি। এছাড়া ধনী পরিবারগুলোর ২০০-টি পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। তাদেরকে গ্রেফতারির ভয় দেখিয়ে হুকুম দেয়া হয়েছিল, বিদেশে থাকা অর্থ পাকিস্তানে ফেরত আনতে। এই ব্যবস্থায় ঠিক কত টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়েছিল, সেটার সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও নেই। ১৯৭২ সালের মার্চে জব্দকৃত পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হয়েছিল।
প্রাথমিকভাবে ভুট্টোর এসব পদক্ষেপ বেশ কাযকর প্রমাণিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়েছিল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব কারখানা প্রথম প্রথম ভালো লাভ করলেও দুটি কারণে দীর্ঘমেয়াদে গৃহীত সরকারী কর্মপন্থা বড় ধরণের ক্ষতি ডেকে এনেছিল,
প্রথমত: এসব কারখানা পরিচালনার জন্য জনপ্রশাসন থেকে অপেশাদার কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হত। তারা পদে বড় হলেও, কর্মে অদক্ষ অযোগ্য ছিল। এসব কারখানায় তাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ ছিল না। কারখানা যেমনই চলুক, মাসশেষে মোটাঅংকের বেতন পেয়েই যাচ্ছে, কারখানার উন্নতি নিয়ে ভাবার কী প্রয়োজন? আমলাতন্ত্র (বুরোক্রেসি) দিয়ে কারখানা চলে না। পাকিস্তান স্টীল মিল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথমদিকে ভু্ট্টো সরকার রাশান কর্মকর্তাদের দিয়ে মিলটি চালু করেছিল। কয়েকবছর পযন্ত লাভজনক ছিল। পরে চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছিল। বর্তমানে এই মিলটি শ্বেতহস্তিতে পরিণত হয়েছে এটা ২০২১ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, শেষ ১৫ বছরে স্টিলমিলগুলি করদাতাদের ওপর ৩৩৪ বিলিয়ন রুপির বোঝা চাপিয়েছে। গত ১১ বছরে (২০১১-২১) মিলগুলোর লাভের খাতা শূন্য। খবরে প্রকাশিত হয়েছে, সরকার এটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত: এই নীতির আরেকটি অসুবিধা ছিল,জাতীয়করণের হুমকি,অনেক পুঁজিপতিকে তাদের ব্যবসা আরব,ইউরোপ,আমেরিকা ইত্যাদি দেশে স্থানান্তর করতে বাধ্য করেছিল। শিল্পপতিরা সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকত, কখন তার রক্তঘাম ঝরানো কারখানার ওপর জাতীয়করণের খড়গ নেমে আসে!
জাতীয়করণের পর, ভুট্টো ১০ ফেব্রুয়ারী,১৯৭২ সালে শ্রমনীতিও ঘোষণা করেছিলেন। এতে,জাতীয় মালিকানাধীন ও বড় কোম্পানিগুলিকে কর্মরত শ্রমিকরদের ৪% লভ্যাংশের অংশীদার বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। শ্রমিকদের জন্য শ্রম আদালত,সস্তা আবাসন প্রকল্প, এক সন্তানের জন্য ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, পেনশন ও বীমা ঘোষণা করা হয়েছিল। সরকার কারখানার মালিকদের নির্দেশ দিয়েছিল, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করতে হবে, তাদেরকে বীমা সুবিধা প্রদান করতে হবে। মালিকরা প্রথমে এই আদেশ মানতে চায়নি, ফলে মালিক ও শ্রমিক মারামারি শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে করাচিতে, কর্মচারী এবং মালিকদের মধ্যে সংঘর্ষ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে ওঠেছিল। সরকার হস্তক্ষেপ করে মালিকপক্ষকে আদেশ বাস্তবায়নে বাধ্য করেছিল।
জাতীয়করণ এবং শ্রমনীতির পর, ১ মার্চ,১৯৭২ সালে ভুট্টো ভূমি সংস্কার শুরু করেছিলেন। এই সংস্কারগুলির সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছিল, সামন্ততান্ত্রিক (ফিউডাল সিস্টেম) ব্যবস্থার অবসান ঘটানো। এই সংস্কারের অধীনে,খালের পানি দ্বারা সেচপ্রাপ্ত জমির মালিকানার সীমা,আগের ৫০০ একর থেকে কমিয়ে ১৫০ একর করা হয়েছে। যদিও বারানীর সীমা অর্থাৎ বৃষ্টির পানি সেচপ্রাপ্ত জমি ১০০০ একর থেকে কমিয়ে ৩০০ একরে কমিয়ে আনা হয়েছিল। কয়েক বছর পর,এই সীমা আরও কমিয়ে আনা হয়। খাল-নির্ভর জমির জন্য ১০০ একর এবং বৃষ্টি-নির্ভর জমির জন্য ২০০ একর। স্পষ্টতই এটি সামন্ততন্ত্রের অবসানের জন্য একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল। এ আইনের একটি ফাঁকও ছিল। অর্থাৎ ভূমি সংস্কারআইন বাগান,দানকৃত বা মহিলাদের মালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। সামন্তপ্রভুরা নিজের জমি সন্তান ও স্ত্রীদের নামে হস্তান্তর করতেন। অথবা দাসদের নামে যাতে তারা নিজের জমির উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। এই কৌশলে একটি পরিবার আগের মতোই হাজার হাজার একর জমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। এছাড়া শিকারের জায়গা, অশ্বপালনের খামার, গবাদি পশুর খামারগুলিকেও সংস্কারের বাইরে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ,সামন্ততন্ত্র সামান্য রূপ পরিবর্তন করে আগের মতোই অক্ষত থেকে গিয়েছিল। তবে একথা সত্য, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের কিছু জমি সাধারণ কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছিল।
অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য, ভুট্টো সরকার রুপির অবমূল্যায়নও করেছিল। তখন এক ডলারের মূল্য ছিল ৪.৭৬ রুপি। ১৯৭২ সালের মে মাসে এর দাম ১১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থনীতির খারাপ অবস্থার কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মুদ্রার অবমূল্যায়ন করার জন্য পাকিস্তানের উপর আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ দেয়া হয়েছিল। রুপির অবমূল্যায়ন না করা হলে পাকিস্তান তার পণ্য রপ্তানিতে সমস্যার সম্মুখীন হত। বৈদেশিক ঋণ পেতেও সমস্যা হত। ভুট্টো আরব রাষ্ট্রগুলো এবং ইরান থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ নিয়েছিলেন। ইরানের ৫৮০ মিলিয়ন ডলার ঋণ ছিল সবচেয়ে বড়। এছাড়াও, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া এবং সৌদি আরবও পাকিস্তানের জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার ঋণ অনুমোদন করেছিল। এই ব্যবস্থাগুলি যেমন ঋণ,রুপির অবমূল্যায়ন, জাতীয়করণের কারণে,পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছিল। ভুট্টোর তথাকথিত 'ইসলামী সমাজতন্ত্র’ ভাঙাচোরা পাকিস্তানকে কিছু সময়ের জন্য সহায়ক প্রমাণিত হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদে যদিও তার বিপুল ক্ষতির কারণ হয়েছিল।
অর্থনীতির উন্নতির পাশাপাশি, জুলফিকার আলী ভুট্টো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার দিকেও মনোনিবেশ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের মাধ্যমে তিনি সামরিক আইন তুলে নিয়েছিলেন। এই অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের অধীনে, তিনি ২১শে এপ্রিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। এখন তিনি আর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নন, বরং একজন বেসামরিক রাষ্ট্রপতি। এই দুটি বড় এবং জরুরি কাজের পর,রাষ্ট্রপতি ভুট্টোর সামনে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ ছিল। অর্থাৎ, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতে বন্দী পাকিস্তানিদের মুক্তি ও ভারতের দখলকৃত অঞ্চলগুলি ফেরত নেয়া। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে,ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানের পাঞ্জাব এবং সিন্ধু প্রদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তে ১২৫০০ বর্গকিলোমিটার পাকিস্তানি এলাকা দখল করে নিয়েছিল। এছাড়াও, ভারত গিলগিট-বালতিস্তানে ৮০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি জমি জবরদখল করেছিল। দখলকৃত জমির মোট আয়তন ছিল ১৩,০০০ বর্গকিলোমিটারের কিছু বেশি। এই দখলদারিত্বের প্রভাবে সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী ১০ লক্ষেরও বেশি পাকিস্তানিকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। ওদিকে ৯৩০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীও ভারত থেকে মুক্তির আশায় বসেছিল। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১৬,০০০ বেসামরিক নাগরিক এবং বাকিরা নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন।
১৯৭২ সালের এপ্রিলে, পাকিস্তানে বন্দী থাকা ভারতীয় বন্দীদের বিনিময়ে ভারত থেকে কয়েকজন আহত ও অসুস্থ পাকিস্তানি বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু এরা সংখ্যায় ছিল খুবই কম। বাকিরা তখনও কারাগারে ছিল। এই বন্দীদের একটি বিরাট অংশ ভারতীয় কারাগারে ছিল। কিছু বাংলাদেশেও বন্দী ছিল। দিল্লি ও ঢাকা যুদ্ধাপরাধের জন্য তাদের বিচারের হুমকি দিচ্ছিল। দিল্লি ও ঢাকা বিচারের জন্য ১৫০০ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে তালিকাভুক্ত করেছিল। পরে এই সংখ্যা কমিয়ে ১৯৫ করা হয়। বিচারের জন্য আবেদন করা বন্দীদের মধ্যে পাকিস্তানের পূর্ব কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল আবদুল্লাহ খান নিয়াজিও ছিলেন। বিচারের হুমকি ছাড় আরও একটি সমস্যা ছিল। যুদ্ধবন্দী ও জবরদখলকৃত নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলিকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, ভারত চেয়েছিল কাশ্মীর সমস্যাটি স্থায়ীভাবে তার অনুকূলে সমাধান করতে।
কাশ্মীর সমস্যা ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর ব্যক্তিত্ব এবং রাজনীতির একটি মৌলিক দিক। তিনি কাশ্মীরের জন্য হাজার বছর ধরে লড়াই করার স্লোগানও দিতেন। তাই রাজনৈতিকভাবে তার পক্ষে ভারতে গিয়ে আলোচনার টেবিলে কাশ্মীর হারানো সম্ভব ছিল না। এজন্য ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনায় বসার আগে ভুট্টো নিজের কার্ডগুলি ভালভাবে প্রস্তুত করেছিলেন। ভুট্টোর সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস ছিল, দেশ ভেঙে যাওয়ার পরেও পাকিস্তানে আটকে পড়া লক্ষ লক্ষ বাঙালি। এরা ৭১ সালের যুদ্ধের আগে চাকরি বা ব্যবসার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে এসেছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫,০০০ প্রাক্তন সেনাসদস্য আর ২০,০০০ সাবেক সরকারি কর্মচারীও ছিলেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো তখনও এই বাঙালিদের পাকিস্তান ত্যাগ করতে দেননি। এর অর্থ ছিল,৯৩,০০০ যুদ্ধবন্দীর বিপরীতে লক্ষ লক্ষ বাঙালি নাগরিককে পাকিস্তানে আটকে রাখা হয়েছিল।
ভু্ট্টোর হাতে খেলার মতো আরেকটি কার্ড ছিল। পাকিস্তান তার আন্তর্জাতিক মিত্রদের বলে রেখেছিল, ভারতের বন্দী এবং জমির সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে যেন স্বীকার না করা হয়। একারণে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যও হতে পারছিল না। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটেন অবশ্য বন্দী বিনিময় চুক্তির আগেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানের চাপের কারণে চীন,ইরান,তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ অনেক রাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। পাকিস্তানের অনুরোধে চীনও বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ আবেদনে ভেটো প্রদান অব্যাহত রেখেছিল।
ইন্দিরা গান্ধী এবং শেখ মুজিবের উপর চাপ আসতে থাকে, বাংলাদেশের স্বাধীন আইনি মর্যাদার পেতে হলে, পাকিস্তানের সাথে দ্রুত একটি চুক্তি করে ফেলতে। ১৯৭২ সালের জুন মাসে, জুলফিকার আলী ভুট্টো ভারতের সিমলা শহরে আসেন। তার প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন ৯২ জন। আদরের কন্যা উনিশ বছর বয়েসী বেনজির ভুট্টোও এই দলে ছিলেন। ভুট্টো প্রতিনিধিদলের প্রতিটি সদস্যকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। বেনজিরকে বলেছিলেন, মা তুমি এমনভাবে থাকবে, যাতে তোমাকে হাসিখুশিও না দেখায় আবার চিন্তিতও মনে না হয়। তুমি স্বাভাবিক আচরণ করবে। তুমি হাসিমুখে থাকলে মানুষ ভাববে, পাকিস্তানি সৈন্যরা কারাগারে আছে আর রাষ্ট্রপ্রধানের মেয়ে হেসেখেলে বেড়াচ্ছে। তোমাকে চিন্তিত দেখলে ভারতীয়রা মনে করবে, ভয়ে চুপসে আছো, পাকিস্তানীরা ভাববে আশার কোনো আলো নেই।
বলা হয়ে থাকে, ভুট্টো এমন একটা পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, সিমলাতে চুক্তি করতে নয়, দীর্ঘদিন ধরে রিহার্সাল করা কোনো নাটক মঞ্চস্থ করতে থিয়েটারে উপস্থিত হয়েছে। পাক প্রতিনিধিদলের প্রতিটি দলের সংলাপ তো বটেই এমনকি সংলাপের সময় কার কেমন অভিব্যক্তি হবে, সেটাও পূর্বনির্ধারিত ছিল।
আলোচনার বৈঠকে ভারতের এজেন্ডা ছিল পাকিস্তানকে তিনটি জিনিস করতে বাধ্য করা।
১.ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরকে ভারতের স্থায়ী অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
২.যুদ্ধাপরাধের জন্য বন্দী সৈন্যদের বিচারে সম্মতি দিতে হবে।
৩.বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। জাতিসংঘের সদস্যপদলাভে বাধা দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে পাকিস্তানের এজেন্ডা ছিল ভারতের একটিও দাবি মেনে না নিয়ে, নিজ অঞ্চল এবং বন্দীদের ফিরিয়ে নেওয়া। ২৮শে জুন থেকে ২রা জুলাই পর্যন্ত,পাঁচদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনা চলে। ভারতীয় আলোচক দলের একজন কর্মকর্তা কেএন বকশির মতে,ভারত সরকার আগে থেকেই ভুট্টোকে বিশ্বাসযোগ্য না মনে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন, যেখানে ভুট্টোর মাও তাকে বিশ্বাস করেন না,আমরা কীভাবে করব? কিন্তু আলোচনা শুরু হওয়ার পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ভুট্টো কী এক জাদুবলে নিজের অনুকূলে অকল্পনীয় ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেন। কে এন বকশি বলেছেন, যে ভুট্টো ভারতের সাথে হাজার বছরের যুদ্ধের কথা বলতেন,আলোচনার টেবিলে খুবই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছিলেন। তিনি ক্রমাগত দুধ ও মধুর প্রবাহমান নদী, পারস্পরিক শান্তি ও সমৃদ্ধির কথা বলে চলছিলেন। তার কথাগুলো আমাদের কানে সঙ্গীতের মতো শোনাচ্ছিল। অর্থাৎ ভারতীয়রা ভুট্টোর মিষ্টিকথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল।
কেএন বকশি আরো বলেছেন, ভুট্টোর বাকচাতুযে একপযায়ে আলোচনার পরিবেশ এমন পযায়ে উপনীত হয়েছিল যে, ভারত সরকারকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে তাদের জয়ের জন্য অনুতপ্ত বলে মনে হচ্ছিল। আমরা চুক্তি করার আকাঙ্ক্ষায় পাকিস্তানের কাছে মাথা নত করতে শুরু করেছিলাম।
তবে,এতকিছুর পর আলোচনায় উত্থান-পতন যে মোটেও ছিল না, তা নয়। ১ জুলাই বিরাট এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে আলোচনার মেয়াদ একদিন বাড়ানো হয়।
বেনজির ভুট্টো জুলাইয়ের ২ তারিখের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, সেদিন বাবা তাকে বলেছিলেন, আমরা আগামীকাল ফিরে যাচ্ছি, জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। ভারতের চাপিয়ে দেওয়া কোনও চুক্তি ছাড়াই আমরা ফিরে যাব। ভারতীয়দের ধারণা, ‘চুক্তি ছাড়া আমাদের দেশে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। তাই তারা যা বলবে, আমি অপারগ হয়ে তাদের সমস্ত দাবিদাওয়া মুখবুজে মেনে নেব। দেশবিক্রির বিনিময়ে কোনও চুক্তিতে পৌঁছানোর পরিবর্তে হতাশ হয়ে পাকিস্তানে ফিরে যাওয়াই আমার জন্য ভালো।
শুধু মেয়েকে নয়, মিডিয়াতেও অনেকটা এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন।
এমন চূড়ান্ত কথা বলার পরও,একই দিন ভোর সাড়ে ৪টায় ভুট্টো আবার ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করেছেন। কোনও চুক্তি না হওয়ায় ইন্দিরা গান্ধীও খুব পেরেশান ছিলেন। ভুট্টোর সাথে বৈঠক চলাকালে, ইন্দিরা চা উপভোগ করার পরিবর্তে,নার্ভাসভঙ্গিতে নিজের ভ্যানিটিব্যাগ নাড়াচাড়া করছিলেন। ভুট্টো বুঝে গিয়েছিলেন, ইন্দিরা এখন মানসিকভাবে দুর্বল অবস্থায় আছেন। এখনই তাকে রাজি করানোর সেরা সময়। ভুট্টো নিজের সর্বোচ্চ বাগ্মিতাশক্তি কাজে লাগিয়ে টানা আধা ঘন্টা ভাষণ দিলেন। ভাষণে ইন্দিরাকে উদ্দেশ্য করে ভুট্টো বলেছিলেন,
আমরা দুজনেই গণতান্ত্রিক নেতা। এই অঞ্চলটি দেশভাগের পরও শান্তিপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, আমরা দুজন চাইলে শান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারি। আমরা যদি ব্যর্থ হই, তাহলে পুরনো ক্ষত আরও গভীর হবে। সামরিক বিজয় ইতিহাসেরই অংশ। অতীতেও এমন বিজয় সংঘটিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কত্ব (স্টেটসম্যানশীপ) হল,বিজয়ের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজে নিতে পারা। সত্যিকার রাষ্ট্রনায়কত্ব হল,বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিল্প,যা ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকে। এজন্য প্রয়োজন ভবিষ্যতের দিকে নজর রেখে,এমন ছাড় দেওয়া,যার ফল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভোগ করবে। যদি শান্তির পুরস্কার জিততে হয়,তাহলে পাকিস্তান নয়, বিজয়ীশক্তি অর্থাৎ ভারতের উপরই দায়িত্ব বর্তায়, নমনীয়তা দেখিয়ে ও ছাড় দিয়ে একটা পরিণতিতে পৌঁছা।
ভুট্টোর কথা শুনে ইন্দিরা গান্ধীর হৃদয় গলে গিয়েছিল। এই দিনেই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছিল। ভুট্টো ৩ জুলাই পাকিস্তানে ফিরে আসেন। সিমলা চুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়,
ক. জাতিসংঘের ধারা মোতাবেক পাকিস্তান ও ভারত তাদের সম্পর্ক উন্নত করবে।
খ.আলোচনার মাধ্যমে তাদের দ্বিপাক্ষিক মতপার্থক্য নিরসন করবে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সেগুলো সমাধানের জন্য সম্মত হবে। যদি সমস্যা সমাধানে বিলম্ব হয়, তাহলে কোন দেশই একতরফাভাবে নিজের অনুকূলে পরিস্থিতি পরিবর্তন করবে না।
গ. উভয় দেশের সেনাবাহিনী ৩০ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তে ফিরে যাবে। এই বাহিনী কাশ্মীরে যুদ্ধবিরতি রেখায় ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর অবস্থানেই থাকবে।
এর অর্থ ছিল গিলগিট-বালতিস্তানের যে অঞ্চলটি ভারতীয় দখলে ছিল তা ফেরত দেওয়া হবে না।
ঘ. কাশ্মীর সীমান্তে যুদ্ধবিরতি রেখাকে বলা হবে এলওসি (লাইন অব কন্ট্রোল) নিয়ন্ত্রণ রেখা। উভয় দেশই নিয়ন্ত্রণ রেখাকে সম্মান করবে এবং এখানে বলপ্রয়োগ করবে না।
ঙ. যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবাসনের জন্য আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
সিমলা চুক্তিকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্যগুলির মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি ছিল ইতিহাসের হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনার মধ্যে একটি, যখন পরাজিত এবং বিজয়ী দেশগুলি সমতার ভিত্তিতে চুক্তিতে সম্পাদিত হয়েছিল। বেশিরভাগ সময়ই বিজয়ীশক্তি পরাজিতের উপর ছড়ি ঘুরিয়ে থাকে।
এই চুক্তির বিস্ময়কর দিক হল, পাকিস্তান ভারতের একটি দাবিও মেনে নেয়নি। ভারতের মর্জিমতো কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হয়নি। পাকসেনাদের যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করা হয়নি। বাংলাদেশকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ভারত পাকিস্তানকে একটি বিশাল এলাকা ফিরিয়ে দিয়েছিল। গিলগিট-বালতিস্তানের কিছু এলাকা ফেরত দেওয়া হয়নি যেগুলো লাদাখে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই যুদ্ধে পাকিস্তান নতুন কোনও ভূখণ্ড পায়নি, এটাও ঠিক নয়। ৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাশ্মীরের ছাম্ব এলাকাকে ভারতীয় দখল থেকে মুক্ত করেছিল। সিমলা চুক্তির অধীনে প্রায় ১২৭ বর্গকিলোমিটারের এই এলাকাটি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে আসে। এটি আজ আজাদ কাশ্মীরের অংশ। সিমলা চুক্তির সাফল্য সম্পর্কে ভুট্টো বলতেন, আরবরা ৫ বছর ধরে ফিলিস্তিনি ভূমি ফিরে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ আমি পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দলখকৃত আরবভূমির চেয়ে অনেক বড় জমি ফিরে পেয়েছি। সিমলা চুক্তির সময়,১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। ইসরায়েল এই যুদ্ধে গাজা, পশ্চিম তীরসহ অনেক আরব অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল।
মেয়ে বেনজিরকে ভুট্টো আরও বলেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী তাকে জমি অথবা যুদ্ধবন্দী কোনো একটি ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি জমি ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে ভুট্টোর যুক্তি ছিল, বন্দীদের সমস্যা বিশ্বব্যাপী এবং মানবিক। হাজার হাজার বন্দীকে দীর্ঘ সময় ধরে রাখাও ভারতীয় অর্থনীতির উপর বোঝা ছিল। ভুট্টো বুঝতে পেরেছিলেন, আজ জমিটি ফিরিয়ে না নেওয়া হলে, আর কখনও এ নিয়ে আলোচনা হবে হবে কি না সন্দেহ। অন্যদিকে ভারত পাক যুদ্ধবন্দীদের অনন্তকালের জন্য আটকে রাখতে পারবে না। ভুট্টোর ভাষায়,একটি দেশ ভূমি দখল করতে পারে, বন্দীদের দখল করে পারে না।
এজন্যই তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তানের প্রায় ১৩,০০০ বর্গকিলোমিটার জমি ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। বন্দীমুক্তির বিষয়টি পরবর্তী বৈঠকের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
বিপরীতে, সিমলা চুক্তিকে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ যুদ্ধে জয়লাভ করার পরও, তিনি কাশ্মীর সমস্যা নিজের অনুকূলে সমাধান করতে পারেননি। সমস্ত আপত্তি সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী দৃঢ়তার সাথে সিমলা চুক্তিকে রক্ষা করেছিলেন। ইন্দিরার মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলি যদি পরাজিত জার্মানির সাথে এমন নম্র আচরণ করতো, যেমনটা ভারত সিমলা চুক্তিতে পাকিস্তানের সাথে করেছিল, তাহলে হিটলার বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোনটাই হত না। পাকিস্তান ও ভারতে ঘৃণার বিস্তার রোধ করার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এমন কথাও প্রচলিত আছে, জুলফিকার আলী ভুট্টো সম্ভবত কাশ্মীর বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে মৌখিক গোপন কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দুই নেতা অলিখিতভাবে একমত হয়েছিলেন: নিয়ন্ত্রণরেখা বাণিজ্য ও ভ্রমণ ইত্যাদির জন্য খুলে দেওয়া হবে। এভাবে কয়েক বছর ধরে চলবে। এরমধ্যে ভুট্টো পাকিস্তানি জনগণকে কাশ্মীরের বিভাজন মেনে নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করবেন। তারপর নিয়ন্ত্রণ রেখাকে নিয়মিত সীমান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এভাবে অগ্রসর হলে,পাকিস্তানের জনগণ হিংস্র হবে না, ভুট্টো সরকারও কোনও হুমকির সম্মুখীন হবে না।
এই কারণেই হয়তো ইন্দিরা গান্ধী সিমলা চুক্তিতে কাশ্মীর সম্পর্কে কোনও সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর জোর দেননি। তবে, গোপন প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। কাশ্মীর এখনও দুই দেশের মধ্যে বিরোধপূর্ণ। সিমলা চুক্তির পর,পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পায়। পরের মাসে আগস্টে, চীন বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্য করার জন্য ভারতের প্রচেষ্টাকে ভেটো দেয়। সিমলার মতো বন্দীদের ক্ষেত্রে ভারতকে পাকিস্তানের দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ২৮শে আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান দিল্লিতে বন্দীদের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরের মাসে, ২৮ সেপ্টেম্বর, ৮৪২ জন বন্দী ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে। তাদের বেশিরভাগই ছিল বেসামরিক নাগরিক, যার মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশুও ছিল। বন্দীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া পরবর্তী কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। ১৯৭৪ সালের ৩০ এপ্রিল, ৭৩৪ জন বন্দীর শেষ দল পাকিস্তানে পৌঁছায়। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডার জেনারেল এ.কে. খান নিয়াজীও এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে, যখন পাকিস্তানি বন্দীরা ভারতে ছিল,৬১৭ জন ভারতীয় সৈন্যও পাকিস্তানে বন্দী ছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭২ সালের শেষের দিকে এই বন্দীকে মুক্তি দেন। ভারত দাবি করে তাদের ৫৪ জন সৈন্য এখনও পাকিস্তানে নিখোঁজ,তারা এখনো পাকিস্তানে বন্দী আছে। পাকিস্তানের সরকারী অবস্থান হল, তাদের কাছে একজনও ভারতীয় যুদ্ধবন্দী নেই। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও ভারতের প্রতি একই দাবি করা হয়, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধে নিখোঁজ হওয়া ৩৮ জন সৈন্য ভারতের কোথাও বন্দী আছে। ভারতেরও পাকিস্তানের প্রতি একই অবস্থান, এই দুটি যুদ্ধে বন্দী হওয়া কোনো পাকসেনা আমাদের কাছে অবশিষ্ট নেই।
ভারত থেকে যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তনের পর,পাকিস্তান থেকে বাঙালি নাগরিকদের ঢাকায় অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেক বাঙালি পরিবার এখনও পাকিস্তানে পাকিস্তানি নাগরিকত্ব ছাড়াই রয়ে গেছেন। বাংলাদেশে ৫০,০০০ পাকিস্তানি নাগরিক,যাদের বিহারি বলা হয়, তারা ফিরে পাকিস্তানে যেতে পারেনি। বাংলাদেশও তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। হ্যাঁ, ২০০৮ সালে এই শরণার্থীদের সন্তানদের ঢাকা হাইকোর্ট বাংলাদেশী নাগরিকত্ব প্রদান করে। ১৯৭১ সালের ট্র্যাজেডির পর জুলফিকার আলী ভুট্টো কোনওভাবে পাকিস্তানকে স্থিতিশীল করেছিলেন। অর্থনীতি,বন্দী ও অধিকৃত অঞ্চলের সমস্যা সমাধান করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে।
পাকিস্তান ভাঙার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল, পাকিস্তানের কোনো সংবিধান না থাকা। ভুট্টো সবদিক থেকে মুক্ত হয়ে, সংবিধান প্রনয়ণের দিকে মনোযোগ দিলেন। এজন্য ভু্ট্টোকে নিজ আদর্শের সাথে আপস করতে হয়েছিল।
সে গল্প তোলা রইল।
ইনশাআল্লাহ।

মূল লেখা
https://www.facebook.com/atik.ullah.589/posts/pfbid02oByQnKFftJCLhX8SoqeUnUzBtkRvGDbCHJet5hKMYiEfWSzmhJ9yxM2xxExCPtgbl

দ্বিখণ্ডিত ভালোবাসা- মাওলানা আতিক উল্লাহ ১৪.০৭.২০২৫


(আগের পোস্টের পর থেকে)
---
রাজা গনেশ
ইলিয়াস শাহের নাতি সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের দরবারে এক হিন্দু সভাসদ ছিল, নাম রাজা গনেশ (১৩৭০-১৪২২)। গনেশ দিনাজপুরের ভাতুরিয়ার জমিদার ছিল। মনে মনে ইসলাম, মুসলমান, মুসলিম শাসনের প্রতি তীব্র আক্রোশ পুষে রাখত। সুযোগ পেলেই বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল হানত। গনেশ ছিল ঠা-া মাথার লোক। সে জানত, সরাসরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে পারবে না। ছলেবলেকৌশলে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বাংলার বুক থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের চিনহ মুছে দেয়ার জন্য সুদূরপ্রসারী এক পরিকল্পনা হাতে নিল। কৌশলে সুলতানের দরবারে ঢুকে পড়ল। ইলিয়াসশাহী সুলতানগণ হিন্দু-বৌদ্ধদের প্রতি উদার ছিলেন। হিন্দু গনেশ এই উদারতাকেই কাজে লাগিয়েছিল। নানা কৌশলে দরবারে প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে চলেছিল। গনেশ সবকিছু করত পর্দার আড়াল থেকে। সামনে আসত না।
১২০৬ সালে বখতিয়ার খিলজীর ইনতিকালের পর থেকে ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত ১৩২ বছরে প্রায় ২৩ জন মুসলিম শাসনকর্তা বাংলাদেশ শাসন করেছেন। কথিত আছে, গনেশের ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ শাহাদাতবরণ করেন। এরপর ১৪১০ থেকে ১৪১৪ সাল পর্যন্ত ইলিয়াশাহী বংশের সাইফউদ্দীন হামজা শাহ, শিহাবউদ্দীন বায়েজিদ শাহ ও আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ একের পর এক বাংলার সুলতান হন। বলা হয়ে থাকে, গণেশের চক্রান্তে তারা সকলেই নিহত হন। শিহাবউদ্দীনকে হত্যা করার পর তাঁর বালকপুত্র আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহকে রাজা হিসেবে খাড়া করে, গনেশ নিজেই কার্যত রাজা হয়ে বসেছিল। কিছুদিন পর যখন বুঝতে পারল, কাউকে আর শিখ-ী না রাখলেও চলবে, তখন ফিরোজ শাহকে হত্যা করে গণেশ ১৪১৫ সালে সিংহাসন দখল করেছিল। এতদিন তার মুসলিমবিদ্বেষ চাপা ছিল। মসনদে বসেই গনেশ আসল রূপে আবির্ভুত হল। শায়খ বদরুল ইসলাম ও তাঁর পুত্র ফয়জুল ইসলাম গণেশকে অবনত মস্তকে সালাম না করার কারণে গনেশ বেজায় ক্রুদ্ধ হয়েছিল। গনেশ সংকল্প করল, শায়খ বদরুল ইসলামকে তার সামনে মাথা নত করিয়েই ছাড়বে। শায়খকে দরবারে তলব করা হল। প্রবেশমুখ এতটা সংকীণ আর নিচু করে তৈরী করা হয়েছিল, উপুড় হয়ে প্রবেশ করা ছাড়া উপায় ছিল না। দুষ্টরাজার দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরে শায়খ প্রথমে পা এগিয়ে দিয়ে ভিতরে রেখে, মাথা নত না করেই ভেতরে প্রবেশ করলেন। মুসলমান আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করতে পারে না। হিংস্র গণেশ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে শায়খকে শহীদ করে দিয়েছিল। গনেশের বর্বরতা এখানেই শেষ নয়, বহু আলেমকে নদীতে ডুবিয়ে শহীদ করেছিল।
গনেশের বর্বরতা দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সুফি নুর কুতবুল আলম ভীষণ পেরেশান ছিলেন। জৌনপুরের শাসক সুলতান ইবরাহিম শর্কি ছিলেন সুফি সাহেবের অনুরক্ত। সুলতানের কাছে সাহায্য চেয়ে দূত পাঠালেন সুফি নুর কুতবুল আলম। সুলতান বিরাট বাহিনী নিয়ে বাংলার অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। গনেশ এই সংবাদ পেয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। দৌড়ে সুফি সাহেবের দরবারে হাজির হল। কাকুতিমিনতি করে বলল,
-আমাকে বাঁচান। আমি আর কোনো অন্যায় করব না। আপনার কথামতো রাজ্য শাসন করব।
-একশর্তে সুলতান ইবরাহিম শর্কিকে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করতে পারি, যদি তুমি ইসলাম গ্রহণ করো।
ধূর্ত গনেশ পাল্টা প্রস্তাব হাজির করল,
-আমার ছেলে যদুকে মুসলমান বানিয়ে মসনদে বসিয়ে আমি সরে দাঁড়াব।
সুফি সাহেব প্রস্তাব মেনে নিলেন। যদুকে জালালুদ্দীন নাম দিয়ে বাংলার মসনদে বসানো হল। সুলতান ইবরাহিম শর্কি ফিরে যেতেই ধূর্ত গনেশ স্বমূর্তি ধারণ করল। ছেলেকে সরিয়ে আবার মসনদ দখল করল। সুবর্ণধেনু ব্রতের মাধ্যমে জালালুদ্দীনকে শুদ্ধ করে যদুতে রূপান্তরিত করা হল। শুদ্ধিকরণের পর গনেশ আরো হিং¯্র আর বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। সুফি নুর কুতবুল আলমের পুত্র ও নাতিকে নির্যাতন করে শহীদ করে দিয়েছিল। এভাবে সাত বছর মুসলিম বাংলায় এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেছিল। মুসলমানদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। বিখ্যাত আদিনা মসজিদকে কাচারি বাড়িতে পরিণত করেন। গণেশের মৃত্যুর জালালউদ্দীন (যদু) আবার সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। গনেশের নেতৃত্বে কিছুকালের জন্য বর্ণহিন্দুদের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল। এর মোকাবিলায় সেকালের আলিম, পীরদরবেশগণ মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে সাধ্যমতো প্রতিরোধ সংগ্রামে চালিয়ে গিয়েছিলেন।
শ্রীচৈতন্য (১৪৮৬-১৫৩৩)
গণেশের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর বর্ণহিন্দুরা বৈদিক সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু করে। বিদ্যাৎসাহী মুসলিম সুলতানগণ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থাদি বাংলায় অনুবাদ করার ব্যাপারে বিপুল উৎসাহ প্রদান করেন। শ্রীকৃষ্ণ বিজয়কাব্য, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থ মুসলিম শাসকদের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত থেকে বাংলায় ভাষান্তর করা হয়। মুসলিম সুলতানদের আশ্রয়, প্রশ্রয় ও আশকারা পেয়ে হিন্দুরা আবার তলে তলে পুনর্গঠিত হতে শুরু করেছিল। গনেশের ব্যর্থতায় উগ্রহিন্দুরা বুঝতে পেরেছিল, শক্তিতে বাংলায় তারা মুসলমানদের তখতেশাহি ওল্টাতে পারবে না। আবার চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও চলবে না।
হিন্দুধর্মের তখন শোচনীয় অবস্থা। ব্রাম্মণদের চরম দৌরাত্ম্য, জাতপ্রথার ভয়ংকর বৈষম্য হিন্দুসমাজকে অবক্ষয়ের শেষসীমায় পৌঁছে দিয়েছিল। নিচু জাতের লোকজন মন্দিরে প্রবেশ করতে পারত না। ধর্মীয় আচার পালন করতে পারত না, এমনকি সমাজে তাদের মেলামেশাও সীমাবদ্ধ ছিল। তাছাড়া হিন্দুধর্মের আচারকর্ম ছিল জটিল, দুর্বোধ্য ও পুরোহিতনির্ভর।
শাস্ত্রীয় হিন্দুধর্ম ছিল দুর্বোধ্য। সাধারণ মানুষ ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল।
তান্ত্রিক ও কুলীন প্রথা, বহুবিবাহ, যৌতুক, নারী অবমাননা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তন্ত্রের নামে অনৈতিক আচরণ, দেব-দেবীর নাম ব্যবহার করে লালসার পূজা ও গোপনাচার ব্যাপক হয়ে পড়েছিল। নারীকে পূর্ণ ধর্মীয় অধিকার ছিল না। নি¤œবর্ণের হিন্দুরা শিক্ষা, উপাসনা, ধর্মগ্রন্থ পাঠ, এমনকি সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারত না।
বিপরীত ইসলামের সহজসরল ব্যাখ্যা, জটিলতামুক্ত সহজিয়া আচার-ইবাদত, জাতপাতহীন বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থা, নারীর প্রতি সম্মান, মসজিদে সবার সমান অধিকার, ধর্মগ্রন্থ পাঠের স্বাধীনতা, ধর্মচর্চার অবাধ সুযোগ- যুগ যুগ ধরে অবহেলিত নিম্নবর্ণের হিন্দুসমাজকে ভীষণ মুগ্ধ করেছিল। দলে দলে তারা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করেছিল। নিজের ঘর উজাড় হতে দেখে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের টনক নড়ল। এভাবে চলতে থাকলে উচ্চবর্ণের কিছু হিন্দু ছাড়া বাকি সবাই মুসলিম হয়ে যাবে। কিছু একটা করতে হবে। তখনই নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব ঘটেছিল। গণহারে ধর্মান্তর ঠেকানো হিন্দুদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। হিন্দুধর্মের এমন এক ব্যাখ্যা ও রূপ সামনে আনা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল, যার আকর্ষণে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ধর্মত্যাগ করবে না।
বৈষ্ণব আন্দোলন
শ্রীচৈতন্য এই কাজটাই করেছিল। হিন্দুধর্মের সহজিয়া রূপ হাজির করেছিল। এই রূপটিই বৈষ্ণব ধর্ম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতার, বিশেষ করে শ্রীকৃষ্ণ ও রামচন্দ্রের প্রতি একনিষ্ঠ ভক্তি ও প্রেমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বৈষ্ণব মতবাদ। বিষ্ণুর প্রেমকে ঘিরেই এই মতবাদ, তাই এর নাম বৈষ্ণব। এর মূলকথা হল,
ভক্তিই মুক্তির প্রধান পথ। যজ্ঞ, তপস্যা, জ্ঞানচর্চা বা কঠোর আচারের বদলে, স্নেহমায়াভরে ভগবানের নাম জপ ও তাঁর প্রেমে আত্মসমর্পণ করাই মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায়। একেই বলা হয় ‘ভক্তিযোগ’। হরিনাম সংকীর্তন অর্থাৎ ভগবানের নামগান, যেমন: ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’, শ্রেষ্ঠ উপাসনা। নামসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে আত্মার মুক্তি ঘটে।
ইসলামের মুখোমুখি হয়ে হিন্দুধর্মের যেসব ঘাটতি প্রকটভাবে ধরা পড়েছিল, শ্রীচৈতন্য সেগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য পাল্টা ‘বয়ান’ তৈরি করেছিল। সহজভাবে ভগবানের নাম স্মরণ (নামসংকীর্তন), জাতপাতের ঊর্ধ্বে সাম্য, নারী ও দলিতদের ধর্মীয় মর্যাদা, হৃদয়ের ভক্তি ও প্রেমই মুখ্য, এমন মতবাদ প্রচার করে বাংলার হিন্দুদের মধ্যে এক নবজাগরণ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। হিন্দুদের ধর্মান্তরের স্রোত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
শ্রীচৈতন্য তার সহজিয়া বৈষ্ণব মতবাদ প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে নিয়মিত নবদ্বীপের রাস্তায় ধর্মীয় মিছিল বের করত। মিছিলে খোল-করতাল বাজিয়ে গাইতে গাইতে, নাচতে নাচতে হরিনামসংকীর্তন করত। লোকজনও এমন গানবাদ্যিতে আনন্দ পেয়ে গেল। সাধারণ মানুষের কাছে ধর্ম এতদিন জটিল শাস্ত্রকথা, পুরোহিত আর মন্দিরনির্ভর ছিল।
শ্রৈচৈতন্যের মাধ্যমে ধর্মটা ঘরে ঘরে, হাতে হাতে, রাস্তাঘাটে নেমে এসেছে। পাশাপাশি আনন্দও আছে, আর কি চাই। শ্রীচৈতন্য বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল, এভাবে ভক্তিভরে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ জপলে, মুক্তি পাওয়া যাবে, মোক্ষ লাভ হবে। মুক্তি ও মোক্ষ খুবই সহজ ও আনন্দকর।
মতবাদের মোকাবেলা মতবাদ দিয়ে করতে হয়। ইসলামের সহজসরল রূপের মোকাবেলায় হিন্দুরা পাল্টা তাদের ধর্মের সহজসরল রূপ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। তাতে তারা সফলও হয়েছে। বৈষ্ণবধর্মের পর মুসলিম দাঈগণ ঠিক সেভাবে পাল্টা ‘বয়ান’ তৈরি করতে পারেননি।
শ্রীচৈতন্য-বৈষ্ণব মতবাদ একদিনে তৈরি হয়নি। অনেককিছুর সাথে মুসলিম সুলতানদের উদারতাও এর পেছনে ক্রীয়াশীল ছিল। বাগদাদের আব্বাসী খলীফাদের মতো বাংলার সুলতানদেরও কুরআন-সুন্নাহ ছেড়ে পার্থিব সাহিত্য-দর্শনচর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতার মোহ পেয়ে বসেছিল। কিছু আব্বাসী খলিফার কাছে কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ ইলমের চেয়ে গ্রীকদর্শনের বস্তাপঁচা কুটিল তত্ত্বকে বেশি উপাদেয় মনে হয়েছিল। বাংলার সুলতানগণ সমৃদ্ধ আরবী তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, আরবীকাব্য বাংলায় অনুবাদ না করে হিন্দুদের বইপত্র অনুবাদে মনোযোগ দিয়েছিলেন। সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের আমল থেকে এই ধারা শুরু হলেও, সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯)-এর আমলে চরম আকার ধারণ করেছিল।
মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুদিত ও রচিত মঙ্গলকাব্যের প্লাবনে সাধারণ মুসলিম সমাজের বিশুদ্ধ আকীদাবিশ^াস ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সাধারণ মুসলিম শ্রীচৈতন্যের গানবাদ্যি, খোলকরতালে প্রভাবিত হয়ে পড়ছিল। চৈতন্য জনসমক্ষে মিছিলের ভঙ্গিতে নাচ, গান, নামসংকীর্তন করে বিশৃঙ্খলা করেছিল, রাতের সমস্বরে হরিনাম জপের নামে মানুষের ঘুমে ব্যঘাত ঘটিয়ে চলছিল। নবদ্বীপের কাজি চৈতন্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গেলে, চৈতন্য প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে কাজির বাড়ি অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। আলাউদ্দীন হুসেন শাহের কাছে বিচার দিয়েও কাজ হয়নি। তিনি চৈতন্যকে ছাড় দেয়ার পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি হিন্দুয়ানি সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বুঁদ ছিলেন। সুলতানের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চৈতন্য-বৈষ্ণবদের বাড় হাজারগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
সুলতানগণ মুসলিম রাষ্ট্রগঠনে যতটা মনোযোগী ছিলেন, মুসলিম জাতিগঠনে ততটা ছিলেন না। মুসলিম শাসকদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসচেতনতার সুযোগ ষোলোয়ানা কাজে লাগিয়েছিল চৈতন্য-বৈষ্ণবরা। স্বাধীন সুলতানি আমলের শেষভাগে হিন্দুদের সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠেছিল। মুসলমানদের পক্ষ থেকে পাল্টা উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় জনগণের মুখের ভাষা বাংলা যথেষ্ট সমৃদ্ধি, পরিণতি অর্জন করেছিল। দুঃখের বিষয় হল, সুলতানদের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা বাংলা সাহিত্য এমন একটি রূপ লাভ করেছিল, যাতে মুসলমানদের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক জীবনের যথার্থ প্রতিফলন ছিল না। সুলতানগণ এমন বাংলাসাহিত্যের ধারকবাহক হয়েছিলেন, যা তার ঘরের ঈমান-আকীদার মূলে কুঠারাঘাত করে চলছিল প্রতিনিয়ত। অথচ মুসলমানদের সুষ্ঠু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন গঠনের উপযোগী বিপুল জ্ঞানভা-ার আরবিতে থরে থরে সাজানো ছিল। বাংলার জনগণের সামনে সেই অমূল্যরতন তুলে ধরার কোন ব্যবস্থাই সুলতানী আমলে করা হয়নি।
চৈতন্য-বৈষ্ণব মতবাদের প্রভাবে বাংলার হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এ সময় যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচিত হয়েছিল। বহু হিন্দু লেখক চৈতন্যের জীবন ও দর্শন নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। বৈষ্ণবচিন্তা ও ভাবধারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পুরো অঙ্গনকে প্লাবিত করেছিল। এর মোকাবিলায় সে সময়কার সুলতান ও মুসলিম সমাজের পক্ষ কার্যকর, ফলপ্রসূ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় না। এ শূণ্যতার ফলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতাবোধেরও জন্ম হয়েছিল। তিক্ত হলেও সত্য, বৈষ্ণব কবি-সাহিত্যিকদের বিরাট মিছিলে এক শ্রেণীর মুসলমান কবিও গা ভাসিয়েছিলেন। যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যের ভাষায় এরা ছিলেন “বাঙ্গালার বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মুসলমান কবি”। কিছু মুসলমান চৈতন্যের ধর্মাদর্শের অনুসারী হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছিল। বৈষ্ণব আন্দোলন কতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল, এ থেকে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। মুসলিম পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেয়া বাংলাভাষার ওপর শুরু থেকেই ‘ঈমান ও ইসলামবিরোধী’ ভাবধারা প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। মুসলিম চিন্তাবিদগণ তখন এর ভয়াবহ পরিণতির কথা উপলব্দি করতে পারেননি। যার মাশুল আজো বাংলার মুসলিম সমাজকে গুনতে হচ্ছে।
হিন্দু কবি-সাহিত্যিকরা তাদের ধর্মাশ্রয়ী কাব্য-সাহিত্য রচনা করবে, এতে দোষের কিছু নেই। মুসলিমরা নিজেদের স্বকীয়তা ভুলে বৈদিক-বৈষ্ণব ¯্রােতে গা ভাসিয়ে দেয়াটা দোষের। সাধারণ মুসলমানের কী দোষ, বিকল্প না পেলে, রাধাকৃষ্ণের নোংরা পরকিয়া, আদিরসাত্মক বৈষ্ণব সাহিত্যেই বুঁদ হবে, এ আর বিচিত্র কি। মুসলিম কবি-সাহিত্যিকরা একদম কিছুই করেননি, তা নয়। তারাও অল্পবিস্তর পুঁথি-কাব্য রচনা করেছেন। সেগুলো বৈষ্ণব প্লাবনের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে। শক্ত, মোক্ষম, কার্যকর, প্রভাবশালী কোনো ধারা মুসলমানরা সৃষ্টি করতে পারেনি। এতকিছু সত্ত্বেও এদেশে ইসলাম ও মুসলমান টিকে গেছে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার খাস রহমত ও কুদরতে। এতে মুসলমানদের কোনো কৃতিত্ব নেই।
চৈতন্য ও বৈষ্ণব মতবাদকে অহিংস, প্রেমময়, উদার, সহজিয়া বলে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। চৈতন্যপন্থীদের মধ্যে শুরু থেকেই মুসলিমবিদ্বেষ, সহিংসতার বীজ সুপ্ত ছিল। যে কোনো প্রতিরোধ আন্দোলন ও পাল্টা মতবাদেই একধরণের রাগ, জোশ থাকেই। চৈতন্যের মধ্যেও ছিল। নবদ্বীপে কাজির বাড়ি অবরুদ্ধ করাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। অহিংস, নিরীহ হলে কেউ প্রধান প্রশাসকের বাড়ি ঘেরাও করে? কারো কারো মতে চৈতন্যের সেই ঘেরাও-অবরোধই ছিল উপমহাদেশের সর্বপ্রথম সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা।
হিন্দুদের সাংস্কৃতিক পনরুজ্জীবন আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল- মুসলমানদের বিরুদ্দে চরম ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রচার। শ্রীচৈতন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংসার বাণী প্রচার করেছিল, যার প্রভাবে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততা জন্ম হয়েছিল। বাংলায় সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির এটি ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। শ্রীচৈতন্যের বড় হাতিয়ার ছিল- হিংসা ও সাম্প্রদায়িক ভেদনীতি, রাধাকৃষ্ণের পরকীয়া প্রেমের আদিরস। চৈতন্যের হিংসানীতির শিকার হয়েছিলেন নবদ্বীপের কাজী। কাজীর বাড়িতে হামলা চালানোর মিছিলে চৈতন্য নিজেই নেতৃত্ব দিয়েছিল। চৈতন্য দুই শিষ্য সনাতন ভ্রাতৃদ্বয়ের সাহায্যে সুলতান হোসেন শাহের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করার অভিযোগও আছে। এ ষড়যন্ত্র ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত সুলতান হোসেন শাহ চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। চৈতন্য-বৈষ্ণবদের সাংস্কতিক আন্দোলনের প্রকৃতি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে চৈতন্যের ব্যর্থতার ওপর আলোকপাত করে মওলানা আকরাম খাঁ লিখেছেনঃ
“ছোলতান হোসেনের প্রাথমিক দোষ-দুর্বলতার সুযোগ লইয়া, গৌড় রাজ্যের সাধু-সন্যাসীরূপী বৈষ্ণব জনতা বাংলাদেশ হইতে ইসলাম ধর্ম ও মোছলেম শাসনকে সমূলে উৎখাত করিয়া ফেলিবার জন্য যে গভীর ও ব্যাপক ষড়যন্ত্রে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, ছোলতান ও স্থানীয় মোছলেম নেতাদের যথাসময়ে সতর্ক হওয়ার ফলে তাহার অবসান ঘটিয়া যায়। চৈতন্যদেব এ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ বিফল মনোরথ হইয়াই বিদেশ যাত্রা করিয়াছিলেন এবং তাহার পরে এমন আশ্চার্যরূপে উধাও হইয়া গিয়াছেন যে, ভক্তরাও তাহার শেষ জীবনের ইতিহাস সম্বন্ধে কোন সংবাদই দিতে পারেন নাই। কেহ বলিতেছেন অন্তর্ধান, কেহ বলিতেছেন সমুদ্রে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া মৃত্যুবরণ ইত্যাদি”(মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১১০)।
ইসকন
বর্তমানে ইসকন (ISKCON) চৈতন্যদেবের রেখে যাওয়া কাজই করছে। ইসকন শব্দের পূর্ণরূপ হচ্ছে International Society for Krishna Consciousness। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ। ইসকনের মূল উদ্দেশ্য, শ্রীচৈতন্য-বৈষ্ণব মতবাদের অনুসরণে,
ক. শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া।
খ. হরিনাম সংকীর্তন (হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র) প্রচার।
গ. সনাতন ধর্মের গৌড়ীয় বৈষ্ণব মত প্রচার।
ঘ. আত্মিক উন্নতি ও বৈষয়িক মোহ থেকে মুক্তি।
বর্তমানে ইসকনের প্রধান কেন্দ্রও নদীয়ার মায়াপুরে। শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থলে। চৈতন্যের কর্মস্থল বাংলা হলেও, ইসকনের কর্মপরিধি বিশ^ব্যাপী। ১৯৬৬ সালে ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ (অভয়চরণ দে ১৮৯৬-১৯৭৭) নিউইয়র্কে ইসকন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর জন্ম কলকাতায়।
চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলন ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়েছিল। উত্তরসূরী ইসকনের ভূমিকার ব্যাপারেও সতর্ক থাকা জরুরি। হিন্দুরা নিজেদের ধর্মচর্চা করবে, নিজেদের ধর্মের উন্নতি, অগ্রগতি নিয়ে কাজ করবে, এটা তাদের মৌলিক অধিকার। তাদের কাজ যদি ইসলাম ও মুসলিম সমাজকে ক্ষতি করে, সেটা প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি থাকা জরুরি। চৈতন্যের সময় মুসলিম শাসক ও ওলামায়ে কেরামের উদারতা, উদাসীনতায় যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল, এবার যেন তেমন কিছু না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি। হিংসার বদলে হিংসা, ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামের মূলবার্তা হল হিংসা-বিদ্বেষ-জুলুমের বিপরীতে বিশুদ্ধ ইনসাফ।
১০: ইসলামের সূচনা থেকে ইহুদি ও মুশরিকরা মুমিনের বিরুদ্ধে দ্রুত একজোট। এরা চুক্তিভঙ্গ করার ক্ষেত্রে দক্ষ। এদের মধ্যে বিশ^স্ত থাকলেও গনেশের মতো মানুষেরও অভাব নেই।
১১: বাংলায় কাজ করতে গেলে অতীতকে সামনে রাখতে হবে। অতীতের কাজগুলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
১২. বাংলার মুসলমানদের সবসময় হিন্দুদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সংখ্যালঘুর প্রতি জুলুম করা যাবে না, তাদের ব্যাপারে উদাসীন থাকা যাবে না। গনেশ ও গৌরগোবিন্দরা সবযুগেই ঘাপটি মেরে থাকে। সুযোগ পেলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
১৩. বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই হিন্দুরা সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে তিনক্ষেত্রে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা- চালিয়ে আসছে,
ক. ধর্মীয়ভাবে,
খ. সাংস্কৃতিকভাবে,
গ. রাজনৈতিকভাবে।
এখনো অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি।
১৪. প্রতিটি মুসলিম শিশুকে বুঝ হওয়ার সাথে সাথেই মূর্তিপূজার অসারতা, অযৌক্তিকতা, কূপম-কতা বুঝিয়ে দিতে হবে। মূর্তিপূজা, শিরকের ভয়াবহতা তার সামনে সহজ ভাষায় পরিষ্কার করে দিতে হবে।
.
.
(এটা খসড়ারূপ। আরো পরিমার্জন, পরিবর্ধন হবে, ইন শা আল্লাহ)।
.
.
.
লেখায় তথ্যগত, তত্ত্বগত কোনো ভুল ধরা পড়লে, কোনো বক্তব্যে খটকা লাগলে, কোনো কথায় অসঙ্গতি চোখে পড়লে, ধরিয়ে দেয়ার বিনীত অনুরোধ। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

মূল লেখা
https://www.facebook.com/story.php?story_fbid=24126791710288857&id=100001540931061&rdid=be8EyYWBSRVhIE6k#

দ্বিখণ্ডিত ভালোবাসা- মাওলানা আতিক উল্লাহ ১৪.০৭.২০২৫

ছাত্রজীবন থেকেই আমি আর দোস্ত আসলাম প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমরা নিজেদের জীবনকে উম্মাহর জন্য কুরবান করব। দুজনের ক্ষেত্র ভিন্ন হবে। আমি তালীম-তাবলীগ নিয়ে কাজ করব, আসলাম অর্থনীতি সমাজসেবা নিয়ে কাজ করবে। সেই সুবাদেই কর্মস্থল হিসেবে ঢাকাকে বেছে নেয়া। আব্বা চেয়েছিলেন গ্রামেই তার মিশনকে এগিয়ে নিই। তাকে আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য খুলে বলেছি। সানন্দে রাজি হয়েছেন।

আব্বাজান ছিলেন ফুরফুরা শরীফের মুরিদ। জৌনপুর ঘরানার সাথেও আব্বাজানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। দাদাজান ছিলেন জৌনপুর ঘরানার সুফি প্রকৃতির মানুষ। আব্বাজান কলকাতার শিক্ষাজীবনে বামচিন্তার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন। ছোটবেলা থেকে ইবাদত-বন্দেগীর পরিবেশে বেড়ে ওঠার পরও কলকাতায় বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে বামপ্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। কলকাতার আকাশে বাতাসে বামরেণু উড়ে বেড়ায়। বাঁচার উপায় ছিল না। জ্ঞান শিল্পচর্চার কেন্দ্রগুলো বামকবলিত ছিল। বামচিন্তা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। দেশভাগের পর যারা ঢাকায় এসে এপারবাংলার শিক্ষা সংস্কৃতির নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তারা ওপারবাংলা থেকে বামবীজ বহন করে এনেছিলেন। এরাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা, টিএসসি, নাট্যমঞ্চ, থিয়েটার, শিল্পকলাকে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। ওপারবাংলার পত্রিকা-সাময়িকিগুলো নিয়মিত বামজল ঢেলে গেছে। শুরুর দিক বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যায়লগুলোর শিক্ষকরা হয় সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়তো প্রভাবিত ছিলেন। ঢাকা যেমন কলকাতা দ্বারা প্রভাবিত ছিল, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা জ্ঞানচর্চাকেন্দ্রগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা প্রভাবিত ছিল। বামকণা এভাবেই ঢাকার বাইরে ছড়িয়েছে। ধর্মীয় ঘরানার লোকজন শিল্পসাহিত্য, সাংবাদিকতা চর্চার প্রতি উদাসীন থাকার সুযোগে বামচিন্তা ফাঁকা মাঠ পেয়ে গিয়েছিল। সাতচল্লিশের আগে থেকেই শিল্পসাহিত্যের লোকজন চিন্তাচেতনায় বামাচারী ছিলেন ঢাকার শিল্পসাহিত্যে বাংগালি জাতীয়তাবাদের ধেনো আসত ওপার থেকে। পরিকল্পিতভাবেই। যার অনিবার্য পরিণতি ভাষা আন্দোলন হয়ে একাত্তর। পিন্ডির অদূরদর্শিতা, অহংকার তো ছিলই।

ওপারে যেভাবে বামরেণু সমাজের গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল, এপারে সেভাবে দাঁত বসাতে পারেনি। বামেরা ঢাকার বাইরে বেরোতে পারেনি। বাংলার মুসলমানদের গভীর ধর্মবোধ এর প্রধান কারণ। বামদের তত্ত্বের জটিল কচকচানিও কম দায়ী নয়। লেনিন-স্টালিনের নৃশংস শাসন, উত্তরবঙ্গে সর্বহারাদের ডাকাতি, নকশাল আন্দোলনের ব্যর্থতার চিত্রও সবার সামনে দগদগে হয়ে ছিল। ওপারবাংলাতেও ধীরে ধীরে বামমোহ কেটে যাচ্ছিল। বামেরা ক্ষমতার মোহে মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভুলে গিয়েছিল। নেতারা ক্ষমতালোভী আর স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিল। দল নেতারা নিজেকে সমালোচনার উর্ধে তুলে ফেলেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, সবকিছু রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকবে, ব্যক্তিমালিকানা বলতে কিছু থাকবে না, এই চিন্তাটাই তো চরম মূর্খতাসুলভ। কোথাও এই চিন্তার সফল বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে? হয়নি। আমি পরিশ্রম করব, ফসল বুনব, দিনশেষে উৎপাদিত ফসলের মালিক হয়ে যাবে রাষ্ট্র, সুস্থ বিবেকবুদ্ধি এই চিন্তা গ্রহণ করতে পারে না। জোর করে কমুনিজম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে, চীনে লাখো মানুষকে বলি দেয়া হয়েছে, তারপরও কাজ হয়নি।

কড়া বাঁম থেকে আব্বাজান এভাবে ডানে মোড় নিবেন, কাছেপিঠের কেউ আগে টেরটিও পায়নি। বাম আন্দোলনে জড়িয়েছেন কলকাতায় পড়াশোনার সুবাদে। কলকাতার পাট চুকিয়ে স্থায়ীভাবে গ্রামে চলে আসার পর আব্বাজান জীবনের বাঁক বদল করেছেন। দাদাজানও ফুরফুরা শরীফের মুরিদ ছিলেন। ছেলেবেলাতেই আব্বাজানকে মুরিদ করিয়ে নিয়েছিলেন। দাদাজান জৌনপুর সিলসিলার সাথেও গভীর সম্পর্ক রেখে চলতেন। দাদিজান ছিলেন জৌনপুরি সিলসিলার মেয়ে। দাদাজান শ্বশুরবাড়িতে গেলে জৌনপুর তরিকার লোকজনের সাথেই ওঠাবসা করতে হত। আমাকে দেওবন্দ ঘরানার মাদরাসায় ভর্তি করানোর পর পারিবারিক সিলসিলায় নতুন বাঁক তৈরি হয়েছে। আব্বাজান বুঝতে পেরেছিলেন, সন্তানকে প্রকৃত ইলম শেখাতে হলে দেওবন্দ ঘরানার মাদরাসায় ভর্তি করানোর বিকল্প নেই। দাদাজান আব্বাজান আদর্শিকভাবে সাইয়েদ আহমাদ শহীদ রহ.-এর আদর্শ লালন-ধারণ করতেন। তাদের কর্মপন্থা সামনে রেখে কীভাবে বাংলায় দ্বীনের তাবলীগ করা যায়, নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করতেন।

আল্লাহ তাআলা আমাকে অসাধারণ এক পিতার সন্তান করেছেন, এক অসাধারণ মানুষের দোস্তি দান করেছেন। যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়, দেওবন্দ থেকে আমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি কী? এককথায় বলব- মাওলানা আসলামের দোস্তি আল্লাহ তাআলার আজীব কুদরত দুজনকে বাংলা বিহার থেকে নিয়ে দেওবন্দে একত্র করেছেন। দুজনের আগ্রহের কেন্দুবিন্দুও প্রায় এক। মাওলানা আসলাম তার পূর্বসূরি সম্রাট শেরশাহকে আদর্শ মানেন। আমার আদর্শ শাসক হচ্ছেন দুইজন, ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ।

বখতিয়ার খিলজি (১১৬০-১২০৬) বাংলা আক্রমণ করেছিলেন ১২০৫ সালে। সেন বংশের সর্বশেষ রাজা লক্ষণসেনকে পরাজিত করেছিলেন। দিল্লীর প্রথম মুসলিম সালতানাতের নাম মামলুক সালতানাত (দাসবংশ) এর প্রতিষ্ঠাতা কুতবুদ্দীন আইবেক (১১৫০-১২১০) এই সালতানাত প্রায় চুরাশি বছর (১২০৬-১২৯০) দিল্লী শাসন করেছিল। এই মামলুক সালতানাতের পঞ্চম সুলতান ছিলেন রাজিয়া সুলতানা (১২০৫-১২৪০) ভারতের প্রথম একমাত্র মহিলা সুলতান। বখতিয়ার খিলজী আপন বাহুবলে বাংলা দখল করলেও সুলতান কুতবুদ্দীন আইবেকের নামে খুতবাপাঠ মুদ্রা চালু করেছিলেন। নিজেকে স্বাধীন শাসক ঘোষণা দেননি।

বাংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩০০-১৩৫৮) তিনিই সর্বপ্রথম অখ- বাংলা বিহারের শাসক ছিলেন। একদম শূন্য হাতে শুরু করে লক্ষ ৩২ হাজার বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত তার সালতানাত বিস্তৃত করেছিলেন। দিল্লীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনিই সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলা গঠন করেছিলেন। দিল্লীর ফিরোজ শাহ তুঘলক (১৩০৯-১৩৮৮) সেনাবাহিনী নিয়ে স্বয়ং ইলিয়াস শাহের রাজধানী পাণ্ডুয়া আক্রমণ করেন। দীর্ঘদিন যুদ্ধ করেও দিল্লীর সুলতান বাংলার সুলতানকে পরাজিত করতে পারলেন না। ফিরোজ শাহ বাধ্য হয়ে ইলিয়াস শাহের কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠালেন। কোনো রকম মুখরক্ষামূলক সন্ধি করে ব্যর্থ মনোরথে দিল্লী ফিরে গেলেন। বঙ্গবিজেতা বখতিয়ার খিলজির মতো মানুষ যেখানে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে নেপাল অভিযানে বিপর্যস্ত হয়ে ফিরে এসেছিলেন, অসম সাহসী ইলিয়াস শাহ দেড়শ বছর পর ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে নেপালে অভিযান চালিয়ে কাঠমা- দখল করেছিলেন। তিনিই বাংগালির প্রথম জাতীয় নেতা। কাউকে জাতির পিতা বলতে হলে, শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহকেই বলা উচিত। বৃহত্তর বাংলা বললে যে বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের চিত্র মাথায় আসে, সেটা ইলিয়াস শাহের গঠন করা সালতানাতেরই ফলাফল।

ফখরউদ্দীন মুবারক শাহ

: ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ (১৩০০-১৩৪৯) নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জাতিতে তুর্কি ছিলেন। ভাগ্যের অন্বেষণে সোনারগাঁওয়ের প্রশাসক বাহরাম খানের দেহরক্ষীর চাকরি নিয়েছেন। তখন বাংলার রাজধানী ছিল লখনৌতি। এখনকার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা ভারতের মালদহ জেলার গৌড় এলাকার মিলিত রূপই লখনৌতি। দিল্লি থেকে গভর্নর নিয়োগ দেয়া হত লখনৌতিতে। দিল্লি থেকে বহুদূরে হওয়ার কারণে এদিককার খোঁজখবর রাখা মুশকিল হয়ে যেত। কদিন পরপর বাংলা থেকে বিদ্রোহের সংবাদ শুনতে শুনতে দিল্লির শাসকরা তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিল। তুঘলক শাসনামলে (১৩২০-১৪১৪) সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক এবং তার সন্তান মুহাম্মদ বিন তুঘলক লখনৌতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলাদা করে ভাবতে বাধ্য হন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, লখনৌতিকে অখণ্ড রেখে দিলে একের এক বিদ্রোহ লেগেই থাকবে। শাসনের সুবিধার্থে লখনৌতিকে তিনটি প্রশাসনিক অংশে ভাগ করে নিলেন।

. লখনৌতি।

. সপ্তগ্রাম (পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়া চুঁচুড়া)

. সুবর্ণগ্রাম (বর্তমানে সোনারগাঁও)

মুহাম্মদ বিন তুঘলক আনুগত্যের উপহার হিসেবে সেনাপতি বাহরাম খানকে সুবর্ণগ্রামের প্রশাসক নিযুক্ত করেছেন। বাহরাম খানের একজন দেহরক্ষীর নাম ছিল ফখর। মেধা, যোগ্যতা, অসম সাহসের অধিকারী ফখর ধীরে ধীরে বাহরাম খানের ডানহাতে পরিণত হয়েছিলেন। ১৩৩৮ সালে মারা যান বাহরাম খান। সেই সুযোগে সুবর্ণগ্রামকে স্বাধীন ঘোষণা দিয়ে গদিতে বসেন ফখর। নামধারণ করেন ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ।

মুহাম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে নির্দেশ পাঠালেন লখনৌতির প্রশাসক কদর খানকে, সুবর্ণগ্রাম আক্রমণ করে ফখরকে দমন করতে। সপ্তগ্রামের প্রশাসক আজম-উল-মুলকও কদর খানের সাথে যোগ দিয়েছিল। এমনকিছু ঘটতে পারে দূরদর্শী ফখরউদ্দীন আগেই ভেবে রেখেছিলেন। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নৌবহর তৈরি করে রেখেছিলেন। সম্মিলিত দিল্লিবাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি বেশিক্ষণ টিকতে পারবেন না, তো জানা কথা। সামান্য লড়াই করেই ফখরউদ্দীন নৌবহর নিয়ে মেঘনা পার হয়ে ওপারে চলে গেলেন। আগে থেকেই ছক কষা ছিল। সময় থাকতেই পর্যাপ্ত রসদ, ধনসম্পদ নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রেখেছিলেন। মেঘনার পূর্বতীরবর্তী গ্রামাঞ্চলে ওঁৎ পেতে বসে থাকলেন ফখরউদ্দীন। কদর খান আজমের নৌশক্তি না থাকায় ফখরউদ্দিনকে ধাওয়া করতে পারলেন না। নিতে পারলেন না। সুবর্ণগ্রাম জয়ের পর নিজের ভাগের সম্পদ নিয়ে সপ্তগ্রামে ফিরে গেলেন আজম-উল-মুলক। দখল পাকাপোক্ত করতে কদর খান আরো কিছুদিন সুবর্ণগ্রামে থেকে যাওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করলেন। দেখতে দেখতে বর্ষা চলে এলো। ক্রমাগত বৃষ্টি, পানির স্রোত, প্রতিকূল আবহাওয়া কদর খানকে বেকায়দায় ফেলে দিল। পথঘাট ডুবে যাওয়ায় দেখা দিলো চরম খাদ্য সংকট। ক্ষুধার জ্বালায় সৈনিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হল। সুযোগ কাজে লাগাতে বিলম্ব করলেন না ফখরউদ্দীন। দ্বিধাবিভক্ত দিল্লিসেনাদের কাছে পারিতোষিক পাঠালেন ফখরউদ্দিন। অবস্থা বুঝে নিজেও নৌবহর নিয়ে অতর্কিতে হামলা চালালেন। সহজেই পুনরুদ্ধার হল সুবর্ণগ্রাম।

ফখরউদ্দিনের জানা ছিল, তার শাসক হয়ে বসাটা অন্যদের চোখে অস্বাভাবিক ঠেকবে। তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতা লাভ করেননি। লখনৌতি বা সপ্তগ্রাম আবার হামলা আসতে পারে। ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে রাজ্যসীমা শক্তি বাড়িয়ে তুলতে হবে। পূর্বদিকের সমতট অঞ্চলের দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর দখলে রাখতে পারলে টাকার অভাব হবে না। জাভা, সিংহল, সুমাত্রা, আরব থেকে এখানে একের পর এক বাণিজ্যজাহাজ ভেড়ে। সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে, বিপুল রাজস্ব আয় হবে। এমন চিন্তা থেকেই ফখরউদ্দীন সেনা অভিযান শুরু করলেন।

সমতট অঞ্চলে প্রায় দুইশ বছর (১২-১৪ শতক) ধরে দেব রাজবংশের শাসন চলেছিল। তাদের রাজধানী ছিল তিন জায়গায়, চট্টগ্রামের পটিয়া, কুমিল্লার ময়নামতিতে, ঢাকার বিক্রমপুরে। অভ্যন্তরীন কোন্দলে দেব রাজবংশ দুর্বল হয়ে পড়লে কুমিল্লা, চট্রগ্রামসহ বেশ কিছু অঞ্চল ত্রিপুরারাজের অধীনে চলে গিয়েছিল। একবছর ধরে অভিযানের প্রস্তুতি চলল। গড়ে তুললেন প্রশিক্ষিত পদাতিক নৌবাহিনী। ১৩৩৯ সালে কুমিল্লায় পরাজিত করলেন ত্রিপুরারাজাকে। যুদ্ধ করতে করতে নোয়াখালী হয়ে চট্টগ্রামে প্রবেশ করলেন। দিকে এগিয়ে গেলেন। চট্টগ্রাম অভিযানে বারোজন পীর-আউলিয়া তার সাথে যোগ দিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের পর বারো আউলিয়া চট্টগ্রামেই তাদের খানকা স্থাপন করে ইসলাম প্রচার শুরু করেছেন। এখান থেকেই বারো আউলিয়ার দেশ কথার উৎপত্তি। ফখরউদ্দীন চট্টগ্রাম বন্দরকে ঢেলে সাজালেন। মুসলিম শাসনের আওতায় আসায় চট্টগ্রামে আরব বণিক-দাঈগণের আনাগোনা বৃদ্ধি পেল। সাথে বাড়ল সমুদ্রবাণিজ্য, রাজস্ব আয়।

ফখরউদ্দীন স্থলবাহিনীর সাথে নৌবাহিনী গঠনেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বন্দরে জাহাজনির্মাণশিল্পকেও পৃষ্ঠপোষকতা করলেন। চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে দেশের যাতায়াত নির্বিঘœ করতে চট্টগ্রাম থেকে ফেনী-নোয়াখালি হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত বিরাট রাজপথ নির্মাণ করেছিলেন। জন্মভূমি বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিনি বহু মসজিদ, সরাইখানা, দিঘি স্থাপন করেছিলেন। ফেনীতে ফখরউদ্দিনের মসজিদ, চৌদ্দগ্রামের ফখরউদ্দিনের দিঘি এখনও সগৌরবে টিকে আছে। ফেনি শহরে ফখরউদ্দীনের সময়কার বিশালাকায় বৃক্ষ আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

চট্টগ্রামের পর ফখরউদ্দীন নজর দিলের শ্রীহট্ট (সিলেট)-এর দিকে। শ্রীহট্টে আগে থেকেই শাহ জালাল রহ. (১২৭১-১৩৪৬) মুসলিম শাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। তিনি ফখরউদ্দীনের বাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন। শাহ জালাল ইয়ামানির মতো কামেল পীরের সান্নিধ্যে এসে ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, এতদাঞ্চলে ধর্ম রাজ্য বিস্তারের জন্য পীর-আউলিয়ার সাহায্য-সমর্থন লাভের বিকল্প নেই। ফখরউদ্দীন পীর-দরবেশ, আলিম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় নিয়ে আসেন। সুবর্ণগ্রামের ওপর দিয়ে যাতায়াতকারী পীর-দরবেশগণের বিনামূল্যে থাকাখাওয়া রাহাখরচার ব্যবস্থা করে দিতেন।

ফখরউদ্দীনের শাসনামলেই ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৭৮) বাংলা সফরে এসেছিলেন। তিনি মূলত শাহ জালাল রহ-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বাংলায় আগমন (১৩৪৬) করেছিলেন। ইবনে বতুতার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন ফখরউদ্দীন। শুধু তাই নয়, হাতখরচের জন্য দৈনিক আধা দিনার বরাদ্দ করেছিলেন। বাংলার শস্যফসল, ধনসম্পদ, মাছগোশতের প্রাচুর্য, ব্যবসাবাণিজ্য নৌবহর দেখে মুগ্ধবিস্মিত হয়েছিলেন ইবনে বতুতা। তার সফরনামাতে বলেছিলেন, ফখরউদ্দিন চমৎকার জনপ্রিয় একজন শাসক, মুসাফির, দরবেশ সুফিদের প্রতি তার অগাধ অকৃত্রিম ভালোবাসা।

দীর্ঘ এগারো বছর বাংলা শাসন করেছিলেন ফখরউদ্দিন। তার শাসনামলে বাংলাসীমান্তের পূর্বদিকের রেখা চিরদিনের জন্য স্থায়ী হয়ে গিয়েছে। সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা স্থায়ীভাবে বাংলার অংশ হয়ে গিয়েছিল। ত্রিপুরা আরাকান রাজারা বারবার আক্রমণ করেও এই অঞ্চলগুলো দখলে নিতে পারেনি।

শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ

ভাগ্যের অন্বেষণে জন্মভূমি সিস্তান থেকে দিল্লিতে আসেন ইলিয়াস। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসন চলছে দিল্লিতে। দুধভাই আলি মুবারকের সুপারিশে চাকরি হল সুলতানের চাচাত ভাই ফিরোজের দফতরে। ফিরোজের সাথে দ্বন্দ্বের জেরে ইলিয়াস বাংলায় চলে আসেন। সপ্তগ্রামে এসে আলাউদ্দীন আলি শাহের সেনাবাহিনীতে চাকুরি নেন। নিজ যোগ্যতাবলে পদোন্নতি লাভ করতে করতে সেনাপতির পদ লাভ করেন। দেহরক্ষীর হাতে আলাউদ্দীন আলী শাহ নিহত হলে সেনাপতি ইলিয়াস নিজেকে শাসক ঘোষণা করেন। তখন ১৩৪২ সাল। অভিজ্ঞ ইলিয়াস শাহ মসনদে বসেই নিজেকে প্রতিষ্ঠার কাজে লেগে গেলেন। প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর প্রতি মনোযোগ দিলেন,

: আগে ঘোড়সওয়ার বাহিনীতে শুধুই মুসলিমদের ভর্তি করা হত। তিনি হিন্দুদেরও ভর্তি শুরু করলেন। পদাতিক বাহিনী আর প্রশাসনেও যোগ্য হিন্দুদের পদায়ন করলেন।

. বাংলা নদীমাতৃক অঞ্চল। এখানে কৃষির মতো নৌপেশাতেও বিপুল লোকজন। নদী অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রতিটি মানুষই কমবেশ নৌ-অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। তাদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে চৌকশ নৌবহর গড়ে তুললেন।

. প্রস্তুতি শেষ। উড়িষ্যায় অভিযান চালিয়ে দখল করে নিলেন। তারপর একে একে জয়পুর, কটক, চিল্কায় হ্রদ জয় করলেন। বিপুল ধনরতœ নিয়ে সপ্তগ্রামে ফিরলেন।

. এবার উত্তর সীমান্তের পার্বত্য দেশগুলোর দিকে নজর দিলেন। প্রায় ১০০ বছর আগে বখতিয়ার খিলজি তিব্বত অভিযানে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেটা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিলেন। ১৩৫০ সালে নেপালের দিকে অগ্রসর হলেন। নেপালি সৈন্যরা আগেরবার বখতিয়ার খলজিকে পরাজিত করলেও, ইলিয়াস শাহের সাথে সুবিধা করতে পারল না। দুর্গম নেপাল দখল করলেও ধরে রাখলেন না। যেখানে যত ধনসম্পদ পেয়েছেন, কুড়িয়ে ফিরে এলেন।

. ১৩৫১ সালে সিন্ধু অভিযানকালে দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক অসুস্থ হয়ে মারা যান। মুহাম্মাদ বিন তুঘলকের কোনো উত্তরাধিকারী না থাকায় সভাসদদের পরামর্শমতে চাচাতো ভাই ফিরোজ বিনরজবকে সিংহাসনে বসানো হয়। ফিরোজের সাথে ইলিয়াসের পুরনো দ্বন্দ্ব ছিল। ইলিয়াস বসে থাকার লোক নন। তিনি জানতেন ফিরোজ তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবেই। ফিরোজ বের হওয়ার আগে ১৩৫১ সালে ইলিয়াস নিজেই দিল্লির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। দখল করলেন গুরুত্বপূর্ণ ত্রিহুত। ফিরোজ দিল্লির মসনদ সাজাতে ব্যস্ত থাকায় এদিকে নজর দিতে পারেননি। ইলিয়াস তুফান গতিতে বিহার, উত্তর প্রদেশের চম্পারন, গোরখপুর, বেনারস দখল করলেন। তার ইচ্ছা ছিল এবার দিল্লির দিকে যাবে। পরামর্শকরা নিষেধ করা নিরস্ত হয়েছেন।

. সপ্তগ্রামে ফিরে সুবর্ণগ্রাম, লখনৌতি দখলে আনলেন। এবার পুরো বাংলা তার অধীনে চলে এল। পুরো রাজ্যের নাম দিলেন বাঙ্গালা নিজেকে ঘোষণা করলেন শাহ--বাঙ্গাল হিসেবে। ফিরোজ শাহ দিল্লি গুছিয়ে ইলিয়াসকে শায়েস্তা করার জন্য ১৩৫৩ সালে বাংলায় এলেন। ইলিয়াস আশ্রয় নিলেন সুরক্ষিত একঢালা দুর্গে। দীর্ঘদিন অবরোধ করার পরও ফিরোজ শাহ কিছুতেই একঢালা দুর্গ ভেদ করতে পারলেন না। এর মধ্যে বর্ষা চলে এল। দিল্লির সেনারা এমন বর্ষাবাদলের সাথে পরিচিত নয়। ইলিয়াসকে কোনো মতেই কাবু করতে না পেরে সম্মানজনক সন্ধি করে ১৩৫৪ সালে দিল্লি ফেরত গিয়েছিলেন ফিরোজ শাহ।

আমি আর দোস্ত আসলাম মিলে দীর্ঘদিন সময় লাগিয়ে উপমহাদেশের ইতিহাস নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করার চেষ্টা করেছি। পাঠনির্যাস হিসেবে আমরা কিছু মতামত দাঁড় করিয়েছিলাম। এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্মকে মাটি মানুষের শেকড়ের সাথে মিশিয়ে দিতে হলে কিছু কাজ করত হবে,

: নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মনীতি, কর্মনীতি সবকিছুতে বাস্তববুদ্ধি অর্জন করতে হবে।

. শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের কর্মনীতি সামনে রাখতে হবে। তাঁর মতো স্বাধীন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো পরিস্থিতি এখন হয়তো নেই, তারপরও তিনিই বাংলার একমাত্র সুন্নী শাসক, যার আদর্শ অনুসরণ করা যায়।

. তিনি নিজের প্রশাসনে মুসলিমের পাশাপাশি যোগ্য হিন্দুদেরও স্থান দিয়েছিলেন। এই অঞ্চলে হিন্দুদেরকে শত্রু মনে করা যাবে না। তাদেরকে কাছে রাখতে হবে। তাদের যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে হবে। ভবিষ্যতে যে আমার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে, তাকে চোখে চোখে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। বাদশাহ আলমগীরও এই কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

. ইলিয়াস শাহ নিজের সেনাবাহিনী সাজিয়েছিলেন দিল্লীর কথা মাথায় রেখে। দিল্লী সবসময় বাংলার শত্রু, একথা তিনি মাথায় রাখতেন। দিল্লির মোকাবেলা করার জন্য তিনি আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। এজন্য ফিরোজ শাহ তুঘলক তৎকালীন বাংলার রাজধানী আক্রমন-অবরোধ করেও সুবিধা করতে পারেননি। দিল্লী সবসময় বাংলাকে পদানত করে রাখতে চাইবে, বাংলার শাসক-জনগণকে একথা মাথায় রাখতে হবে। দিল্লীতে মুসলিম শাসন থাকলেও তার অধীনে থাকা বাংলার জন্য নিরাপদ নয়। কারণ, মুসলিমদের ভাগ্যবিড়ম্বনার জেরে কখনো দিল্লীর মসনদে অমুসলিম শক্তি বসলে, তখন বাংলার জন্য সেটা কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য বাংলাকে সবসময় তার স্বাধীন সত্ত্বা টিকিয়ে রাখা জরুরি। দিল্লির তাবেদারি করা শাসককে কোনোক্রমেই বাংলার শাসনক্ষমতা দেয়া যাবে না।

. বাংলায় নিরাপদ থাকলে হলে, সময়সুযোগ বুঝে আক্রমণাত্মক হতে হবে। ইলিয়াস শাহ যেভাবে আগ বাড়িয়ে নেপাল, উড়িষ্যা, বারানসি পর্যন্ত তুফানগতিতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি দিল্লী আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। দিল্লীকে চাপে না রাখলে দিল্লী চেপে ধরবে। দিল্লীর চোখে চোখ রেখে কথা না বললে, দিল্লি ঘাড়ে সওয়ার ধান্ধা খুঁজবে।

. নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করতে হবে। ইলিয়াস শাহ মসনদে বসেই এদিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। এক অপরাজেয় নৌবহর গড়ে তুলেছিলেন। বর্তমানে শক্তিশালী নৌ-বাহিনীর পাশাপাশি বিমানবাহিনীও গড়ে তুলতে হবে। বাংলাকে একটা প্রশ্ন সবসময় মাথায় রাখতে হবে। বাংলার সামরিক শক্তিবৃদ্ধিতে কারা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হবে? নিঃসন্দেহে দিল্লি। তাহলে দিল্লিই বাংলার বড় শত্রু। তাই বলে গায়ে পড়ে দিল্লির সাথে ঝগড়া বাঁধানো উচিত হবে না। দিল্লি হুমকি মনে করে, এমন কোনো দলমতকে প্রকাশ্যে প্রশ্রয় দিব না। সীমান্ত নিয়ে দিল্লীর সাথে সামান্যতম নমনীয়তা দেখাব না। ইলিয়াস শাহের কর্মনীতিও এমনটাই ছিল।

. বাংলার শাসক সামরিক বাহিনী যাতে বিষয়ে সচেতন থাকে, এজন্য দাওয়াতি কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। এমন যাতে না হয়, সামরিক বাহিনীকে ফুসলিয়ে ক্ষমতা দখল করার ফন্দি আঁটা হবে। তাহলে সামরিক বাহিনী সরকার উভয়ের চক্ষুশূলে পরিণত হতে হবে। আলিমের কাজ হবে হেকমতের সাথে দাওয়াত দেয়া। উপযুক্ত সময় সামর্থ হওয়ার আগে ক্ষমতা দখল করার পাঁয়তারা করলে, দাওয়াতের ক্ষেত্রই নষ্ট হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সুফি নুর কুতবুল আলম রহ.-এর আদর্শ সামনে রাখতে হবে।

. সুফি নুর কুতবুল আলমের পরিবার ছিলেন ইলিয়াস শাহী সালতানাতের পীর। দ্বিতীয় সুলতান সিকান্দার শাহের সরাসরি পীর ছিলেন সুফি নুর কুতবুল আলম রহ। পীরের পরামর্শক্রমেই প্রথমে বাবা তারপর বেটা সালতানাত--বাঙ্গালা শাসন করে গেছেন। সালতানাতের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন।

. ওলামায়ে কেরাম দাঈগণের কর্মপন্থা হবে সুফি নুর কুতবুল আলমের মতো। তিনি প্রশাসনের বাইরে থেকে ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে গেছেন। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজেও লাগিয়েছেন।

.

(পরবর্তী পোস্ট দ্রষ্টব্য)

লেখায় তথ্যগত, তত্ত্বগত কোনো ভুল ধরা পড়লে, কোনো বক্তব্যে খটকা লাগলে, কোনো কথায় অসঙ্গতি চোখে পড়লে, ধরিয়ে দেয়ার বিনীত অনুরোধ। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।


মূল লেখা

https://www.facebook.com/story.php?story_fbid=24126788890289139&id=100001540931061&rdid=mNgIrX8TFOfHNw5Y#