Sunday, February 26, 2017

দ্বীন শিক্ষায় জিজ্ঞাসার গুরুত্ব : শৈথিল্য ও সীমালংঘন

দ্বীন শিক্ষায় জিজ্ঞাসার গুরুত্ব : শৈথিল্য ও সীমালংঘন

-মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

আজকাল বাংলাভাষায় ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর  লেখাজোখা হচ্ছে। ইসলামী প্রকাশনা শিল্পের ক্রমবিস্তারআমাদের মনে বেশ আশার সঞ্চার করছে। অনেকেই দ্বীনী বই পুস্তক কিনছে। দ্বীন সম্পর্কে জানার আগ্রহবাড়ছে। নতুন-নতুন পাঠক সৃষ্টি হচ্ছে। অংকের হিসাবে বলা যায় একটা বড়-সড় পাঠকমহল গড়ে উঠেছে । সেই সংগে নানা আংগিকে দ্বীনের আলোচনাও চলছে। ওয়াজ মাহফিলের পরিমাণ বাড়ছে। তাবলীগজামাতের মাধ্যমেও প্রচুর দ্বীনী আলোচনা হচ্ছে। মসজিদসমূহে জুমুআর দিন বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।বস্ত্তনিষ্ঠ আলোচনার পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বাড়ছে। জুমুআ ছাড়াও বিভিন্ন উপলক্ষে দ্বীনীআলোচনা হচ্ছে। ঘরোয়া পরিবেশেও আলোচনা অনুষ্ঠান হচ্ছে। হক্কানী পীর মাশায়েখের সংখ্যাও এখন আগেরতুলনায় অনেক বেশি। পীর-মুরীদির ধারায়ও দ্বীনের আলোচনা হচ্ছে এবং এভাবেও লোকজন দ্বীন শিখছে।নিঃসন্দেহে এসব  যুগের এক লক্ষণীয় দিক। দ্বীনের প্রচার প্রসার  দ্বীনী শিক্ষার বিস্তারে  সবগুলোরইভূমিকা সাধুবাদ পাওয়ার উপযুক্ত। এই বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে ভাবা যায় কি মানুষের ঈমান-আকীদাইবাদত বন্দেগীআখলাক চরিত্র তথা দ্বীনের সর্বাঙ্গনে কী ভয়াবহ অবক্ষয় দেখা দিতআল্লাহতাআলা সেই পরিণতি  থেকে  দেশবাসীকে রক্ষা করুন এবং সে লক্ষ্যে এসব প্রচেষ্টাকে আরও বলিষ্ঠতারসাথে অব্যাহত রাখার তাওফীক দান করুন।
তবে এই একরৈখিক পরিসংখ্যান নিয়ে তুষ্ট হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর বিপরীত চিত্রেও নজর দেওয়াদরকার। এসব মাধ্যমে যারা দ্বীন শিখছে তারা সমাজের কত শতাংশযারা এখনও পর্যন্ত এর আওতায়আসেনিতারা কত শতাংশনিশ্চয়ই পার্থক্যটা অনেক বড়। সমাজের সিংহভাগ মানুষই এমনযারা এসবমাধ্যমের কোনও একটির ধরা ছোঁয়াকে কবুল করেনি। তারাও মুসলিম। অন্ততপক্ষে নিজেদের সেই পরিচয়ইদিয়ে থাকে। সেই পরিচয়ের তাগিদেই হয়ত বা জুমুআর নামায পড়ে। ঈদের মাঠে আসে। জানাযায় শামিলহয়। 
এবং এরকম আরও কিছু ইসলামী লক্ষণ আলামত আলগোছে ধরে রেখেছে। তারা ইসলাম সম্পর্কে বলাযায় কিছুই জানে না। আকীদা বিশ্বাসের কোনও খবর নেই।  মুমিন হতে হলে কী বিশ্বাস রাখতে হয় সে নিয়েতাদের চিন্তা নেই। কি-কি কারণে ঈমান নষ্ট হয়ে যায় তা তাদের ভাবনায়ই আসে না। ওযূ-গোসলহালাল-হারাম প্রভৃতি বিষয়ে তাদের অজ্ঞতার কোনও সীমা নেই। গোটা ইসলাম সম্পর্কেই তারা বেখবর। বাপ-দাদামুসলিমব্যস সেই সুবাদে নিজে মুসলিম। এর বাইরে ইসলাম সম্পর্কে জানার কোনও গরজ তারা বোধ করেনা। সুতরাং পরিতুষ্টির সুযোগ কোথায়?
কথা আছে অন্যখানেও। যারা কোনও না কোনওভাবে দ্বীনের সাথে জড়িতদেখতে-শুনতে দ্বীনদারনামায-রোযা করেমসজিদে আসেহয়ত বা কোনও পীরের মুরীদও কিংবা কোনও দ্বীনী খেদমত  দাওয়াতীকর্মকাণ্ড সাথে জড়িতদ্বীন  শরীআত সম্পর্কে তাদের জানা শোনার অবস্থা কীঅবস্থা যে সন্তোষজনকনয় একটু দৃষ্টিপাত করলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায় এদের আকছারেরই সুন্নত বিদআতের কোনও ধারণা নেই। বরং তাওহীদ  শিরকের প্রভেদ সম্পর্কেও তারাসচেতন নয়। শাহজালাল রাহএর দরগাহ  আজমীরে মানত কেবল কবর পূজারীই নয়কবরপূজা হারামজানা লোককেও করতে দেখা যায়। বেঈমানী কথা বলে বা শিরকী কাজ করে ঈমানহারা হয়ে গেছেঅথচ সেনিয়ে কোনও ভাবনাচিন্তা নেইএমন লোক কথিত দ্বীনদারদের মধ্যেও ঢের আছে। নিয়মিত তাসবীহআদায় করে অথচ সহীহ শুদ্ধভাবে নামায পড়তে জানে নাএমন লোকের কি কোনও অভাব আছেএমনবহু লোক আছেযে দাওয়াতী কর্মে সদা তৎপরঅথচ সে জানে নাতার উপর হজ্ব ফরয হয়ে আছে। রকম অজ্ঞতার ফিরিস্তি দিতে থাকলে খতিয়ান অনেক লম্বা হয়ে যাবে। সারকথা এটাই যেআজদ্বীনদারদেরও বড় অংশ দ্বীন সম্পর্কে জানে বড় কম। সর্বগ্রাসী জাহালাতের গরাস হয়ে আছে সমাজের প্রতিটিস্তর। অতি নগণ্য সংখ্যাই তা থেকে মুক্ত আছে।
এই সর্ববিস্তৃত অজ্ঞতার কারণ কীকারণ তো এই যেঅজ্ঞতা এক কঠিন ব্যাধি।  ব্যাধি নিরাময়েরওওষুধ আছে। কিন্তু যারা এতে আক্রান্ত তারা নিজেদের রোগী মনে করছে না। তারা যে রোগী সেই বোধতাদের নেই। আর বোধ নেই বলে নিরাময়ের কথা ভাবছে না এবং ওষুধ সেবনের চিন্তা করছে না।
ওষুধ সেবনের চিন্তা করতযদি নিজেদের রোগী ভাবতে পারত। তাই এখন বড় দরকার তাদের মধ্যে রোগ-সচেতনতা সৃষ্টি করার। অজ্ঞতা যে তাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছেতাদের ঈমান আমল বরবাদ করছেতাদেরমানবিকতা ধ্বংস করছে এবং মানুষ হিসেবে তাদের জন্মগ্রহণ ব্যর্থ করে দিচ্ছেসেই চেতনা  অনুভূতিতাদের মধ্যে জাগ্রত করা ছাড়া এই মহাব্যধির চিকিৎসা সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি দরাকার ওষুধ সরবরাহ করা এবং তা সেবনে তাদের উদ্বুদ্ধ করা।
তা অজ্ঞতা নামক ব্যাধি নিরাময়ের কী উপায়উপায় মূলত তিনটি-
একউলামায়ে কিরামের কাছে দ্বীন  শরীআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা;
দুইদ্বীনী রচনাবলী পাঠ করা।
তিনউলামা-মাশায়েখের সাহচর্য গ্রহণ করা।
 লেখার উদ্দেশ্য মূলত দ্বীনী জ্ঞান আহরণের এই তিন মাধ্যম সম্পর্কে সামাজিক শৈথিল্য  সীমালংঘনেরপ্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সর্বপ্রথম আলোচনা করা যাক উলামায়ে কিরামের কাছে জিজ্ঞাস করা সম্পর্কে। বিষয়ে কুরআন মাজীদে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
فَسْـَٔلُوْۤا اَهْلَ الذِّكْرِ اِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ
তোমাদের জানা না থাকলে জ্ঞানীজনকে জিজ্ঞেস কর। -সূরা নাহ্ল (১৬) : ৪৩সূরা আম্বিয়া (২১) : 
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّمَا شِفَاءُ الْعِيِّ السُّؤَالُ
অজ্ঞতার দাওয়াই তো জিজ্ঞেস করা। মুসনাদে আহমাদহাদীস ৩০৫৫সুনানে আবু দাউদহাদীস ৩৩৬সুনানে কুবরাবায়হাকীহাদীস ১০৭৫
কিন্তু  দাওয়াই আজ চরমভাবে আবহেলিত। অধিকাংশ মানুষই এটি ব্যবহার করে না আবার যারা ব্যবহারকরে তাদেরও অধিকাংশ ভুল ব্যবহার করে। অর্থাৎ  ব্যাপারে দুরকম প্রান্তিকতাই বিদ্যমান। হয় এর প্রতিশৈথিল্য করা হয়নয়ত করা হয় সীমালংঘন।
জিজ্ঞেস করতে শৈথিল্য  অবহেলা
আকীদা-বিশ্বাসইবাদত-বন্দেগীঅর্থ-সম্পদ সংক্রান্ত লেনদেনপারস্পরিক আচার-ব্যবহার  আখলাক-চরিত্রএই যাবতীয় বিষয়েই রয়েছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকিন্তু তা জানে জনযারা জানে না তাদেরইবা জন  সম্পর্কে জ্ঞানীজনদের জিজ্ঞেস করেঅধিকাংশেই করে না। হয়ত একটা ভুল বিশ্বাস অন্তরেপোষণ করছেসেই বিশ্বাসের উপর তার বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছেতাও কাউকে জিজ্ঞেস করে নাবিশ্বাসটি সঠিক কি না। সেই বিশ্বাসটি শিরক  কুফর পর্যায়েরও হতে পারে। একটু বিবেক বুদ্ধি খাটালে সেসম্পর্কে অন্তরে খটকা লাগারই কথা। তা সত্ত্বেও দেখা যায় সেই বিশ্বাস নিয়ে কবরে যাচ্ছেজীবনেএকটিবারও কারও কাছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার গরজ বোধ করে না। একজননামাযী মানুষ যদি শাহজালালের দরগায় মানত করে তাকে আমরা কী হিসেবে নেবদরগায় মানত করা যেশিরকী কাজনামাযীর মনে সে প্রশ্ন কেন জাগবে নাএমন বহু নামাযীকেই  জাতীয় মানত করে তা পূরণকরতে দেখা যায়। একবারও জিজ্ঞেস করে নাতার  কাজটি জায়েয হচ্ছে কি না জাতীয় মানত তোবিশ্বাসের বিভ্রান্তি থেকেই করা হয়ে থাকে। দরগার পীর ফকীর মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে পারে বলে যে নামাযীবিশ্বাস করে সে ঠিক কতটুকু নামাযী এবং তার ঈমানের কী অবস্থামুমিন হয়ে থাকলে  প্রশ্ন তার মনে কেনজাগবে নাইসলাম যে ঈমানের শিক্ষা  দেয় তার কণামাত্রও যদি অবশিষ্ট থাকেতবে  প্রশ্ন জাগা উচিতবৈকি। কিছু কিছু লোককে প্রশ্ন করতে দেখাও যায়। কিন্তু অধিকাংশেই তা করে না। আকীদা বিষয়ে এটাএকটা উদাহরণ।  রকম উদাহরণ বিস্তর আছে। ভুলের উপর মানুষ জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেইবিশ্বাস শুদ্ধ করে ফেলা যায়। তাও জিজ্ঞেস করবে না। তাদের কাছে জিজ্ঞেস’ নামক দাওয়াইয়ের কোনওমূল্য নেই।
এই যে নামাযীদের কথা বললামতারা নামায কতটুকু সহীহ-শুদ্ধ পড়ছে তাও কখনও খতিয়ে দেখে না।মসজিদে এসে দেখে ইমাম সাহেব রুকূ থেকে উঠে সিজদায় যেতে উদ্যত। এক নামাযী নিজে নিজে রুকূ দিয়েজামাতে শামিল হয়ে গেল এবং ইমামের সাথে একত্রে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করল। আপনি তার পাশেইনামায পড়েছেন। রুকূ আপনিও পাননি। ফলে সালামের পর আপনি আরেক রাকআত নিজে নিজে পড়েনিলেন। ওই লোক পাশেই তা দেখছে। কিন্তু একটি বার জিজ্ঞেস করছে নাতার নামায হল কি না।
এমন বহু মালদার আছেযারা নিজেরাই ফয়সালা নিয়ে নেয় তার উপর যাকাত ফরয হয়নি। কাউকে তারসম্পদের হিসেব দিয়ে জিজ্ঞেস করে না যেতার উপর যাকাত ফরয কি না।
বাবা কি মায়ের ইন্তিকাল হয়ে গেলএখন মীরাছ কিভাবে বণ্টন করতে হবেবহু  নিয়মিত মুসল্লী আছেযারাকোনও আলেমকে তা জিজ্ঞেস করে না। এরকম রাশি-রাশি উদাহরণ দেওয়া যাবে। এরা নিজ ইচ্ছামত চলে।কিংবা সমাজের প্রচলনই তাদের কাছে শেষ কথা। তাই কোনও আলেমকে জিজ্ঞেস করে না তাদের চলাটাঠিক হচ্ছে কি না। ফলে অজ্ঞানতার গভীর অন্ধকারেই তারা পড়ে থাকে। ভুল ভ্রান্তি  কুসংস্কারের ভেতর  দিনাতিপাত করে আর মনে করে বেশ ধর্মজীবন যাপন করছে। এরাও তো কুরআন মাজীদের এই ইরশাদেরমধ্যে পড়ে যায়-
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْاَخْسَرِیْنَ اَعْمَالًا اَلَّذِیْنَ ضَلَّ سَعْیُهُمْ فِی الْحَیٰوةِ الدُّنْیَا وَ هُمْ یَحْسَبُوْنَ اَنَّهُمْ یُحْسِنُوْنَ صُنْعًا.
বলআমি কি তোমাদের সংবাদ দেব কর্মে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্তদেরতারা সেই সব লোকপার্থিব জীবনে যাদেরপ্রচেষ্টা নষ্ট হয়ে যায়অথচ তারা মনে করে যেতারা উত্তম কাজ করছে। -সূরা কাহ্ফ (১৮) : ১০৩-১০৪
 ক্ষতি থেকে তাদের উদ্ধারের উপায় দ্বীন  শরীআত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান আহরণ করা আর সে লক্ষ্যে দ্বীনশিক্ষার এই অন্যতম প্রধান মাধ্যম (উলামায়ে কিরামের কাছে জিজ্ঞেস করা’-কেঅবলম্বন করা।
 ব্যাপারে উলামায়ে কিরামও স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা আপন-আপন স্থান থেকে মানুষেরভেতর এই বোধ চাপিয়ে দিতে পারেন যেদ্বীন শেখার জন্য আলেমদের কাছে প্রশ্ন তাদের করতেই হবে।ভুলের উপর থাকা চলবে না। প্রকৃত মুমিন  মুসলিম হতে হলে দ্বীনের সহীহ-শুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করতেই হবেআর তার এক প্রকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে প্রশ্ন করা

জিজ্ঞেস করতে লজ্জা যেন বাধা না হয়
অনেকেই জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করে।  লজ্জা পরিত্যাজ্য। যে লজ্জা মানুষকে দ্বীন শেখা হতে বঞ্চিত রাখেপ্রকৃতপক্ষে তা লজ্জাই নয়। তা ভীরুতাপলায়নপরতা  জড়ত্ব। একে যে প্রশ্রয় দেয় সে চির জাহেল হয়েইথাকে। নিঃসন্দেহে লজ্জাশীলতা এক প্রশংসনীয় গুণ এবং তা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংগও বটেকিন্তু যে লজ্জামানুষকে অজ্ঞ করে রাখেতা অতি নিন্দনীয়। তা ঘৃণাভরে ঝেড়ে ফেলা উচিত।
দেখুন লজ্জা নারীর ভূষণ’ বলে একটা কথা আছেযদিও প্রকৃতপক্ষে তা নর-নারী নির্বিশেষে প্রত্যেক মুমিনেরভূষণসেই লজ্জাকে দ্বীন শেখার ক্ষেত্রে প্রশ্রয় না দেওয়ার কারণে আনসারী নারীদের প্রশংসা করা হয়েছে।আমাদের বিদূষী মা হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাবলেন,
نِعْمَ النِّسَاءُ نِسَاءُ الْأَنْصَارِ لَمْ يَكُنْ يَمْنَعُهُنَّ الْحَيَاءُ أَنْ يَتَفَقَّهْنَ فِي الدِّينِ.
আনসারী নারীগণ কতই না ভালো। দ্বীনের জ্ঞানার্জনে লজ্জা তাদের বাধা দিতে পারেনি। -সহীহ মুসলিমহাদীস ৩২২৩৩২মুসনাদে আহমাদহাদীস  ২৫১৪৪সুনানে আবু দাউদহাদীস ৬৪২
 প্রশংসার কারণ তারা একান্ত নারী সংক্রান্ত বিষয়েও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছেমাসাইল জিজ্ঞেস করতেন। তিনিও পরম মমত্বের সাথে তাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। সাধারণভাবে সাহাবায়েকিরামের নীতি এটাই ছিল যেতারা দ্বীনী বিষয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করতেলজ্জাবোধ করতেন না। তাঁর ওফাতের পর তারা পরস্পর একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতেন। বহু মাসআলায়তারা উম্মাহাতুল মুমিনীনের শরণাপন্ন হয়েছেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাএর কাছে তো তারাঅনেক বিষয়েই জিজ্ঞেস করেছেনএমন কি যাকে লজ্জার মনে করা হয়ে থাকে এমন বিষয়েও। বস্ত্তত এটাইনিয়ম। আমার যে বিষয় জানা নেই তা যে ব্যক্তি জানে তার কাছে জিজ্ঞেস করতে সংকোচবোধ কেন করবঅজ্ঞতা তো কিছু গৌরবের বিষয় নয় যেলজ্জাকে প্রশ্রয় দিয়ে তা ধরে রাখতে হবেজ্ঞানস্পৃহা তো মানুষেরস্বভাবগত। জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বই হযরত আদম আলাইহিস সালামকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পরিয়েছিল। সেই শ্রেষ্ঠত্বধরে রাখার জন্য জ্ঞানাহরণ করতেই হবে। লজ্জা যদি তাতে বাধা হয়তবে সেই অবাঞ্ছিত লজ্জাকেই পরিষ্কারকরতে হবেজ্ঞানাহরণ থেকে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি দ্বীন  শরীআত সম্পর্কে ভালোজানে অসংকোচে তার কাছে নিজ অজানা বিষয়ে জিজ্ঞেস করা চাই।
জিজ্ঞেস করবে কাকে?
হাঁজিজ্ঞেস করতে হবে যথার্থ জ্ঞানীজনকেই।  ব্যাপারেও মারাত্মক শিথিলতা লক্ষ করা যায়। ব্যস টুপি-দাড়ি থাকলেই তাকে মৌলভী সাহেব মনে করা হয়। এটা যেন মৌলভী হওয়ার নিদর্শন। ইসলামে মৌলভীসাহেবের জন্য তো আলাদা কোনও পোশাক  পৃথক কোনো বেশভূষা নেই। দাড়ি রাখা সুন্নত সকলেরই জন্য। সালিহীন  নেক বান্দাদের পসন্দের পোশাক মুসলিম মাত্রেরই পছন্দনীয় হওয়া উচিত। উলামা মাশায়েখ যে লেবাস ব্যবহার করেনতা যদি কেউ ভালোবাসে সে ধন্যবাদার্হ। কিন্তু তাই বলে সে আলেম হয়ে যায় না। তাকে আলেম মনে করা উচিত না। কিন্তু সমাজ তাই মনে করছে। টুপি দাড়ি থাকলেই তাকে হুজুর ডাকছে এবং তার কাছে মাসআলা জিজ্ঞেস করছে। একটু খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছেনা যেআসলেই সে  আলেম কি না। আবার সেই লোকও কম যায় না। প্রশ্ন করা হচ্ছে দেখে নিজের প্রকৃতঅবস্থান যেন ভুলে যায়। মনে মনে নিজেকে আলেমের মসনদে বসিয়ে উত্তর একটা দিয়ে দেয়।  জাতীয়লোকদের অনেক উত্তর আমার সরাসরি নিজ কানেই শোনা আছে। তা রীতিমত ভয়ংকরদুঃখজনকহতবুদ্ধির  কলঙ্কজনক। তার  দুঃসাহসিক হরকতের জন্য  সাধারণের নির্বিচার জিজ্ঞাসাও কম দায়ী নয়।আম সাধারণ কেন  জাতীয় শৈথিল্য দেখাবেএটা তো হাতুড়ে ডাক্তার দ্বারা জটিল রোগের চিকিৎসাকরানোর চেয়ে কম আত্মঘাতী নয়। ওই চিকিৎসায় যদি ভবলীলা সাঙ্গ হয় তো  জিজ্ঞাসায় আখিরাতবরবাদ যায়। এরচে’ বড় ক্ষতি আর কী হতে পারেইদানীং অবশ্য হাতুড়ে ডাক্তার দেখানোর প্রবণতাঅনেক কমে গেছে। কিন্তু বে-এলেম আবেদের কাছে জিজ্ঞাসার প্রবণতায় বিশেষ কমতি পরিলক্ষিত হয় না ।সত্যিকারের আবেদ হলেও না হয় কথা ছিল। জিজ্ঞেস করা হয় কেবলই জাহিরী পোশাক দেখে। আকছারখাদেম মুআযযিনকেও মানুষ মুফতী মর্যাদা দিয়ে বসে। সন্দেহ নেই মসজিদের খেদমত অনেক বড়ফযীলতের কাজ। মুআযযিনের মর্যাদা তো অনেক উঁচুতে। কিন্তু আমাদের সমাজ তো মুআযযিনকে সেইমর্যাদা দেয় না এবং  পদের জন্য কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতাও খোঁজে না। কেবল কণ্ঠস্বরই মানদ- তাই সুরেলাকণ্ঠের বে-এলেম মুআযযিন হয়ে যায়। ব্যতিক্রম হয়ত আছেকিন্তু সাধারণ অবস্থা বড় দুঃখজনক। হাঁ যদিতাদেরকে আলেম গণ্য করা না হয়এবং তারাও নিজ অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক থাকে এবং মহবক্ষত  পরমশ্রদ্ধাবোধের সংগে  পদের দায়িত্ব পালনে রত থাকেতবে নিঃসন্দেহে হাশরের ময়দানে  রকমমুআযযিনগণ বহু লোকের ঈর্ষার পাত্র হবে। সন্দেহ নেই  রকম মুআযযিন  দেশে অনেক আছে। আল্লাহতাআলা তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করুন এবং দুনিয়ায়ও তাদেরকে ইজ্জতের জীবন দান করুন।
কথা হচ্ছিলদ্বীনী বিষয় যারে-তারে জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। কুরআন মাজীদ তো নির্দেশনা দিয়েছে- (তরজমাতোমার জানা না থাকলে জ্ঞানীজনকে জিজ্ঞেস কর’ [সূরা নাহ্ল (১৬) : ৪৩] 
সুতরাং দ্বীন সম্পর্কেযার ভালো জানা আছে জিজ্ঞেস তাকেই করতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল সনদ  সার্টিফিকেট থাকাই যথেষ্ট নয় চর্চায় নিয়োজিত আছে কি না তাও লক্ষ রাখা উচিত। সেই সংগে তাকওয়া পরহেযগারীও। জিজ্ঞেস যখনদ্বীন সম্পর্কে তখন দ্বীনদার আলেমকেই সন্ধান করা উচিত। আমি যা জানতে চাই তার উপর আমারআখিরাতের নাজাত নির্ভর করে। আমি তার কাছে চাই নাজাতের পথ জানতেকিন্তু অজ্ঞতাবশত সে যে পথদেখাল তা নাজাতের নয়বরং ধ্বংসের পথ। তাই সতর্কতা জরুরি। জিজ্ঞেসও অবশ্যই করতে হবে এবং সেজন্য উপযুক্ত লোকেরও সন্ধান করতে হবে। সন্ধান করলে পাওয়াও অবশ্যই যাবে। হয়ত খানিকটা সময়দিতে হবে। একটু পথ চলতে হবেকিন্তু উদ্দেশ্য যখন নিজ দ্বীনের হিফাজত  আখিরাতের নাজাততখনএতটুকু কষ্ট তো করতেই হবে। বড় চমৎকার বলেছেন মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহ.-
إِنَّ هَذَا الْعِلْمَ دِينٌ، فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُونَ دِينَكُمْ
এই ইলম তো দ্বীনসুতরাং লক্ষ করে দেখ কার নিকট থেকে নিজ দ্বীন নিচ্ছ।
-সহীহ মুসলিম, ; সুনানে দারেমীবর্ণনা ৩৯৯মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছারবর্ণনা ১৫৩

তলাবা  উলামাও জিজ্ঞাসা থেকে বেনিয়ায নয়
জিজ্ঞাসাকে জ্ঞানাহরণের মাধ্যম তো সর্বাপেক্ষা বেশি বানানো উচিত তলাবা  উলামার। 
সত্যিকারের উলামাও প্রকৃতপক্ষে তলাবাই। তালিবুল ইলম অর্থ যখন জ্ঞানের সন্ধানীতখন জিজ্ঞাসা অর্থাৎ জানার ইচ্ছাতো তার মজ্জাগতই থাকবে। তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রেপ্রতিটি লোমকূপে উঠবে অদম্য কৌতূহলেরআকুলতা। সেই আকুলতা নিবারণের জন্য সে জিজ্ঞাসার আশ্রয় নেবে। আমি জিজ্ঞাসা’ শব্দটিকেসচেতনভাবেই ব্যবহার করছি। প্রশ্ন অপেক্ষা  শব্দটিই আলোচ্য বিষয়ের পক্ষে বেশি ব্যঞ্জনাময়। আমার বড়ভালোবাসার শব্দ এটি। এর ঝঙ্কার বাজুক প্রত্যেক তালিবুল ইলমের অন্তরে। আজ এর বড় অভাব দেখি। একছাত্র যেন আরেক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করে। এরূপ লজ্জাশ্রয়ী ছাত্র ইলমের রাজ্য কিভাবে বিচরণকরতে পারে। জিজ্ঞাসায় সপ্রতিভ থাকাই তো হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর শান। এই শান যে অবলম্বন করতেপারবে সম্ভাবনা  সামর্থ্যের উচ্চতায় সে না পৌঁছে যায় না। খুব সম্ভব ইমাম আজম ইমামুল-আইম্মতিল-ফুকাহা আবূ হানীফা  রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ওয়া আলা আসহাবিহীসম্পর্কে কোথাও পড়েছিলামতাঁরজ্ঞানের সাগর হয়ে ওঠার উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেনআমি যা জানি নাসে সম্পর্কেজিজ্ঞেস করতে কখনও লজ্জাবোধ করিনি। একই রকম জিজ্ঞাসার জবাবে হিবরুল উম্মাহ হযরত আব্দুল্লাহইবনে আবক্ষাস রাবলেছিলেনজিজ্ঞাসাপ্রিয় রসনা  সমঝদার অন্তঃকরণের কারণে’(- যা কিছু শিখেছি)আমি যত বড় আলেম দেখেছি তাদের সকলকেই  ব্যাপারে স্বচ্ছন্দ  অনাড়ষ্ঠ পেয়েছি। আর নিঃসন্দেহেতাদের বড় হয়ে ওঠার পেছনে  গুণের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং জ্ঞানের রাজ্যে যারা অবাধবিচরণ করতে চায়তাদের  গুণ অর্জন করতেই হবে। তাফাক্কুহ ফীদ দ্বীন তথা দ্বীনের স্বচ্ছ  গভীরজ্ঞানার্জন যাদের লক্ষ্য তাদের  ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনও অবকাশ নেই। এর মাধ্যমে তারা পারেঅন্যের সাধনালব্ধ জ্ঞানের অংশীদার হতে। অন্যের কাছে প্রশ্ন করা  মতবিনিময়ের দ্বারা বিষয়েরআগাপাছতলা পরিস্ফুট হয়নজর প্রসারিত হয় এবং অচিন্তিত দিকের দ্বারোম্মোচন হয়। এত বড় উপকারীজিনিসকে অবহেলা করা যায়না করা উচিততা ছাড়া প্রশ্ন করা যায় আপন মনেও। অন্যের কাছেজিজ্ঞাসার আগে নিজে নিজে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সকল দিকে নজর বোলালে  আপন মনে প্রশ্ন তুলে তার জবাবহাতড়াতে থাকলে বিষয়টির প্রসার  গভীরতার সন্ধান পাওয়া যায়। তালিবুল ইলমের তলবএর সেটাইতো প্রথম যাত্রা। অগ্রযাত্রাকে সচল রাখার পক্ষে যে প্রাণশক্তি দরকার  কৌতূহল দ্বারাই তা অর্জিত হতেপারে।

বাড়াবাড়িমূলক প্রশ্ন
এমন বহু লোকও আছেযারা দরকারি বিষয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না অথচ অহেতুক বিষয়ে প্রশ্নকরতে বেজায় উৎসাহ বোধ করে। এমন সব বিষয়ে তারা প্রশ্ন করেযাতে না আছে কোনও দ্বীনী ফায়দানাদুনিয়াবী উপকার। এরকম নিরর্থক বিষয় নিয়ে তারা বাকশক্তির অপচয় করেসময় নষ্ট করে  অন্যকেকরে বিব্রত। একে তো অহেতুক বিষয়ে লিপ্ত হওয়া মুসলিমের শান নয়। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
অহেতুক বিষয় পরিহার করা ইসলামের এক সৌন্দর্য। -জামে তিরমিযীহাদীস ২৩১৭সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস ৩৯৭৬
তদুপরি এটা অন্যের পক্ষে বিব্রতকর। যেমন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতামাতা জান্নাতে  যাবে কি না প্রশ্নের পেছনে পড়ার কোনও দরকার আছেএটা জানা কি ঈমানের অংগ। না জানলে কিইসলাম ত্রুটিপূর্ণ থেকে যাবেযাকে প্রশ্ন করা হয় সে এর কী উত্তর দেবেযদি বলে জান্নাতীতবে কুরআন-হাদীসে যাদের সুনির্দিষ্টভাবে জান্নাতী বলা হয়নিতাদের জান্নাতী হওয়ার সার্টিফিকেট কে দিতে পারেআরযদি বলে জান্নাতী নয়তবে নবীপ্রেমে উজ্জীবিত এক বক্তা  শ্রোতার পক্ষে এরকম কথার উচ্চারণ হৃদয়েশরাঘাত অপেক্ষাও কঠিন নয় কিহাঁতারা জান্নাতে যাবেন এই আশাবাদ তো ব্যক্ত করাই যেতে পারেকিন্তুএরূপ প্রশ্নের কর্তা তো অতটুকুতেই সন্তুষ্ট হওয়ার নয়। তো যেই প্রশ্নের উত্তর তাকে সন্তুষ্ট করবে নাতার পেছনে তার পড়াই বা কেন জাতীয় এক প্রশ্ন করা হয়েছিল ইমাম আবূ হানীফা রাহ.-কে। জিজ্ঞাসা ছিলহযরত আলী রা হযরত মুআবিয়া রা.-এর মধ্যে কে সঠিক ছিলেন এবং সিফফীনের যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছিলেনআখিরাতে তাদের কী হবেতিনি উত্তর দিয়েছিলেন-
إذا قَدِمْتُ على الله يسألني عما كَلَّفَنِي ولا يسألني عن أمورهم .
আমার তো ভয় নিজের সম্পর্কে যেনা জানি আল্লাহ তাআলা আমাকে কোন্ কোন্ বিষয়ে সওয়াল করেন।কিয়ামতে যখন আমাকে তাঁর সামনে দাঁড় করানো হবেতখন তাদের কোনও বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করা হবেনা। প্রশ্ন তো করা হবে তাঁর প্রদত্ত বিধানাবলী সম্পর্কে যেআমি তা কতটুকু পালন করেছি। কাজেই তাতেব্যস্ত থাকাই শ্রেয়। (উকূদুল জুমানঅর্থাৎ দুনিয়া  আখিরাতের লাভ লোকসান যে বিষয়ের সাথে জড়িতনয়তা নিয়ে প্রশ্নোত্তরে লিপ্ত হওয়া কিছু বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এরকম অহেতুক বিষয়ে প্রশ্ন করতে কুরআনমাজীদেই নিষেধ আছে। যখন হজ্ব ফরয করা হয় এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেসকরলহজ্ব কি প্রতি বছর ফরযউত্তরে তিনি বললেনযদি আমি হাঁ’ বলি তবে তাই হবে। যে বিষয়েতোমাদেরকে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করো না।  এরই পরিপ্রেক্ষিতে আয়াতনাযিল হয়-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَسْـَٔلُوْا عَنْ اَشْیَآءَ اِنْ تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ  .
হে মুমিনগণতোমরা সে সব বিষয়ে প্রশ্ন করো নাযা প্রকাশিত হলে তোমরা দুঃখিত হবে। [সূরা মায়িদা () : ১০১] -জামে তিরমিযীহাদীস ৮১৪
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে সতর্ক করে দেন যেদেখতোমাদের আগের জাতিসমূহ বাড়তি প্রশ্নের কারণে ধ্বংস হয়েছে। তাদেরকে তাদের নবী যখন কোনওবিষয়ে হুকুম করতেনতারা তার বিপরীতে নানা প্রশ্ন করে তাকে উত্ত্যক্ত করত। (সাবধান তোমরা সে রকমকরো না। তবেতোমরা যদি আমাকে কোনও বিষয়ে জিজ্ঞেস কর আমি অবশ্যই তা তোমাদের বলে দেব।তখন বিভিন্নজন বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাপ্রশ্ন করে বসলেনইয়ারাসূলাল্লাহআমার পিতা কেবললেনতোমার পিতা হুযাফা ইবনে কায়স। তারপর তিনি নিজ মায়েরকাছে গিয়ে  বৃত্তান্ত জানালেন। তার মা তাকে ধমক দিয়ে বললেনছি বাবা কথা কেন জিজ্ঞেস করলেআমরা জাহিলী যুগে ছিলাম। কত রকম খারাপ কাজ করতাম। সে মতে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম অন্য কাউকে তোমার বাবা বলতেন কিয়ামত পর্যন্ত আমার মুখে চুনকালি পড়ত। অন্য একবর্ণনায় আছেএক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলআমার প্রবেশ কোথায় হবেরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বললেনজাহান্নামে।  অবস্থা দেখে হযরত উমর রাসচকিত হয়ে উঠলেন। তিনি হাটু ভেংগেবসে পড়লেন এবং বললেন-
رَضِينَا بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا.
আমরা রাযী  সন্তুষ্ট যেআমাদের রব আল্লাহআমাদের দ্বীন ইসলাম এবং  আমাদের রাসূল  নবীমুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।-সহীহ মুসলিমহাদীস ২৩৫৯সহীহ বুখারীহাদীস ৯৩মুসনাদেআহমাদহাদীস  ১২৬৫৯১০৫৩১
কুরআন মাজীদের  সতর্কবাণী  নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরবিয়তের ফলে সাহাবায়েকিরামের পরিপূর্ণ ইসলাহ সাধিত হয়েছিলযে কারণে দুচারটি ঘটনার বাইরে তাদের জীবনে বাড়তি প্রশ্নেরকোনও নজীর পাওয়া যায় না। কিন্তু পরবর্তীকালের মানুষের মধ্যে যারা সাহাবায়ে কিরামের প্রত্যক্ষতরবিয়ত পায়নি এবং তারও পরে যারা তাবিঈগণের সাহচর্য থেকে জীবন গড়েনিতারা ক্রমে নববী শিক্ষাথেকে দূরে সরে যায়। তাই তাদের প্রশ্নের ধরন ধারণও পাল্টে যায়। অনেকে অহেতুক  অনাকাঙ্ক্ষিতবিষয়েও প্রশ্ন করতে শুরু করে। এরূপ সীমালংঘন যে ঘটবেপ্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। যেমন এক বর্ণনায় আছেপ্রখ্যাত তাবিঈ মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহবলেনএকদা আমি হযরত আবূ হুরায়রা রাএর কাছে বসা ছিলাম। এসময় এক ব্যক্তি তাকে একটা বিষয়েপ্রশ্ন করে। আমি জানি না বিষয়টা কীহযরত আবূ হুরায়রা রাবলে উঠলেনআল্লাহু আকবার বিষয়েএর আগে আরও দুজন প্রশ্ন করেছে। এই হচ্ছে তৃতীয়জন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেবলতে শুনেছিএকদল লোক খুব বেশি প্রশ্ন করবে এবং তাদের প্রশ্নের মাত্রা  পর্যায়ে পৌঁছে যাবে যেজিজ্ঞেসকরে বসবেআল্লাহ তাআলা সব মাখলুক সৃষ্টি করেছেনতা আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে কে? -সহীহ মুসলিমহাদীস ১৩৫২১৫মুসনাদে আহমাদহাদীস ৭৭৯০
সহজেই বোঝা যায় এটা এক অবান্তর প্রশ্ন। কারণ সকলের যিনি স্রষ্টা তিনি তো মাখলুক হতে পারেন না যেতার কোনও সৃষ্টিকর্তা থাকবে। তা থাকলে তিনি স্রষ্টাই হতে পারতেন না আর তখন কোনও সৃষ্টিরই অস্তিত্বলাভ হত না। তো এই যে অবান্তর প্রশ্নের সূচনা হয়েছে তখন থেকে কালক্রমে এর বিস্তার ঘটতে থেকেছে।আর আজ অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেমানুষ দরকারি বিষয়ে প্রশ্ন করে নাঅথচ এমন সব বেদরকারিবিষয়ে প্রশ্ন করেদুনিয়া  আখিরাতে যার কোনও ফায়দা নেই। সে সম্পর্কে না কবরেহাশরে প্রশ্ন হবে আরনা তা অজানা থাকলে কোনও জ্ঞানী লোক তাকে অজ্ঞ ঠাওরাবে।
এই সীমালংঘন অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কাজের কথা ছেড়ে অকাজে লিপ্ত হওয়া কোনও  আকলমন্দী নয়।আকেল  বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার জীবনের সীমিত  সময় কেবল প্রয়োজনীয় কাজেই খরচ করবে। সে হিসেবেযা জানা দরকার সে সম্পর্কে সে অবশ্যই বিজ্ঞজনকে জিজ্ঞেস করবে আর যা জানা অপ্রয়োজনীয়সে সম্পর্কেপ্রশ্ন করা হতে বিরত থাকবে। প্রশ্নোত্তর  সওয়াল জওয়াবের ক্ষেত্রে এটাই মধ্যপন্থা। আল্লাহ তাআলাসকলকে  পন্থা ধরে রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।

No comments:

Post a Comment