Sunday, July 13, 2025

দ্বিখণ্ডিত ভালোবাসা- মাওলানা আতিক উল্লাহ ১৪.০৭.২০২৫


(আগের পোস্টের পর থেকে)
---
রাজা গনেশ
ইলিয়াস শাহের নাতি সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের দরবারে এক হিন্দু সভাসদ ছিল, নাম রাজা গনেশ (১৩৭০-১৪২২)। গনেশ দিনাজপুরের ভাতুরিয়ার জমিদার ছিল। মনে মনে ইসলাম, মুসলমান, মুসলিম শাসনের প্রতি তীব্র আক্রোশ পুষে রাখত। সুযোগ পেলেই বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল হানত। গনেশ ছিল ঠা-া মাথার লোক। সে জানত, সরাসরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে পারবে না। ছলেবলেকৌশলে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বাংলার বুক থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের চিনহ মুছে দেয়ার জন্য সুদূরপ্রসারী এক পরিকল্পনা হাতে নিল। কৌশলে সুলতানের দরবারে ঢুকে পড়ল। ইলিয়াসশাহী সুলতানগণ হিন্দু-বৌদ্ধদের প্রতি উদার ছিলেন। হিন্দু গনেশ এই উদারতাকেই কাজে লাগিয়েছিল। নানা কৌশলে দরবারে প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে চলেছিল। গনেশ সবকিছু করত পর্দার আড়াল থেকে। সামনে আসত না।
১২০৬ সালে বখতিয়ার খিলজীর ইনতিকালের পর থেকে ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত ১৩২ বছরে প্রায় ২৩ জন মুসলিম শাসনকর্তা বাংলাদেশ শাসন করেছেন। কথিত আছে, গনেশের ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ শাহাদাতবরণ করেন। এরপর ১৪১০ থেকে ১৪১৪ সাল পর্যন্ত ইলিয়াশাহী বংশের সাইফউদ্দীন হামজা শাহ, শিহাবউদ্দীন বায়েজিদ শাহ ও আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ একের পর এক বাংলার সুলতান হন। বলা হয়ে থাকে, গণেশের চক্রান্তে তারা সকলেই নিহত হন। শিহাবউদ্দীনকে হত্যা করার পর তাঁর বালকপুত্র আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহকে রাজা হিসেবে খাড়া করে, গনেশ নিজেই কার্যত রাজা হয়ে বসেছিল। কিছুদিন পর যখন বুঝতে পারল, কাউকে আর শিখ-ী না রাখলেও চলবে, তখন ফিরোজ শাহকে হত্যা করে গণেশ ১৪১৫ সালে সিংহাসন দখল করেছিল। এতদিন তার মুসলিমবিদ্বেষ চাপা ছিল। মসনদে বসেই গনেশ আসল রূপে আবির্ভুত হল। শায়খ বদরুল ইসলাম ও তাঁর পুত্র ফয়জুল ইসলাম গণেশকে অবনত মস্তকে সালাম না করার কারণে গনেশ বেজায় ক্রুদ্ধ হয়েছিল। গনেশ সংকল্প করল, শায়খ বদরুল ইসলামকে তার সামনে মাথা নত করিয়েই ছাড়বে। শায়খকে দরবারে তলব করা হল। প্রবেশমুখ এতটা সংকীণ আর নিচু করে তৈরী করা হয়েছিল, উপুড় হয়ে প্রবেশ করা ছাড়া উপায় ছিল না। দুষ্টরাজার দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরে শায়খ প্রথমে পা এগিয়ে দিয়ে ভিতরে রেখে, মাথা নত না করেই ভেতরে প্রবেশ করলেন। মুসলমান আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করতে পারে না। হিংস্র গণেশ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে শায়খকে শহীদ করে দিয়েছিল। গনেশের বর্বরতা এখানেই শেষ নয়, বহু আলেমকে নদীতে ডুবিয়ে শহীদ করেছিল।
গনেশের বর্বরতা দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সুফি নুর কুতবুল আলম ভীষণ পেরেশান ছিলেন। জৌনপুরের শাসক সুলতান ইবরাহিম শর্কি ছিলেন সুফি সাহেবের অনুরক্ত। সুলতানের কাছে সাহায্য চেয়ে দূত পাঠালেন সুফি নুর কুতবুল আলম। সুলতান বিরাট বাহিনী নিয়ে বাংলার অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। গনেশ এই সংবাদ পেয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। দৌড়ে সুফি সাহেবের দরবারে হাজির হল। কাকুতিমিনতি করে বলল,
-আমাকে বাঁচান। আমি আর কোনো অন্যায় করব না। আপনার কথামতো রাজ্য শাসন করব।
-একশর্তে সুলতান ইবরাহিম শর্কিকে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করতে পারি, যদি তুমি ইসলাম গ্রহণ করো।
ধূর্ত গনেশ পাল্টা প্রস্তাব হাজির করল,
-আমার ছেলে যদুকে মুসলমান বানিয়ে মসনদে বসিয়ে আমি সরে দাঁড়াব।
সুফি সাহেব প্রস্তাব মেনে নিলেন। যদুকে জালালুদ্দীন নাম দিয়ে বাংলার মসনদে বসানো হল। সুলতান ইবরাহিম শর্কি ফিরে যেতেই ধূর্ত গনেশ স্বমূর্তি ধারণ করল। ছেলেকে সরিয়ে আবার মসনদ দখল করল। সুবর্ণধেনু ব্রতের মাধ্যমে জালালুদ্দীনকে শুদ্ধ করে যদুতে রূপান্তরিত করা হল। শুদ্ধিকরণের পর গনেশ আরো হিং¯্র আর বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। সুফি নুর কুতবুল আলমের পুত্র ও নাতিকে নির্যাতন করে শহীদ করে দিয়েছিল। এভাবে সাত বছর মুসলিম বাংলায় এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেছিল। মুসলমানদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। বিখ্যাত আদিনা মসজিদকে কাচারি বাড়িতে পরিণত করেন। গণেশের মৃত্যুর জালালউদ্দীন (যদু) আবার সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। গনেশের নেতৃত্বে কিছুকালের জন্য বর্ণহিন্দুদের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল। এর মোকাবিলায় সেকালের আলিম, পীরদরবেশগণ মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে সাধ্যমতো প্রতিরোধ সংগ্রামে চালিয়ে গিয়েছিলেন।
শ্রীচৈতন্য (১৪৮৬-১৫৩৩)
গণেশের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর বর্ণহিন্দুরা বৈদিক সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু করে। বিদ্যাৎসাহী মুসলিম সুলতানগণ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থাদি বাংলায় অনুবাদ করার ব্যাপারে বিপুল উৎসাহ প্রদান করেন। শ্রীকৃষ্ণ বিজয়কাব্য, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থ মুসলিম শাসকদের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত থেকে বাংলায় ভাষান্তর করা হয়। মুসলিম সুলতানদের আশ্রয়, প্রশ্রয় ও আশকারা পেয়ে হিন্দুরা আবার তলে তলে পুনর্গঠিত হতে শুরু করেছিল। গনেশের ব্যর্থতায় উগ্রহিন্দুরা বুঝতে পেরেছিল, শক্তিতে বাংলায় তারা মুসলমানদের তখতেশাহি ওল্টাতে পারবে না। আবার চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও চলবে না।
হিন্দুধর্মের তখন শোচনীয় অবস্থা। ব্রাম্মণদের চরম দৌরাত্ম্য, জাতপ্রথার ভয়ংকর বৈষম্য হিন্দুসমাজকে অবক্ষয়ের শেষসীমায় পৌঁছে দিয়েছিল। নিচু জাতের লোকজন মন্দিরে প্রবেশ করতে পারত না। ধর্মীয় আচার পালন করতে পারত না, এমনকি সমাজে তাদের মেলামেশাও সীমাবদ্ধ ছিল। তাছাড়া হিন্দুধর্মের আচারকর্ম ছিল জটিল, দুর্বোধ্য ও পুরোহিতনির্ভর।
শাস্ত্রীয় হিন্দুধর্ম ছিল দুর্বোধ্য। সাধারণ মানুষ ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল।
তান্ত্রিক ও কুলীন প্রথা, বহুবিবাহ, যৌতুক, নারী অবমাননা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তন্ত্রের নামে অনৈতিক আচরণ, দেব-দেবীর নাম ব্যবহার করে লালসার পূজা ও গোপনাচার ব্যাপক হয়ে পড়েছিল। নারীকে পূর্ণ ধর্মীয় অধিকার ছিল না। নি¤œবর্ণের হিন্দুরা শিক্ষা, উপাসনা, ধর্মগ্রন্থ পাঠ, এমনকি সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারত না।
বিপরীত ইসলামের সহজসরল ব্যাখ্যা, জটিলতামুক্ত সহজিয়া আচার-ইবাদত, জাতপাতহীন বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থা, নারীর প্রতি সম্মান, মসজিদে সবার সমান অধিকার, ধর্মগ্রন্থ পাঠের স্বাধীনতা, ধর্মচর্চার অবাধ সুযোগ- যুগ যুগ ধরে অবহেলিত নিম্নবর্ণের হিন্দুসমাজকে ভীষণ মুগ্ধ করেছিল। দলে দলে তারা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করেছিল। নিজের ঘর উজাড় হতে দেখে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের টনক নড়ল। এভাবে চলতে থাকলে উচ্চবর্ণের কিছু হিন্দু ছাড়া বাকি সবাই মুসলিম হয়ে যাবে। কিছু একটা করতে হবে। তখনই নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব ঘটেছিল। গণহারে ধর্মান্তর ঠেকানো হিন্দুদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। হিন্দুধর্মের এমন এক ব্যাখ্যা ও রূপ সামনে আনা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল, যার আকর্ষণে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ধর্মত্যাগ করবে না।
বৈষ্ণব আন্দোলন
শ্রীচৈতন্য এই কাজটাই করেছিল। হিন্দুধর্মের সহজিয়া রূপ হাজির করেছিল। এই রূপটিই বৈষ্ণব ধর্ম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতার, বিশেষ করে শ্রীকৃষ্ণ ও রামচন্দ্রের প্রতি একনিষ্ঠ ভক্তি ও প্রেমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বৈষ্ণব মতবাদ। বিষ্ণুর প্রেমকে ঘিরেই এই মতবাদ, তাই এর নাম বৈষ্ণব। এর মূলকথা হল,
ভক্তিই মুক্তির প্রধান পথ। যজ্ঞ, তপস্যা, জ্ঞানচর্চা বা কঠোর আচারের বদলে, স্নেহমায়াভরে ভগবানের নাম জপ ও তাঁর প্রেমে আত্মসমর্পণ করাই মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায়। একেই বলা হয় ‘ভক্তিযোগ’। হরিনাম সংকীর্তন অর্থাৎ ভগবানের নামগান, যেমন: ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’, শ্রেষ্ঠ উপাসনা। নামসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে আত্মার মুক্তি ঘটে।
ইসলামের মুখোমুখি হয়ে হিন্দুধর্মের যেসব ঘাটতি প্রকটভাবে ধরা পড়েছিল, শ্রীচৈতন্য সেগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য পাল্টা ‘বয়ান’ তৈরি করেছিল। সহজভাবে ভগবানের নাম স্মরণ (নামসংকীর্তন), জাতপাতের ঊর্ধ্বে সাম্য, নারী ও দলিতদের ধর্মীয় মর্যাদা, হৃদয়ের ভক্তি ও প্রেমই মুখ্য, এমন মতবাদ প্রচার করে বাংলার হিন্দুদের মধ্যে এক নবজাগরণ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। হিন্দুদের ধর্মান্তরের স্রোত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
শ্রীচৈতন্য তার সহজিয়া বৈষ্ণব মতবাদ প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে নিয়মিত নবদ্বীপের রাস্তায় ধর্মীয় মিছিল বের করত। মিছিলে খোল-করতাল বাজিয়ে গাইতে গাইতে, নাচতে নাচতে হরিনামসংকীর্তন করত। লোকজনও এমন গানবাদ্যিতে আনন্দ পেয়ে গেল। সাধারণ মানুষের কাছে ধর্ম এতদিন জটিল শাস্ত্রকথা, পুরোহিত আর মন্দিরনির্ভর ছিল।
শ্রৈচৈতন্যের মাধ্যমে ধর্মটা ঘরে ঘরে, হাতে হাতে, রাস্তাঘাটে নেমে এসেছে। পাশাপাশি আনন্দও আছে, আর কি চাই। শ্রীচৈতন্য বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল, এভাবে ভক্তিভরে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ জপলে, মুক্তি পাওয়া যাবে, মোক্ষ লাভ হবে। মুক্তি ও মোক্ষ খুবই সহজ ও আনন্দকর।
মতবাদের মোকাবেলা মতবাদ দিয়ে করতে হয়। ইসলামের সহজসরল রূপের মোকাবেলায় হিন্দুরা পাল্টা তাদের ধর্মের সহজসরল রূপ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। তাতে তারা সফলও হয়েছে। বৈষ্ণবধর্মের পর মুসলিম দাঈগণ ঠিক সেভাবে পাল্টা ‘বয়ান’ তৈরি করতে পারেননি।
শ্রীচৈতন্য-বৈষ্ণব মতবাদ একদিনে তৈরি হয়নি। অনেককিছুর সাথে মুসলিম সুলতানদের উদারতাও এর পেছনে ক্রীয়াশীল ছিল। বাগদাদের আব্বাসী খলীফাদের মতো বাংলার সুলতানদেরও কুরআন-সুন্নাহ ছেড়ে পার্থিব সাহিত্য-দর্শনচর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতার মোহ পেয়ে বসেছিল। কিছু আব্বাসী খলিফার কাছে কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ ইলমের চেয়ে গ্রীকদর্শনের বস্তাপঁচা কুটিল তত্ত্বকে বেশি উপাদেয় মনে হয়েছিল। বাংলার সুলতানগণ সমৃদ্ধ আরবী তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, আরবীকাব্য বাংলায় অনুবাদ না করে হিন্দুদের বইপত্র অনুবাদে মনোযোগ দিয়েছিলেন। সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের আমল থেকে এই ধারা শুরু হলেও, সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯)-এর আমলে চরম আকার ধারণ করেছিল।
মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুদিত ও রচিত মঙ্গলকাব্যের প্লাবনে সাধারণ মুসলিম সমাজের বিশুদ্ধ আকীদাবিশ^াস ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সাধারণ মুসলিম শ্রীচৈতন্যের গানবাদ্যি, খোলকরতালে প্রভাবিত হয়ে পড়ছিল। চৈতন্য জনসমক্ষে মিছিলের ভঙ্গিতে নাচ, গান, নামসংকীর্তন করে বিশৃঙ্খলা করেছিল, রাতের সমস্বরে হরিনাম জপের নামে মানুষের ঘুমে ব্যঘাত ঘটিয়ে চলছিল। নবদ্বীপের কাজি চৈতন্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গেলে, চৈতন্য প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে কাজির বাড়ি অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। আলাউদ্দীন হুসেন শাহের কাছে বিচার দিয়েও কাজ হয়নি। তিনি চৈতন্যকে ছাড় দেয়ার পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি হিন্দুয়ানি সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বুঁদ ছিলেন। সুলতানের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চৈতন্য-বৈষ্ণবদের বাড় হাজারগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
সুলতানগণ মুসলিম রাষ্ট্রগঠনে যতটা মনোযোগী ছিলেন, মুসলিম জাতিগঠনে ততটা ছিলেন না। মুসলিম শাসকদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসচেতনতার সুযোগ ষোলোয়ানা কাজে লাগিয়েছিল চৈতন্য-বৈষ্ণবরা। স্বাধীন সুলতানি আমলের শেষভাগে হিন্দুদের সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠেছিল। মুসলমানদের পক্ষ থেকে পাল্টা উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় জনগণের মুখের ভাষা বাংলা যথেষ্ট সমৃদ্ধি, পরিণতি অর্জন করেছিল। দুঃখের বিষয় হল, সুলতানদের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা বাংলা সাহিত্য এমন একটি রূপ লাভ করেছিল, যাতে মুসলমানদের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক জীবনের যথার্থ প্রতিফলন ছিল না। সুলতানগণ এমন বাংলাসাহিত্যের ধারকবাহক হয়েছিলেন, যা তার ঘরের ঈমান-আকীদার মূলে কুঠারাঘাত করে চলছিল প্রতিনিয়ত। অথচ মুসলমানদের সুষ্ঠু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন গঠনের উপযোগী বিপুল জ্ঞানভা-ার আরবিতে থরে থরে সাজানো ছিল। বাংলার জনগণের সামনে সেই অমূল্যরতন তুলে ধরার কোন ব্যবস্থাই সুলতানী আমলে করা হয়নি।
চৈতন্য-বৈষ্ণব মতবাদের প্রভাবে বাংলার হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এ সময় যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচিত হয়েছিল। বহু হিন্দু লেখক চৈতন্যের জীবন ও দর্শন নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। বৈষ্ণবচিন্তা ও ভাবধারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পুরো অঙ্গনকে প্লাবিত করেছিল। এর মোকাবিলায় সে সময়কার সুলতান ও মুসলিম সমাজের পক্ষ কার্যকর, ফলপ্রসূ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় না। এ শূণ্যতার ফলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতাবোধেরও জন্ম হয়েছিল। তিক্ত হলেও সত্য, বৈষ্ণব কবি-সাহিত্যিকদের বিরাট মিছিলে এক শ্রেণীর মুসলমান কবিও গা ভাসিয়েছিলেন। যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যের ভাষায় এরা ছিলেন “বাঙ্গালার বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মুসলমান কবি”। কিছু মুসলমান চৈতন্যের ধর্মাদর্শের অনুসারী হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছিল। বৈষ্ণব আন্দোলন কতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল, এ থেকে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। মুসলিম পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেয়া বাংলাভাষার ওপর শুরু থেকেই ‘ঈমান ও ইসলামবিরোধী’ ভাবধারা প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। মুসলিম চিন্তাবিদগণ তখন এর ভয়াবহ পরিণতির কথা উপলব্দি করতে পারেননি। যার মাশুল আজো বাংলার মুসলিম সমাজকে গুনতে হচ্ছে।
হিন্দু কবি-সাহিত্যিকরা তাদের ধর্মাশ্রয়ী কাব্য-সাহিত্য রচনা করবে, এতে দোষের কিছু নেই। মুসলিমরা নিজেদের স্বকীয়তা ভুলে বৈদিক-বৈষ্ণব ¯্রােতে গা ভাসিয়ে দেয়াটা দোষের। সাধারণ মুসলমানের কী দোষ, বিকল্প না পেলে, রাধাকৃষ্ণের নোংরা পরকিয়া, আদিরসাত্মক বৈষ্ণব সাহিত্যেই বুঁদ হবে, এ আর বিচিত্র কি। মুসলিম কবি-সাহিত্যিকরা একদম কিছুই করেননি, তা নয়। তারাও অল্পবিস্তর পুঁথি-কাব্য রচনা করেছেন। সেগুলো বৈষ্ণব প্লাবনের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে। শক্ত, মোক্ষম, কার্যকর, প্রভাবশালী কোনো ধারা মুসলমানরা সৃষ্টি করতে পারেনি। এতকিছু সত্ত্বেও এদেশে ইসলাম ও মুসলমান টিকে গেছে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার খাস রহমত ও কুদরতে। এতে মুসলমানদের কোনো কৃতিত্ব নেই।
চৈতন্য ও বৈষ্ণব মতবাদকে অহিংস, প্রেমময়, উদার, সহজিয়া বলে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। চৈতন্যপন্থীদের মধ্যে শুরু থেকেই মুসলিমবিদ্বেষ, সহিংসতার বীজ সুপ্ত ছিল। যে কোনো প্রতিরোধ আন্দোলন ও পাল্টা মতবাদেই একধরণের রাগ, জোশ থাকেই। চৈতন্যের মধ্যেও ছিল। নবদ্বীপে কাজির বাড়ি অবরুদ্ধ করাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। অহিংস, নিরীহ হলে কেউ প্রধান প্রশাসকের বাড়ি ঘেরাও করে? কারো কারো মতে চৈতন্যের সেই ঘেরাও-অবরোধই ছিল উপমহাদেশের সর্বপ্রথম সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা।
হিন্দুদের সাংস্কৃতিক পনরুজ্জীবন আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল- মুসলমানদের বিরুদ্দে চরম ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রচার। শ্রীচৈতন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংসার বাণী প্রচার করেছিল, যার প্রভাবে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততা জন্ম হয়েছিল। বাংলায় সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির এটি ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। শ্রীচৈতন্যের বড় হাতিয়ার ছিল- হিংসা ও সাম্প্রদায়িক ভেদনীতি, রাধাকৃষ্ণের পরকীয়া প্রেমের আদিরস। চৈতন্যের হিংসানীতির শিকার হয়েছিলেন নবদ্বীপের কাজী। কাজীর বাড়িতে হামলা চালানোর মিছিলে চৈতন্য নিজেই নেতৃত্ব দিয়েছিল। চৈতন্য দুই শিষ্য সনাতন ভ্রাতৃদ্বয়ের সাহায্যে সুলতান হোসেন শাহের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করার অভিযোগও আছে। এ ষড়যন্ত্র ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত সুলতান হোসেন শাহ চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। চৈতন্য-বৈষ্ণবদের সাংস্কতিক আন্দোলনের প্রকৃতি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে চৈতন্যের ব্যর্থতার ওপর আলোকপাত করে মওলানা আকরাম খাঁ লিখেছেনঃ
“ছোলতান হোসেনের প্রাথমিক দোষ-দুর্বলতার সুযোগ লইয়া, গৌড় রাজ্যের সাধু-সন্যাসীরূপী বৈষ্ণব জনতা বাংলাদেশ হইতে ইসলাম ধর্ম ও মোছলেম শাসনকে সমূলে উৎখাত করিয়া ফেলিবার জন্য যে গভীর ও ব্যাপক ষড়যন্ত্রে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, ছোলতান ও স্থানীয় মোছলেম নেতাদের যথাসময়ে সতর্ক হওয়ার ফলে তাহার অবসান ঘটিয়া যায়। চৈতন্যদেব এ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ বিফল মনোরথ হইয়াই বিদেশ যাত্রা করিয়াছিলেন এবং তাহার পরে এমন আশ্চার্যরূপে উধাও হইয়া গিয়াছেন যে, ভক্তরাও তাহার শেষ জীবনের ইতিহাস সম্বন্ধে কোন সংবাদই দিতে পারেন নাই। কেহ বলিতেছেন অন্তর্ধান, কেহ বলিতেছেন সমুদ্রে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া মৃত্যুবরণ ইত্যাদি”(মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১১০)।
ইসকন
বর্তমানে ইসকন (ISKCON) চৈতন্যদেবের রেখে যাওয়া কাজই করছে। ইসকন শব্দের পূর্ণরূপ হচ্ছে International Society for Krishna Consciousness। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ। ইসকনের মূল উদ্দেশ্য, শ্রীচৈতন্য-বৈষ্ণব মতবাদের অনুসরণে,
ক. শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া।
খ. হরিনাম সংকীর্তন (হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র) প্রচার।
গ. সনাতন ধর্মের গৌড়ীয় বৈষ্ণব মত প্রচার।
ঘ. আত্মিক উন্নতি ও বৈষয়িক মোহ থেকে মুক্তি।
বর্তমানে ইসকনের প্রধান কেন্দ্রও নদীয়ার মায়াপুরে। শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থলে। চৈতন্যের কর্মস্থল বাংলা হলেও, ইসকনের কর্মপরিধি বিশ^ব্যাপী। ১৯৬৬ সালে ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ (অভয়চরণ দে ১৮৯৬-১৯৭৭) নিউইয়র্কে ইসকন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর জন্ম কলকাতায়।
চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলন ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়েছিল। উত্তরসূরী ইসকনের ভূমিকার ব্যাপারেও সতর্ক থাকা জরুরি। হিন্দুরা নিজেদের ধর্মচর্চা করবে, নিজেদের ধর্মের উন্নতি, অগ্রগতি নিয়ে কাজ করবে, এটা তাদের মৌলিক অধিকার। তাদের কাজ যদি ইসলাম ও মুসলিম সমাজকে ক্ষতি করে, সেটা প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি থাকা জরুরি। চৈতন্যের সময় মুসলিম শাসক ও ওলামায়ে কেরামের উদারতা, উদাসীনতায় যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল, এবার যেন তেমন কিছু না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি। হিংসার বদলে হিংসা, ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামের মূলবার্তা হল হিংসা-বিদ্বেষ-জুলুমের বিপরীতে বিশুদ্ধ ইনসাফ।
১০: ইসলামের সূচনা থেকে ইহুদি ও মুশরিকরা মুমিনের বিরুদ্ধে দ্রুত একজোট। এরা চুক্তিভঙ্গ করার ক্ষেত্রে দক্ষ। এদের মধ্যে বিশ^স্ত থাকলেও গনেশের মতো মানুষেরও অভাব নেই।
১১: বাংলায় কাজ করতে গেলে অতীতকে সামনে রাখতে হবে। অতীতের কাজগুলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
১২. বাংলার মুসলমানদের সবসময় হিন্দুদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সংখ্যালঘুর প্রতি জুলুম করা যাবে না, তাদের ব্যাপারে উদাসীন থাকা যাবে না। গনেশ ও গৌরগোবিন্দরা সবযুগেই ঘাপটি মেরে থাকে। সুযোগ পেলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
১৩. বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই হিন্দুরা সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে তিনক্ষেত্রে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা- চালিয়ে আসছে,
ক. ধর্মীয়ভাবে,
খ. সাংস্কৃতিকভাবে,
গ. রাজনৈতিকভাবে।
এখনো অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি।
১৪. প্রতিটি মুসলিম শিশুকে বুঝ হওয়ার সাথে সাথেই মূর্তিপূজার অসারতা, অযৌক্তিকতা, কূপম-কতা বুঝিয়ে দিতে হবে। মূর্তিপূজা, শিরকের ভয়াবহতা তার সামনে সহজ ভাষায় পরিষ্কার করে দিতে হবে।
.
.
(এটা খসড়ারূপ। আরো পরিমার্জন, পরিবর্ধন হবে, ইন শা আল্লাহ)।
.
.
.
লেখায় তথ্যগত, তত্ত্বগত কোনো ভুল ধরা পড়লে, কোনো বক্তব্যে খটকা লাগলে, কোনো কথায় অসঙ্গতি চোখে পড়লে, ধরিয়ে দেয়ার বিনীত অনুরোধ। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

মূল লেখা
https://www.facebook.com/story.php?story_fbid=24126791710288857&id=100001540931061&rdid=be8EyYWBSRVhIE6k#

No comments:

Post a Comment