প্রখ্যাত আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব আল্লামা যুবাইর আহমদ চাটগামী পরপারে চলে গেলেন
- মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী
উপমহাদেশের বিখ্যাত আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব, শায়খুল হাদীস কুতুবে আলম হযরত আল্লামা হাফেজ মোহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলবী সিদ্দীকি মুহাজেরে মদনী (রহ.) এর শাগরিদ, খাছ খাদেম ও বিশিষ্ট খলীফা পীরে কামেল, হাদীয়ে জামান, মুরশিদে বরহক হযরত আল্লামা মোহাম্মদ যুবাইর আহমদ চটাগামী গত ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইংরেজি শুক্রবার সকাল ৮ টায় রাজধানী সাভার আশুলিয়ার দেলমাস্থ খানেকায়ে যাকারিয়া ও মুযাহেরুল উলুম মাদ্রাসায় ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বাদে জুমা তাঁর নামাযে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন হুজুরের ছাহেবজাদা মাওলানা ওবাইদুল্লাহ সাহেব। অতঃপর মাদ্রাসা মসজিদের পার্শ্বে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি ১স্ত্রী, ৪ ছেলে রেখে গেছেন। দেশ বিদেশে তাঁর বহুসংখ্যক ভক্ত, মুরিদ, শাগরিদ এবং কিছুসংখ্যক খলিফা রয়েছেন।
জন্ম ও শিক্ষালাভ: তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার দক্ষিণ চেচুরিয়া বৈলছড়ি খন্দকার পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে বাঁশখালী হাইস্কুল ও সরকারী মাদ্রাসায় অতঃপর কৈয়গ্রাম হেমায়াতুল ইসলাম মাদ্রাসায় প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা লাভ করেন। এরপরে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের অন্যতম দ্বীনি বিদ্যাপিঠ সাহারানপুর মোজাহেরুল উলুম মাদ্রাসায় গমন করেন। ১৯৪৮/৪৯ শিক্ষাবর্ষে দাওরায়ে হাদীস সমাপন করে সনদ লাভ করেন। তাঁর হাদীসের প্রধান উস্তাদ ও পীর ছিলেন শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)। তিনি দীর্ঘকাল শায়েখ যাকারিয়া (রহ.) এর খাছ খাদেম ছিলেন। শায়েখ (রহ.) এর প্রথমযুগের খলীফাগণের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এবং তিনি নয় নম্বর খলীফা ছিলেন।
শায়েখ যাকারিয়া (রহ.) এর নির্দেশে তিনি এক বছর তাবলীগে সাল লাগান। তিনিই প্রথম আলেম যিনি তাবলীগে ১ বছর সাল লাগান। আরব-আজম বহু দেশে তিনি তাবলীগ জামাত নিয়ে সফর করেন। ক্রমান্বয়ে তিনি ১২ বছর তাবলীগ জামাতে সালে সময় লাগান। পাকিস্তানের রায়ভেন্ড, বাংলাদেশের ঢাকা কাকরাইল এবং চট্টগ্রাম লাভলেইনে তাবলীগি মারকাজ প্রতিষ্ঠা ও মোজাহাদাকারী প্রথমযুগের মুরুব্বীগণের অন্যতম ছিলেন তিনি। কাকরাইল ও লাভলেইন তাবলীগি মারকাজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিরাট অবদান রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরস্থ জামেয়া মাদানিয়া কাশেফুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায়ও তাঁর রয়েছে বিরাট অবদান।
একজন পৃথিবী বিখ্যাত পীরে কামেল হওয়া সত্ত্বেও তিনি খুবই সরল জীবন যাপন করতেন। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি বাসে, সি এন জিতে সফর করতেন। সর্বদা নিজেকে আত্নগোপন করে রাখতেন। নিজের প্রচার-প্রসারে অগ্রণী হতেন না। সবসময় জিকির-আজকার, রিয়াজত-মুজাহাদা ও তাবলীগি কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকতেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো প্রায় ১০০ বছর। আমাদের গবেষণামতে বর্তমানে তিনিই ছিলেন আকাবির-বুযুর্গগণের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ও প্রবীণ বুযুর্গ আলেম। আকাবির এর ইলম-আমল, তাক্বওয়া-তাহারাত ও দাওয়াত-তাবলীগের প্রবীণ আমানতদার ছিলেন তিনি।
হযরতজ্বী মাওলানা ইউসুফ (রহ.) এর দীর্ঘ সংস্পর্শ তিনি লাভ করেছিলেন। শায়খুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.), হযরত মাওলানে আবদুল কাদের রায়পুরী (রহ.), মুফতীয়ে আজম মুফতী ফয়জুল্লাহ (রহ.), পটিয়ার বড় মুফতী শাহ আজিজুল হক (রহ.) প্রমুখ বুযুর্গগণকে নিকট থেকে তিনি দেখেছালেন। তাঁদের সান্নিধ্য ও স্নেহ-মমতা লাভ করেছিলেন। শায়খুল হাদীস যাকারিয়া (রহ.) এর খাছ খাদেম হবার কারণে পৃথিবী বিখ্যাত বহু আলেম, পীর-মাশায়েখগণের সাথে তাঁর পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে উঠে। জানা যায় যে, পবিত্র হাতিমে কা'বায় শায়খুল হাদীস (রহ.) এর সাথে সফরে থাকাকালে হযরত খিজির আলাইহিস সালামের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। মাঝে মাঝে তাঁর সাথে সাক্ষাতও হতো। আমাকে ( প্রবন্ধকার) একবার তিনি ঢাকায় বিশ্ব ইজতেমার উলামাগণের খাছ বয়ানের পর বলেছিলেন-"হযরত খিজির আলাইহিস সালামও এই ইজতেমায় এসেছেন।"
তাঁর অনেক কাশফ কারামতের ঘটনাও রয়েছে। বিশ্বের বড় বড় ওলী-বুযুর্গদের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তিনি এগুলো কাউকে বুঝতে দিতেন না। সাধারণত: এসব ব্যাপারে কারো সাথে কথাও বলতেন না। কিন্তু যারা তাঁর সাথে চলাফেরা করত তাঁরা কিছু বিষয় বুঝে নিতেন। ঘটনাক্রমে মাঝে মাঝে দু এক কথা বলতেন। চট্টগ্রামে মাদানী একাডেমীর মাসিক ইজতেমায় তিনি কয়েকবার এসে সংক্ষিপ্ত বয়ানও করেছিলেন। ব্যাক্তিগতভাবে আগ্রহীদের দিক-নির্দেশনা দিতেন বেশী। প্রতিবছর রমজান মাসে মাসব্যাপী এতেকাফে থাকতেন। সাথে থাকতেন সালেকীনরা। সালেকীনদের এসলাহ করতেন। প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করতেন।
হযরত মাওলানা যুবাইর চাটগামী (রহ.) ছিলেন প্রাচীন পীর বুযুর্গের নমুনা। নিজের যশ, খ্যাতি, সম্মান, অর্থ, আরাম-আয়েশের পরোয়া করতেন না। সবর ও শোকর ছিল জীবনের পাথেয়। প্রায় শতাধিক বছর বয়সেও কষ্ট পরিশ্রম করে দ্বীন প্রচার করতেন। একজন খাঁটি দায়ী ও মুবাল্লিগের গুণ ছিল তাঁর মধ্যে। তাঁর সংসর্গ প্রভাব বিস্তার করত অন্যের মাঝে। তিনি সহজে কাউকে মুরিদ করতে
চাইতেন না। পরিপূর্ণ আগ্রহ তৈরী হলে তবেই মুরিদ করতেন। অতঃপর আমল-আখলাক তৈরী করতে অনুপ্রাণিত করতেন। হযরত শায়খুল হাদীস (রহ.) এর তাসাওউফ এর বই কিতাব অন্যান্য কিতাবাদী পড়তে বলতেন। মাসিক ইসলাহী ইজতিমা ও শবগুজারির আসলে সেখানে জরুরী হেদায়াত ও পরামর্শ প্রদান করতেন। শরীয়ত ও সুন্নাত মোতাবেক চলতে হেদায়াত দিতেন। তাবলীগের মেহনত এবং দাওয়াত, তালীম ও তাজকিয়ার কাজ একসাথে চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিতেন। দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গতার ব্যাপারে তিনি খুবই সচেতন ছিলেন। কোন প্রকার সংকীর্ণতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। সত্য কথা বলতে তিনি কারো পরোয়া করতেন না। দ্বীনের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সঠিক কথা বলতেন। কখনো কখনো কোন তিক্ত কথা কারো অপছন্দ হলেও তার কোন পরোয়া করতেন না। আলেম সমাজের মর্যাদাকে উর্ধ্বে স্থান দিতেন।
ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব সুয়াবিল তালিমুল ইসলাম বালিকা মাদ্রাসা ও খানেকাহে এমদাদিয়া এর মাহফিলে তিনি কয়েকবার তাশরীফ এনেছিলেন। সংক্ষিপ্ত বয়ান ও দোয়া করেছিলেন। আমাদের সান্নিধ্য প্রদান করে ধন্য করেছিলেন।
হযরত মাওলানা যুবাইর আহমদ সাহেব (রহ.) এর খলীফাগণের তালিকা:
১. হযরত মাওলানা আবদুল মাবুদ সাহেব (রহ.), হ্নীলা, কক্সবাজার।
২. মাওলানা কাজী জহুরুল ইসলাম সাহেব, খান বাহাদুর বাজার, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
৩. মাওলানা আবুল কাশেম শরীফ (গোপালগঞ্জী), শনিরআখড়া, রায়েরবাজার, ঢাকা।
৪. হযরত মাওলানা গোলাম কাদের সাহেব,
(সাতকানিয়ার হুজুর) সাবেক উস্তাদ, মেখল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।
৫. হযরত মাওলানা এহসান সাহেব, পোকখালী ঈদগাহ, কক্সবাজার।
৬. মাওলানা আবদুল হামিদ সাহেব, (খুলনা)
মুহাদ্দিস, জামেয়া রহমানিয়া মুহাম্মদপুর, ঢাকা।
৭. মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ শাহনগরী সাহেব,
মুহতামিম-শাহনগর দারুল উলুম মাদ্রাসা, ফটিকছড়ি।
৮. মাওলানা মোহাম্মদ এমদাদ সাহেব,
পোকখালী ঈদগাহ, কক্সবাজার।
৯. মাওলানা হাফেজ নুরুল হুদা সাহেব,
পোকখালী ঈদগাহ, কক্সবাজার।
১০. হাফেজ মাওলানা কাসেম সাহেব,
ফাজেলে দারুল উলুম দেওবন্দ, চকরিয়া, কক্সবাজার।
১১. মাওলানা মোহাম্মদ নোমান সাহেব,
পিতা-মাওলানা মুখতার আহমদ সাহেব, পোকখালী ঈদগাহ কক্সবাজার।
১২. অধ্যাপক মোহাম্মদ যায়েদ সাহেব, ঢাকা।
১৩. হাজী মোহাম্মদ ইসহাক সাহেব, ঢাকা।
১৪. মাওলানা আল আমীন সাহেব, ঢাকা।
১৫. জনাব মোহাম্মদ শফিক, খুলনা
১৬. জনাব মোহাম্মদ মুনির, বরিশাল
১৭. সাহেবজাদা মাওলানা ওবাইদুল্লাহ সাহেব,
খানেকাহে যাকারিয়া ও মাদ্রাসায়ে মুজাহেরুল উলুম, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা।
১৮. মুফতী যুবায়ের আহমদ সাহেব, মিরপুর, ঢাকা।
১৯. মুফতী সালিম বর্মী, মালেশিয়া।
২০. মাওলানা ওসমান, মালেশিয়া।
২১. মাওলানা জাকওয়াল, মালেশিয়া।
২২. মাওলানা জামাল উদ্দিন, মালেশিয়া।
২৩. মাওলানা অলি আহমদ, (মহিষখালী) মালেশিয়া।
২৪. মাওলানা হোসাইন বিন আবদুল কাদের বর্মী, মালেশিয়া।
২৫. মাওলানা মোহাম্মদ ইদ্রিস বর্মী, মালেশিয়া।
লেখক: প্রবীণ ইসলামি চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত জীবনী লেখক ও গবেষক, সহ-সভাপতি- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, সম্পাদক- সাপ্তাহিক জমিয়ত, প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম: পূর্ব সুয়াবিল তালিমুল ইসলাম বালিকা মাদ্রাসা ও খানেকাহে এমদাদিয়া, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।
মোবাইল:-০১৮১৭-৫৩২৭০৯
No comments:
Post a Comment