Sunday, July 13, 2025

জুলফিকার আলি ভুট্টো ও সিমলা চুক্তি- মাওলানা আতিক উল্লাহ ২৯.০৪.২০২৫

 বিসমিল্লাহ

জুলফিকার আলি ভুট্টো ও সিমলা চুক্তি
—--
১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর, জুলফিকার আলি ভু্ট্টো পরাজিত, বিধ্বস্ত পাকিস্তানের শাসক হলেন। তখনো পাকিস্তানের কোনো সংবিধান ছিল না। সামরিক শাসনের নিয়ম মেনেই জেনারেল ইয়াহিয়া খান ভু্ট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। ভু্ট্টো হলেন চীপ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ও প্রেসিডেন্ট। সেই রাতে জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে ভুট্টো বলেছিলেন,
আমি শপথ করছি, বিভক্ত, দ্বিখণ্ডিত দেশকে এক করে নতুন পাকিস্তান গড়ব।
সদ্যগঠিত বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। ভু্ট্টোর খাহেশ ছিল যে কোনো ভাবেই হোক, আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে মিলিয়ে কনফেডারেশন (যুক্তরাজ্য) গঠন করে পাকিস্তানের ভাঙন ঠেকাবেন। ভুট্টো মসনদে বসেই শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করলেন। রাওয়ালপিন্ডির এক বাংলোতে এনে আলোচনা শুরু করলেন।
ভুট্টোর জীবনীকার স্ট্যানলি ঔলপোর্ট লিখেছে,
শেখ মুজিবকে ভু্ট্টো প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী যা ইচ্ছা হতে পারেন, পবিত্র কুরআন হাতে শপথ করছি, আপনাকে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে আমি রাজনীতি থেকে অবসরগ্রহণ করতে প্রস্তুত। এছাড়া শেখ মুজিবকে ৫০,০০০ ডলার দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভুট্টো। শেখ মুজিব উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কনফেডারেশন গঠনের ব্যাপারে শেখ মুজিব বলেছিলেন, বাংলাদেশে গিয়ে জনগণের সাথে কথা বলার পর সিদ্ধান্ত নিবেন।
শেখ মুজিব সরাসরি ঢাকায় আসতে পারেননি। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতের আকাশপথে পাকিস্তান-বাংলাদেশ ফ্লাইট চলাচল নিষিদ্ধ করেছিল ইন্ডিয়া। এজন্য পাক সরকার শেখ মুজিবকে লন্ডনে পাঠিয়েছিল। সেখান থেকে শেখ মুজিব যেখানে ইচ্ছা যেতে পারবে। ৮ জানুয়ারি রাতে শেখ মুজিবকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল। শেখ মুজিব লন্ডন থেকে প্রথমে দিল্লি তারপর ঢাকায় এসেছিল। ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিয়েছিল। কনফেডারেশনের প্রস্তাবও শেখ মুজিব প্রত্যাখ্যান করেছিল। মুজিব বলেছিল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে আর কোনো ধরণের সম্পর্ক থাকতে পারে না। সম্পর্ক চিরদিনের জন্য ভেঙে গেছে। পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব বলেছিল, আপনারা শান্তিতে থাকুন, আমাদেরও শান্তিতে থাকতে দিন।
কনফেডারেশন গঠনের উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর ভুট্টোর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ভারতের মাটিতে আটকে থাকা ৯৩ হাজার বন্দীকে মুক্ত করা ও ভারত অধিকৃত ভূমি উদ্ধার করা। ভুট্টো বন্দীমুক্তির বিষয়টি আপাতত স্থগিত রেখে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিলেন। ভুট্টো তার অর্থনৈতিক পলিসির নাম দিলেন-ইসলামিক সোশালিজম’। ভুট্টো প্রায়ই তার ভাষণে বলতেন, সোশালিজম ইসলামবিরোধী মতবাদ নয়। সোশালিজম আমাদের ধর্মবিশ্বাসবিরোধী নয়। ভুট্টোর ভাষায় সোশালিজম হল ‘মুসাওয়াতে মুহাম্মাদি’, মুহাম্মাদ সা.-এর আদর্শনির্ভর সামাজিক সাম্য। ভুট্টোর মতে, শিল্পকলকারখানা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি সরকারি কব্জায় অধিগ্রহণ করে, সবার মাঝে সমানভাবে বণ্টন করে দেয়া ইসলামী শিক্ষার অনুকূল। ইসলাম সমতার শিক্ষাই প্রদান করে। ইসলামিক সোশালিজম-এর স্লোগানের মাধ্যমে ভুট্টো মূলত সম্পদের জাতীয়করণ, শ্রমআইন ও ভূমিসংস্কার আইন ঘোষণা করেছিলেন। জাতীয়করণের ঘোষণা প্রথমবার ঘোষিত হয়েছিল ২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। এই ঘোষণার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বৃহৎ শিল্পকারখানায় পাকিস্তানের বিখ্যাত ২২ পরিবার একচেটিয়া মালিকানা ভেঙে দেয়া। সাবেক একনায়ক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তার অর্থনৈতিক পলিসি ২২ পরিবারকে ধনী থেকে ধনীতর করেছিল, বাকি জনগোষ্ঠী গরিব থেকে গরিবতর হয়ে চলছিল। ২২ পরিবারের মধ্যে ছিল দাউদ, সেহগাল, আদমজি, কলোনি, ফ্যান্সি, ওয়ালিকা, জলিল, বাওয়ানি, ক্রিসেন্ট, ওয়াজির আলি, গান্ধারা, ইসফাহানি, হাবিব, খাইবার, নিশাত, হাফিজ, বেকো, গুল আহমাদ, আরাগ, করিম, মিলওয়ালা, দাদা গ্রুফ।
এই বাইশ পরিবার পাকিস্তানের ৬৬% শিল্পকারখানা, ৮৭% ব্যাংকিং, ইনশুরেন্স নিয়ন্ত্রণ করত। প্রেসিডেন্ট ভু্ট্টো টেলিভিশন ভাসনে জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২২ পারিবারের একচেটিয়া ব্যবসায়িক সুবিধা ভাঙার জন্য, ১০-টি শ্রেনীতে ৩১-টি শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করেছিলেন। কারাখানাগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এসবের মধ্যে লোহা, স্টীল, অটোমোবাইল, কেমিক্যাল, সিমেন্ট, বিদ্যুত, গ্যাস, তেল পরিশোধনসহ অন্যান্য ভারী কলকারখানা শামিল ছিল। জেনারেল আইয়ুব খানের আত্মীয়ের গান্ধারা ইন্ড্রাস্ট্রি, শরিফ পরিবারের ইত্তেফাক ফাউন্ড্রিস, স্টীল মিল, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, হাবিব ব্যাংকও জাতীয়করণ করা হয়েছিল। ৪৩ টি ইনসুরেন্স কোম্পানিকে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। সর্বমোট ৩১ টি বড় শিল্পকারখানা, ১৩-টি ব্যাংক, ১০ টি শিপিং কোম্পানি, দুটি পেট্রোলিয়াম কোম্পানি জাতীয়করণ করা হয়েছিল। টেক্সটাইল ও ফুড ইন্ড্রাস্ট্রিকে জাতীয়করনের তালিকার বাইরে রাখা হয়েছিল। বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানিকেও জাতীয়করণ করা হয়নি। এছাড়া ধনী পরিবারগুলোর ২০০-টি পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। তাদেরকে গ্রেফতারির ভয় দেখিয়ে হুকুম দেয়া হয়েছিল, বিদেশে থাকা অর্থ পাকিস্তানে ফেরত আনতে। এই ব্যবস্থায় ঠিক কত টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়েছিল, সেটার সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও নেই। ১৯৭২ সালের মার্চে জব্দকৃত পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হয়েছিল।
প্রাথমিকভাবে ভুট্টোর এসব পদক্ষেপ বেশ কাযকর প্রমাণিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়েছিল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব কারখানা প্রথম প্রথম ভালো লাভ করলেও দুটি কারণে দীর্ঘমেয়াদে গৃহীত সরকারী কর্মপন্থা বড় ধরণের ক্ষতি ডেকে এনেছিল,
প্রথমত: এসব কারখানা পরিচালনার জন্য জনপ্রশাসন থেকে অপেশাদার কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হত। তারা পদে বড় হলেও, কর্মে অদক্ষ অযোগ্য ছিল। এসব কারখানায় তাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ ছিল না। কারখানা যেমনই চলুক, মাসশেষে মোটাঅংকের বেতন পেয়েই যাচ্ছে, কারখানার উন্নতি নিয়ে ভাবার কী প্রয়োজন? আমলাতন্ত্র (বুরোক্রেসি) দিয়ে কারখানা চলে না। পাকিস্তান স্টীল মিল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রথমদিকে ভু্ট্টো সরকার রাশান কর্মকর্তাদের দিয়ে মিলটি চালু করেছিল। কয়েকবছর পযন্ত লাভজনক ছিল। পরে চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছিল। বর্তমানে এই মিলটি শ্বেতহস্তিতে পরিণত হয়েছে এটা ২০২১ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, শেষ ১৫ বছরে স্টিলমিলগুলি করদাতাদের ওপর ৩৩৪ বিলিয়ন রুপির বোঝা চাপিয়েছে। গত ১১ বছরে (২০১১-২১) মিলগুলোর লাভের খাতা শূন্য। খবরে প্রকাশিত হয়েছে, সরকার এটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত: এই নীতির আরেকটি অসুবিধা ছিল,জাতীয়করণের হুমকি,অনেক পুঁজিপতিকে তাদের ব্যবসা আরব,ইউরোপ,আমেরিকা ইত্যাদি দেশে স্থানান্তর করতে বাধ্য করেছিল। শিল্পপতিরা সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকত, কখন তার রক্তঘাম ঝরানো কারখানার ওপর জাতীয়করণের খড়গ নেমে আসে!
জাতীয়করণের পর, ভুট্টো ১০ ফেব্রুয়ারী,১৯৭২ সালে শ্রমনীতিও ঘোষণা করেছিলেন। এতে,জাতীয় মালিকানাধীন ও বড় কোম্পানিগুলিকে কর্মরত শ্রমিকরদের ৪% লভ্যাংশের অংশীদার বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। শ্রমিকদের জন্য শ্রম আদালত,সস্তা আবাসন প্রকল্প, এক সন্তানের জন্য ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, পেনশন ও বীমা ঘোষণা করা হয়েছিল। সরকার কারখানার মালিকদের নির্দেশ দিয়েছিল, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করতে হবে, তাদেরকে বীমা সুবিধা প্রদান করতে হবে। মালিকরা প্রথমে এই আদেশ মানতে চায়নি, ফলে মালিক ও শ্রমিক মারামারি শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে করাচিতে, কর্মচারী এবং মালিকদের মধ্যে সংঘর্ষ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে ওঠেছিল। সরকার হস্তক্ষেপ করে মালিকপক্ষকে আদেশ বাস্তবায়নে বাধ্য করেছিল।
জাতীয়করণ এবং শ্রমনীতির পর, ১ মার্চ,১৯৭২ সালে ভুট্টো ভূমি সংস্কার শুরু করেছিলেন। এই সংস্কারগুলির সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছিল, সামন্ততান্ত্রিক (ফিউডাল সিস্টেম) ব্যবস্থার অবসান ঘটানো। এই সংস্কারের অধীনে,খালের পানি দ্বারা সেচপ্রাপ্ত জমির মালিকানার সীমা,আগের ৫০০ একর থেকে কমিয়ে ১৫০ একর করা হয়েছে। যদিও বারানীর সীমা অর্থাৎ বৃষ্টির পানি সেচপ্রাপ্ত জমি ১০০০ একর থেকে কমিয়ে ৩০০ একরে কমিয়ে আনা হয়েছিল। কয়েক বছর পর,এই সীমা আরও কমিয়ে আনা হয়। খাল-নির্ভর জমির জন্য ১০০ একর এবং বৃষ্টি-নির্ভর জমির জন্য ২০০ একর। স্পষ্টতই এটি সামন্ততন্ত্রের অবসানের জন্য একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল। এ আইনের একটি ফাঁকও ছিল। অর্থাৎ ভূমি সংস্কারআইন বাগান,দানকৃত বা মহিলাদের মালিকানাধীন জমির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। সামন্তপ্রভুরা নিজের জমি সন্তান ও স্ত্রীদের নামে হস্তান্তর করতেন। অথবা দাসদের নামে যাতে তারা নিজের জমির উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। এই কৌশলে একটি পরিবার আগের মতোই হাজার হাজার একর জমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। এছাড়া শিকারের জায়গা, অশ্বপালনের খামার, গবাদি পশুর খামারগুলিকেও সংস্কারের বাইরে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ,সামন্ততন্ত্র সামান্য রূপ পরিবর্তন করে আগের মতোই অক্ষত থেকে গিয়েছিল। তবে একথা সত্য, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের কিছু জমি সাধারণ কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছিল।
অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য, ভুট্টো সরকার রুপির অবমূল্যায়নও করেছিল। তখন এক ডলারের মূল্য ছিল ৪.৭৬ রুপি। ১৯৭২ সালের মে মাসে এর দাম ১১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থনীতির খারাপ অবস্থার কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মুদ্রার অবমূল্যায়ন করার জন্য পাকিস্তানের উপর আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ দেয়া হয়েছিল। রুপির অবমূল্যায়ন না করা হলে পাকিস্তান তার পণ্য রপ্তানিতে সমস্যার সম্মুখীন হত। বৈদেশিক ঋণ পেতেও সমস্যা হত। ভুট্টো আরব রাষ্ট্রগুলো এবং ইরান থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ নিয়েছিলেন। ইরানের ৫৮০ মিলিয়ন ডলার ঋণ ছিল সবচেয়ে বড়। এছাড়াও, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া এবং সৌদি আরবও পাকিস্তানের জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার ঋণ অনুমোদন করেছিল। এই ব্যবস্থাগুলি যেমন ঋণ,রুপির অবমূল্যায়ন, জাতীয়করণের কারণে,পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছিল। ভুট্টোর তথাকথিত 'ইসলামী সমাজতন্ত্র’ ভাঙাচোরা পাকিস্তানকে কিছু সময়ের জন্য সহায়ক প্রমাণিত হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদে যদিও তার বিপুল ক্ষতির কারণ হয়েছিল।
অর্থনীতির উন্নতির পাশাপাশি, জুলফিকার আলী ভুট্টো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার দিকেও মনোনিবেশ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের মাধ্যমে তিনি সামরিক আইন তুলে নিয়েছিলেন। এই অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের অধীনে, তিনি ২১শে এপ্রিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। এখন তিনি আর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নন, বরং একজন বেসামরিক রাষ্ট্রপতি। এই দুটি বড় এবং জরুরি কাজের পর,রাষ্ট্রপতি ভুট্টোর সামনে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ ছিল। অর্থাৎ, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতে বন্দী পাকিস্তানিদের মুক্তি ও ভারতের দখলকৃত অঞ্চলগুলি ফেরত নেয়া। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে,ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানের পাঞ্জাব এবং সিন্ধু প্রদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তে ১২৫০০ বর্গকিলোমিটার পাকিস্তানি এলাকা দখল করে নিয়েছিল। এছাড়াও, ভারত গিলগিট-বালতিস্তানে ৮০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি জমি জবরদখল করেছিল। দখলকৃত জমির মোট আয়তন ছিল ১৩,০০০ বর্গকিলোমিটারের কিছু বেশি। এই দখলদারিত্বের প্রভাবে সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী ১০ লক্ষেরও বেশি পাকিস্তানিকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। ওদিকে ৯৩০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীও ভারত থেকে মুক্তির আশায় বসেছিল। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১৬,০০০ বেসামরিক নাগরিক এবং বাকিরা নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন।
১৯৭২ সালের এপ্রিলে, পাকিস্তানে বন্দী থাকা ভারতীয় বন্দীদের বিনিময়ে ভারত থেকে কয়েকজন আহত ও অসুস্থ পাকিস্তানি বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু এরা সংখ্যায় ছিল খুবই কম। বাকিরা তখনও কারাগারে ছিল। এই বন্দীদের একটি বিরাট অংশ ভারতীয় কারাগারে ছিল। কিছু বাংলাদেশেও বন্দী ছিল। দিল্লি ও ঢাকা যুদ্ধাপরাধের জন্য তাদের বিচারের হুমকি দিচ্ছিল। দিল্লি ও ঢাকা বিচারের জন্য ১৫০০ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে তালিকাভুক্ত করেছিল। পরে এই সংখ্যা কমিয়ে ১৯৫ করা হয়। বিচারের জন্য আবেদন করা বন্দীদের মধ্যে পাকিস্তানের পূর্ব কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল আবদুল্লাহ খান নিয়াজিও ছিলেন। বিচারের হুমকি ছাড় আরও একটি সমস্যা ছিল। যুদ্ধবন্দী ও জবরদখলকৃত নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলিকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, ভারত চেয়েছিল কাশ্মীর সমস্যাটি স্থায়ীভাবে তার অনুকূলে সমাধান করতে।
কাশ্মীর সমস্যা ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর ব্যক্তিত্ব এবং রাজনীতির একটি মৌলিক দিক। তিনি কাশ্মীরের জন্য হাজার বছর ধরে লড়াই করার স্লোগানও দিতেন। তাই রাজনৈতিকভাবে তার পক্ষে ভারতে গিয়ে আলোচনার টেবিলে কাশ্মীর হারানো সম্ভব ছিল না। এজন্য ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনায় বসার আগে ভুট্টো নিজের কার্ডগুলি ভালভাবে প্রস্তুত করেছিলেন। ভুট্টোর সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস ছিল, দেশ ভেঙে যাওয়ার পরেও পাকিস্তানে আটকে পড়া লক্ষ লক্ষ বাঙালি। এরা ৭১ সালের যুদ্ধের আগে চাকরি বা ব্যবসার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে এসেছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫,০০০ প্রাক্তন সেনাসদস্য আর ২০,০০০ সাবেক সরকারি কর্মচারীও ছিলেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো তখনও এই বাঙালিদের পাকিস্তান ত্যাগ করতে দেননি। এর অর্থ ছিল,৯৩,০০০ যুদ্ধবন্দীর বিপরীতে লক্ষ লক্ষ বাঙালি নাগরিককে পাকিস্তানে আটকে রাখা হয়েছিল।
ভু্ট্টোর হাতে খেলার মতো আরেকটি কার্ড ছিল। পাকিস্তান তার আন্তর্জাতিক মিত্রদের বলে রেখেছিল, ভারতের বন্দী এবং জমির সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে যেন স্বীকার না করা হয়। একারণে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যও হতে পারছিল না। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটেন অবশ্য বন্দী বিনিময় চুক্তির আগেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানের চাপের কারণে চীন,ইরান,তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ অনেক রাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। পাকিস্তানের অনুরোধে চীনও বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ আবেদনে ভেটো প্রদান অব্যাহত রেখেছিল।
ইন্দিরা গান্ধী এবং শেখ মুজিবের উপর চাপ আসতে থাকে, বাংলাদেশের স্বাধীন আইনি মর্যাদার পেতে হলে, পাকিস্তানের সাথে দ্রুত একটি চুক্তি করে ফেলতে। ১৯৭২ সালের জুন মাসে, জুলফিকার আলী ভুট্টো ভারতের সিমলা শহরে আসেন। তার প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন ৯২ জন। আদরের কন্যা উনিশ বছর বয়েসী বেনজির ভুট্টোও এই দলে ছিলেন। ভুট্টো প্রতিনিধিদলের প্রতিটি সদস্যকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। বেনজিরকে বলেছিলেন, মা তুমি এমনভাবে থাকবে, যাতে তোমাকে হাসিখুশিও না দেখায় আবার চিন্তিতও মনে না হয়। তুমি স্বাভাবিক আচরণ করবে। তুমি হাসিমুখে থাকলে মানুষ ভাববে, পাকিস্তানি সৈন্যরা কারাগারে আছে আর রাষ্ট্রপ্রধানের মেয়ে হেসেখেলে বেড়াচ্ছে। তোমাকে চিন্তিত দেখলে ভারতীয়রা মনে করবে, ভয়ে চুপসে আছো, পাকিস্তানীরা ভাববে আশার কোনো আলো নেই।
বলা হয়ে থাকে, ভুট্টো এমন একটা পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, সিমলাতে চুক্তি করতে নয়, দীর্ঘদিন ধরে রিহার্সাল করা কোনো নাটক মঞ্চস্থ করতে থিয়েটারে উপস্থিত হয়েছে। পাক প্রতিনিধিদলের প্রতিটি দলের সংলাপ তো বটেই এমনকি সংলাপের সময় কার কেমন অভিব্যক্তি হবে, সেটাও পূর্বনির্ধারিত ছিল।
আলোচনার বৈঠকে ভারতের এজেন্ডা ছিল পাকিস্তানকে তিনটি জিনিস করতে বাধ্য করা।
১.ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরকে ভারতের স্থায়ী অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
২.যুদ্ধাপরাধের জন্য বন্দী সৈন্যদের বিচারে সম্মতি দিতে হবে।
৩.বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। জাতিসংঘের সদস্যপদলাভে বাধা দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে পাকিস্তানের এজেন্ডা ছিল ভারতের একটিও দাবি মেনে না নিয়ে, নিজ অঞ্চল এবং বন্দীদের ফিরিয়ে নেওয়া। ২৮শে জুন থেকে ২রা জুলাই পর্যন্ত,পাঁচদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনা চলে। ভারতীয় আলোচক দলের একজন কর্মকর্তা কেএন বকশির মতে,ভারত সরকার আগে থেকেই ভুট্টোকে বিশ্বাসযোগ্য না মনে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন, যেখানে ভুট্টোর মাও তাকে বিশ্বাস করেন না,আমরা কীভাবে করব? কিন্তু আলোচনা শুরু হওয়ার পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ভুট্টো কী এক জাদুবলে নিজের অনুকূলে অকল্পনীয় ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেন। কে এন বকশি বলেছেন, যে ভুট্টো ভারতের সাথে হাজার বছরের যুদ্ধের কথা বলতেন,আলোচনার টেবিলে খুবই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছিলেন। তিনি ক্রমাগত দুধ ও মধুর প্রবাহমান নদী, পারস্পরিক শান্তি ও সমৃদ্ধির কথা বলে চলছিলেন। তার কথাগুলো আমাদের কানে সঙ্গীতের মতো শোনাচ্ছিল। অর্থাৎ ভারতীয়রা ভুট্টোর মিষ্টিকথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল।
কেএন বকশি আরো বলেছেন, ভুট্টোর বাকচাতুযে একপযায়ে আলোচনার পরিবেশ এমন পযায়ে উপনীত হয়েছিল যে, ভারত সরকারকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে তাদের জয়ের জন্য অনুতপ্ত বলে মনে হচ্ছিল। আমরা চুক্তি করার আকাঙ্ক্ষায় পাকিস্তানের কাছে মাথা নত করতে শুরু করেছিলাম।
তবে,এতকিছুর পর আলোচনায় উত্থান-পতন যে মোটেও ছিল না, তা নয়। ১ জুলাই বিরাট এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে আলোচনার মেয়াদ একদিন বাড়ানো হয়।
বেনজির ভুট্টো জুলাইয়ের ২ তারিখের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, সেদিন বাবা তাকে বলেছিলেন, আমরা আগামীকাল ফিরে যাচ্ছি, জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। ভারতের চাপিয়ে দেওয়া কোনও চুক্তি ছাড়াই আমরা ফিরে যাব। ভারতীয়দের ধারণা, ‘চুক্তি ছাড়া আমাদের দেশে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। তাই তারা যা বলবে, আমি অপারগ হয়ে তাদের সমস্ত দাবিদাওয়া মুখবুজে মেনে নেব। দেশবিক্রির বিনিময়ে কোনও চুক্তিতে পৌঁছানোর পরিবর্তে হতাশ হয়ে পাকিস্তানে ফিরে যাওয়াই আমার জন্য ভালো।
শুধু মেয়েকে নয়, মিডিয়াতেও অনেকটা এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন।
এমন চূড়ান্ত কথা বলার পরও,একই দিন ভোর সাড়ে ৪টায় ভুট্টো আবার ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করেছেন। কোনও চুক্তি না হওয়ায় ইন্দিরা গান্ধীও খুব পেরেশান ছিলেন। ভুট্টোর সাথে বৈঠক চলাকালে, ইন্দিরা চা উপভোগ করার পরিবর্তে,নার্ভাসভঙ্গিতে নিজের ভ্যানিটিব্যাগ নাড়াচাড়া করছিলেন। ভুট্টো বুঝে গিয়েছিলেন, ইন্দিরা এখন মানসিকভাবে দুর্বল অবস্থায় আছেন। এখনই তাকে রাজি করানোর সেরা সময়। ভুট্টো নিজের সর্বোচ্চ বাগ্মিতাশক্তি কাজে লাগিয়ে টানা আধা ঘন্টা ভাষণ দিলেন। ভাষণে ইন্দিরাকে উদ্দেশ্য করে ভুট্টো বলেছিলেন,
আমরা দুজনেই গণতান্ত্রিক নেতা। এই অঞ্চলটি দেশভাগের পরও শান্তিপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, আমরা দুজন চাইলে শান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারি। আমরা যদি ব্যর্থ হই, তাহলে পুরনো ক্ষত আরও গভীর হবে। সামরিক বিজয় ইতিহাসেরই অংশ। অতীতেও এমন বিজয় সংঘটিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কত্ব (স্টেটসম্যানশীপ) হল,বিজয়ের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজে নিতে পারা। সত্যিকার রাষ্ট্রনায়কত্ব হল,বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিল্প,যা ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকে। এজন্য প্রয়োজন ভবিষ্যতের দিকে নজর রেখে,এমন ছাড় দেওয়া,যার ফল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভোগ করবে। যদি শান্তির পুরস্কার জিততে হয়,তাহলে পাকিস্তান নয়, বিজয়ীশক্তি অর্থাৎ ভারতের উপরই দায়িত্ব বর্তায়, নমনীয়তা দেখিয়ে ও ছাড় দিয়ে একটা পরিণতিতে পৌঁছা।
ভুট্টোর কথা শুনে ইন্দিরা গান্ধীর হৃদয় গলে গিয়েছিল। এই দিনেই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছিল। ভুট্টো ৩ জুলাই পাকিস্তানে ফিরে আসেন। সিমলা চুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়,
ক. জাতিসংঘের ধারা মোতাবেক পাকিস্তান ও ভারত তাদের সম্পর্ক উন্নত করবে।
খ.আলোচনার মাধ্যমে তাদের দ্বিপাক্ষিক মতপার্থক্য নিরসন করবে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সেগুলো সমাধানের জন্য সম্মত হবে। যদি সমস্যা সমাধানে বিলম্ব হয়, তাহলে কোন দেশই একতরফাভাবে নিজের অনুকূলে পরিস্থিতি পরিবর্তন করবে না।
গ. উভয় দেশের সেনাবাহিনী ৩০ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তে ফিরে যাবে। এই বাহিনী কাশ্মীরে যুদ্ধবিরতি রেখায় ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর অবস্থানেই থাকবে।
এর অর্থ ছিল গিলগিট-বালতিস্তানের যে অঞ্চলটি ভারতীয় দখলে ছিল তা ফেরত দেওয়া হবে না।
ঘ. কাশ্মীর সীমান্তে যুদ্ধবিরতি রেখাকে বলা হবে এলওসি (লাইন অব কন্ট্রোল) নিয়ন্ত্রণ রেখা। উভয় দেশই নিয়ন্ত্রণ রেখাকে সম্মান করবে এবং এখানে বলপ্রয়োগ করবে না।
ঙ. যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবাসনের জন্য আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
সিমলা চুক্তিকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্যগুলির মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি ছিল ইতিহাসের হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনার মধ্যে একটি, যখন পরাজিত এবং বিজয়ী দেশগুলি সমতার ভিত্তিতে চুক্তিতে সম্পাদিত হয়েছিল। বেশিরভাগ সময়ই বিজয়ীশক্তি পরাজিতের উপর ছড়ি ঘুরিয়ে থাকে।
এই চুক্তির বিস্ময়কর দিক হল, পাকিস্তান ভারতের একটি দাবিও মেনে নেয়নি। ভারতের মর্জিমতো কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হয়নি। পাকসেনাদের যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করা হয়নি। বাংলাদেশকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ভারত পাকিস্তানকে একটি বিশাল এলাকা ফিরিয়ে দিয়েছিল। গিলগিট-বালতিস্তানের কিছু এলাকা ফেরত দেওয়া হয়নি যেগুলো লাদাখে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই যুদ্ধে পাকিস্তান নতুন কোনও ভূখণ্ড পায়নি, এটাও ঠিক নয়। ৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাশ্মীরের ছাম্ব এলাকাকে ভারতীয় দখল থেকে মুক্ত করেছিল। সিমলা চুক্তির অধীনে প্রায় ১২৭ বর্গকিলোমিটারের এই এলাকাটি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে আসে। এটি আজ আজাদ কাশ্মীরের অংশ। সিমলা চুক্তির সাফল্য সম্পর্কে ভুট্টো বলতেন, আরবরা ৫ বছর ধরে ফিলিস্তিনি ভূমি ফিরে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ আমি পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দলখকৃত আরবভূমির চেয়ে অনেক বড় জমি ফিরে পেয়েছি। সিমলা চুক্তির সময়,১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। ইসরায়েল এই যুদ্ধে গাজা, পশ্চিম তীরসহ অনেক আরব অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল।
মেয়ে বেনজিরকে ভুট্টো আরও বলেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী তাকে জমি অথবা যুদ্ধবন্দী কোনো একটি ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি জমি ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে ভুট্টোর যুক্তি ছিল, বন্দীদের সমস্যা বিশ্বব্যাপী এবং মানবিক। হাজার হাজার বন্দীকে দীর্ঘ সময় ধরে রাখাও ভারতীয় অর্থনীতির উপর বোঝা ছিল। ভুট্টো বুঝতে পেরেছিলেন, আজ জমিটি ফিরিয়ে না নেওয়া হলে, আর কখনও এ নিয়ে আলোচনা হবে হবে কি না সন্দেহ। অন্যদিকে ভারত পাক যুদ্ধবন্দীদের অনন্তকালের জন্য আটকে রাখতে পারবে না। ভুট্টোর ভাষায়,একটি দেশ ভূমি দখল করতে পারে, বন্দীদের দখল করে পারে না।
এজন্যই তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তানের প্রায় ১৩,০০০ বর্গকিলোমিটার জমি ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। বন্দীমুক্তির বিষয়টি পরবর্তী বৈঠকের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
বিপরীতে, সিমলা চুক্তিকে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ যুদ্ধে জয়লাভ করার পরও, তিনি কাশ্মীর সমস্যা নিজের অনুকূলে সমাধান করতে পারেননি। সমস্ত আপত্তি সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী দৃঢ়তার সাথে সিমলা চুক্তিকে রক্ষা করেছিলেন। ইন্দিরার মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলি যদি পরাজিত জার্মানির সাথে এমন নম্র আচরণ করতো, যেমনটা ভারত সিমলা চুক্তিতে পাকিস্তানের সাথে করেছিল, তাহলে হিটলার বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোনটাই হত না। পাকিস্তান ও ভারতে ঘৃণার বিস্তার রোধ করার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এমন কথাও প্রচলিত আছে, জুলফিকার আলী ভুট্টো সম্ভবত কাশ্মীর বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে মৌখিক গোপন কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দুই নেতা অলিখিতভাবে একমত হয়েছিলেন: নিয়ন্ত্রণরেখা বাণিজ্য ও ভ্রমণ ইত্যাদির জন্য খুলে দেওয়া হবে। এভাবে কয়েক বছর ধরে চলবে। এরমধ্যে ভুট্টো পাকিস্তানি জনগণকে কাশ্মীরের বিভাজন মেনে নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করবেন। তারপর নিয়ন্ত্রণ রেখাকে নিয়মিত সীমান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এভাবে অগ্রসর হলে,পাকিস্তানের জনগণ হিংস্র হবে না, ভুট্টো সরকারও কোনও হুমকির সম্মুখীন হবে না।
এই কারণেই হয়তো ইন্দিরা গান্ধী সিমলা চুক্তিতে কাশ্মীর সম্পর্কে কোনও সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর জোর দেননি। তবে, গোপন প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। কাশ্মীর এখনও দুই দেশের মধ্যে বিরোধপূর্ণ। সিমলা চুক্তির পর,পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পায়। পরের মাসে আগস্টে, চীন বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্য করার জন্য ভারতের প্রচেষ্টাকে ভেটো দেয়। সিমলার মতো বন্দীদের ক্ষেত্রে ভারতকে পাকিস্তানের দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ২৮শে আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান দিল্লিতে বন্দীদের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরের মাসে, ২৮ সেপ্টেম্বর, ৮৪২ জন বন্দী ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে। তাদের বেশিরভাগই ছিল বেসামরিক নাগরিক, যার মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশুও ছিল। বন্দীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া পরবর্তী কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। ১৯৭৪ সালের ৩০ এপ্রিল, ৭৩৪ জন বন্দীর শেষ দল পাকিস্তানে পৌঁছায়। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডার জেনারেল এ.কে. খান নিয়াজীও এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে, যখন পাকিস্তানি বন্দীরা ভারতে ছিল,৬১৭ জন ভারতীয় সৈন্যও পাকিস্তানে বন্দী ছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭২ সালের শেষের দিকে এই বন্দীকে মুক্তি দেন। ভারত দাবি করে তাদের ৫৪ জন সৈন্য এখনও পাকিস্তানে নিখোঁজ,তারা এখনো পাকিস্তানে বন্দী আছে। পাকিস্তানের সরকারী অবস্থান হল, তাদের কাছে একজনও ভারতীয় যুদ্ধবন্দী নেই। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও ভারতের প্রতি একই দাবি করা হয়, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধে নিখোঁজ হওয়া ৩৮ জন সৈন্য ভারতের কোথাও বন্দী আছে। ভারতেরও পাকিস্তানের প্রতি একই অবস্থান, এই দুটি যুদ্ধে বন্দী হওয়া কোনো পাকসেনা আমাদের কাছে অবশিষ্ট নেই।
ভারত থেকে যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তনের পর,পাকিস্তান থেকে বাঙালি নাগরিকদের ঢাকায় অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেক বাঙালি পরিবার এখনও পাকিস্তানে পাকিস্তানি নাগরিকত্ব ছাড়াই রয়ে গেছেন। বাংলাদেশে ৫০,০০০ পাকিস্তানি নাগরিক,যাদের বিহারি বলা হয়, তারা ফিরে পাকিস্তানে যেতে পারেনি। বাংলাদেশও তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। হ্যাঁ, ২০০৮ সালে এই শরণার্থীদের সন্তানদের ঢাকা হাইকোর্ট বাংলাদেশী নাগরিকত্ব প্রদান করে। ১৯৭১ সালের ট্র্যাজেডির পর জুলফিকার আলী ভুট্টো কোনওভাবে পাকিস্তানকে স্থিতিশীল করেছিলেন। অর্থনীতি,বন্দী ও অধিকৃত অঞ্চলের সমস্যা সমাধান করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে।
পাকিস্তান ভাঙার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল, পাকিস্তানের কোনো সংবিধান না থাকা। ভুট্টো সবদিক থেকে মুক্ত হয়ে, সংবিধান প্রনয়ণের দিকে মনোযোগ দিলেন। এজন্য ভু্ট্টোকে নিজ আদর্শের সাথে আপস করতে হয়েছিল।
সে গল্প তোলা রইল।
ইনশাআল্লাহ।

মূল লেখা
https://www.facebook.com/atik.ullah.589/posts/pfbid02oByQnKFftJCLhX8SoqeUnUzBtkRvGDbCHJet5hKMYiEfWSzmhJ9yxM2xxExCPtgbl

No comments:

Post a Comment