মূলঃ আশরাফুল উলামা, হাকীমূল উম্মত, মুজাদ্দিতে মিল্লাত, কুতুবুল ইরশাদ হযরত মাওলানা শাহ্ মুহাম্মদ আশরাফ আলী সাহেব থাবনী (দাঃ বাঃ)
সংকলকঃ আহকার : খাজা আজীজুল হাছান(গুফিরালাহু) তারিখ ৭ই মুহাররম ১৩৪৫ হিজরী
প্রশ্নঃ হযরত! এই যে বলা হয়, বান্দাকে যে সমস্ত আমলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তা সব বান্দার "এখতেয়ারী" তথা ইচ্ছাধিন বিষয়। আর ইচ্ছাধিন বিষয়ের মধ্যে ত্রুটি বিচ্ছুতির চিকিৎসা, হিম্মত ও ইচ্ছাকে ব্যাবহার করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এটাকে বাহ্যিক দৃষ্টিকোন থেকে খুব সাধারণ কথা মনে হয়। তরীকে ছুলূকের গুরুত্ব তাহলে থাকে কোথায়?
উত্তরঃ এটা যে একটা সাধারণ ও মোটাকথা এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তার প্রতি মানুষের কোন গুরুত্ব নেই। অথচ সমস্ত "ইছ্লাহ্" তথা আত্নিক চিকিৎসা, এর উপর নির্ভর করে। এটা হল সমস্ত প্রকার অলসতা ও ত্রুটির আসল চিকিৎসা।
প্রশ্নঃ হযরত! চেষ্টা করা সত্ত্বেও যখন মানুষ নিজের আত্নিক চিকিৎসায় ব্যার্থ হয়। তখন সে তার তদবীর ও চিকিৎসা বা ব্যাবস্থাপনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তখন তাকে এতটুকুন কথা বলে দেয়া। "হিম্মত ও ইচ্ছাকে ব্যবহার করে কাজ কর" এটা যথেষ্ট কেমনে হয়? কারণ হিম্মত ও ইচ্ছাকে ব্যাবহার করার তাওফীক তার হচ্ছে না?
উত্তরঃ আগে দেখতে হবে, ঐ ব্যক্তি তার ইচ্ছাকে ব্যাবহার করতে সক্ষম কি না। অবশ্য সে হিম্মত ও ইচ্ছাকে ব্যবহার করতে সক্ষম। "সক্ষম না" বলা হলে কুরআন হাদীস মিথ্যা হয়ে যাবে। ইচ্ছাকে ব্যাবহার করতে যখন সক্ষম। হিম্মত করে তা ব্যাবহার করবে। যখন সে ইচ্ছাকে ব্যাবহার করবে। তখন সে কামিয়াব হবে। ব্যার্থ হবে না। তবে কষ্ট-ক্লেশ ও মুশকিলের মুকাবিলা তাকে অবশ্য করতে হবে।
প্রশ্নঃ হযরত! প্রকৃত শক্তি ও ইচ্ছাকে অস্বীকার করা যায় না। তবে মুশকিল ও কষ্টের কারণে যখন তা ব্যাবহার করার সুযোগ পাওয়া যায় না। তখন ঐ ইচ্ছায় আর লাভ কি হল? কারণ তার কোন ইচ্ছা না থাকলে যা হত। এখনও তো সেই এক ফলাফল দাড়াচ্ছে। অর্থাৎ আমল অস্তিত্বে আসছে না।
উত্তরঃ চিকিৎসা পত্রের কথা যখন জিজ্ঞাসা করাহয়। তখন ঐটাই বলা হয়। যা মূল চিকিৎসা পত্র। তবে চিকিৎসা পত্র ব্যাবহার করা মুশকিল হওয়ার বিষয়টা এখনও আলোচনায় আসেনি। এ বিষয়ে যখন প্রশ্ন করা হবে। তখন উত্তর দেয়া হবে।
প্রশ্নঃ হযরত! এখন ঐ বিষয়টা যানতে চাচ্ছি?
উত্তরঃ ইচ্ছাধিন বিষয়ে ত্রুটির চিকিৎসা হল। হিম্মত ও ইচ্ছাকে ব্যবহার করা ব্যতীত অন্যকিছু নয়। তবে ঐ ব্যবহারে মুশকিল ও কষ্ট-ক্লেশ অবশ্য আছে। সে মুশকিল ও কষ্ট-ক্লেশ দূর করার চিকিৎসা পত্র এটাই। কষ্ট-ক্লেশ সত্ত্বে জোর পূর্বক হিম্মত ও ইচ্ছাকে ব্যবহার করায়। ধীরে ধীরে ঐ কষ্ট ক্লেশ পরিবর্তিত হয়ে আছান হয়ে যায়। সকল রিয়াজত মুজাহাদা এজন্য করা হয়। যেন পালনীয় ও বর্জনীয় বিষয়কে ইচ্ছার আওতায় আনা সহজ হয়। আমি বলে থাকি, খুলূছ (ইখলাছ) ও হিম্মত এই দুইটা হল। সমস্ত পীর মুরীদী ও তাছাউফের সারকথা। কারণ হিম্মত না হলে আমল হয়না। আর ইখলাছ না থাকলে আমল কবুল হয় না। এই দুই জিনিস থাকলে তখন শায়খের প্রয়োজন হয় না। কারণ শায়েখ এইদুই জিনিস তালীম দিয়ে থাকেন।
কষ্ট ক্লেশ দূর করার পদ্ধতি হযরত থানবী রহঃ বললেন। জোর পূর্বক হিম্মত ও ইচ্ছাকে ব্যবহার করতে হয়। আস্তে আস্তে ব্যাপারটা আছান হয়ে যায়। এই প্রসংগে তিনি আরো বলেন। যে কোন কাজ প্রথম পর্যায়ে মুশকিল থাকে। কিন্তু করতে করতে চর্চা হয়ে যায়। পরে খুব সহজে হতে থাকে। যেমন প্রথম দিকের ছবক কঠিন মনে হয়। কিন্তু জপতে জপতে পরে সহজ হয়ে যায়। প্রথম পর্যায়ের কষ্ট ক্লেশ দেখে যদি হিম্মত হারিয়ে ফেলা হয়। তাহলে কামিয়াবীর অন্য কোন পদ্ধতি নাই। আর যদি এই কষ্ট ক্লেশ সহ্য করে নেয়। তাহলে অল্প দিনের মধ্যে দেখতে পায়। খুব আছানীর সাথে ঐ আমল হয়। কবি বলেন, "অল্প জীবন সাধণা কর, তবে সারা জীবন তুমি হাসবে।"
প্রশ্নঃ ইখলাছ ও হিম্মত হল তাছাউফের সারকথা। হযরত যখন একথা বলতে ছিলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল। হযরত! ইখলাছ কি ইচ্ছাধিন ব্যাপার?
উত্তরঃ বান্দাকে যেহেতু ইখলাছের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং তা অবশ্য ইচ্ছাধিন বিষয়। "কারণ ইচ্ছাধিন নয়" এমন জিনিসের নির্দেশ শরীয়ত দেয় না। ইচ্ছাধিন কেন হবে না? "ঘী" কে "খাটি" রাখা কি বান্দার ইচ্ছাধিন নয়? তার সাথে তেল, চরবীর মিশ্রণ না ঘটলে তো ঐ ঘী সাধারণ লোকদের পরিভাষায় (কৌতুকতার সুরে হযরত বললেন) "নাখালেছ" হয়ে যায়। অর্থাৎ খালেছ বা খাটি হয়ে যায়। আর ইবাদতকে খাটি রাখার নাম ইখলাছ।
প্রশ্নঃ হযরত! আত্নার চিকিৎসার ক্ষেত্রে শায়খের দোয়ার একটা বড় ভূমিকা থাকে?
উত্তরঃ বরকত অস্বীকার করছি না। তবে তাকে কার্যকরি করার জন্য ছালেককে ভূমিকা নিতে হবে। শায়খের বরকতের অবস্থা হল এমন। যেমন জোলাফের মধ্যে গুয়ামুরির রসের ভূমিকা থাকে। অর্থাৎ গুয়ামুরির রস জোলাফকে শক্তিশালী করে বটে। তবে জোলাফ ব্যতীত শুধু গুয়ামুরির রস বেকার।
প্রশ্নঃ হযরত! আমরা দেখেছি, শায়খের দোয়া ও মনোযোগের বরকতে নিজেদের মধ্যে অনেক পরিবর্তন আসে।
উত্তরঃ জোলাফের সাথে যদি গুয়ামুরির রস সেবন করে। অতঃপর অবিরাম দাস্ত শুরু হয়। তাহলে তার অর্থ কি এই, শুধুমাত্র গুয়ামুরির রস এরজন্য যথেষ্ট? জনাব! শুধু দোয়ার দ্বারা কোন কাজ হয় না। যতক্ষণ না নিজের ইচ্ছাকে কাজে লাগায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে বেশী বরকতওয়ালা মানুষ। যার দোয়া আল্লাহ পাক বেশী কবুল করেন। এমন মানুষ অন্য কেউ নয়। আর হযরতের চাচা আবু তালিব তার জন্য কত আত্নত্যাগী ও আশেক ছিলেন। তার ঈমানের জন্য তিনি জান প্রাণ দিয়ে দোয়া করেছিলেন। কালিমা পড়তে তিনি তাকে পীড়াপীড়ি করেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে যেহেতু চাননি, ফলে ঈমান নছীব হয় নি। এটা হুবহু ডাক্তার ও রুগীর দৃষ্টান্ত। রুগী যদি ঔষধ সেবন না করে। তাহলে শুধুমাত্র ডাক্তারের স্নেহ ভালবাসা দ্বারা রুগী ভাল হয়ে যায়? সুস্থতা তার দেয়া ব্যাবস্থা পত্র গ্রহণ করার দ্বারা আসে। আরো একটি দৃষ্টান্ত, বাচ্চা যদি পড়া মুখস্ত না করে। তাহলে মুখস্ত কেমনে হয়? শুধুমাত্র উস্তাদের স্নেহ ভালবাসা ও মনোযোগের কারণে পড়া মুখস্ত হয় না। পড়া কেবল পড়লে মুখস্ত হয়।
প্রশ্নঃ হযরত! শায়খের দোয়ার বরকতে তাওফীক হয়ে যায়?
উত্তরঃ আমি বলেছি, বরকত দ্বারা সহযোগীতা অবশ্য পাওয়া যায়। তবে এ বরকত যথেষ্ঠ নয়। বরকত সাহায্যকারী হয় তবে যথেষ্ট হয় না। এমনকি শুধুমাত্র শায়খের বরকত নিস্ফল। কিন্তু হিম্মত ও ইচ্ছার ব্যবহার ফলপ্রসু। আমি লোকদেরকে খোলামেলা ভাবে বলি। কেউ যদি তার আত্নার সংসোধান নিজে করতে পারে তবে সে আমাদের নয়নমনি। এটা অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার। কারণ এতে আমাদের বোঝা হালকা হয়। অন্যথায় খামাখা লোক জনকে নিজের কাছে বন্ধী করে রাখতে চাইনা।
প্রশ্নঃ হযরত! আপনার এ বক্তব্য নিম্নের কবিতার পরিপন্থী তো নয়?
"সাথী বিহীন অবস্থায় ইশকের রাস্তায় চলে যে,
জীবন তার শেষ হয়, ইশকের সন্ধান পায় না সে।"
উত্তরঃ পরিপন্থী কেন হবে? এটাতো আমার বক্তব্যকে সমর্থন করছে। এখানে বলা হয়েছে, শায়েখ বিনে ইশকের সন্ধান ও অবগতি লাভ করতে পারে না। তাকে আমি অস্বীকার কখন করলাম? শায়েখ রাস্তা দেখাবেন। তবে তার অর্থ এই নয় যে। শায়েখ তাকে টেনে হেচড়ে নিয়ে যাবেন। অন্ধকে মানুষ পথ দেখায়, কিন্তু কোলে তুলে নেয় না। রাস্তা অতিক্রম করা তার চলার দ্বারা হয়। রাস্তা দেখানো অবশ্য শায়েখের কাজ। কিন্তু তা অতিক্রম করা মুরীদের কাজ। সংকলক সাহেব বলেন, এখানে এসে হযরতের একটা পুরাতন বাণী মনে পড়ল। এক ব্যক্তিকে তিনি বিস্তারিত ছুলূকের রাস্তার হাকীকত বুঝানোর পর বললেন। আলহামদুল্লিলাহ! আমি এক বৈঠকে ছালেককে খোদা পর্যন্ত পৌছে দেই। কারণ লক্ষ বস্তু বর্ণনা করার অর্থ হল। তাকে লক্ষ বস্তুর হাকীকত পর্যন্ত পৌছে দেয়া। যদি কেউ রাস্তা দেখাতে গিয়ে বলে। ঐ যে বাতি জলছে। সে যেন তাকে বাতি পর্যন্ত পৌছে দিল। এখন শুধু তার রাস্তা চলা বাকী থাকে। আর এটাতো ছালেকের ইচ্ছাধিন ব্যাপার। কদম তুলে সে যদি চলতে থাকে তাহলে লক্ষে পৌঁছে যাবে।
প্রশ্নঃ ইচ্ছা সম্পর্কে হযরতকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন।
উত্তরঃ ইচ্ছা তো প্রকাশ্য জিনিস। আর প্রকাশ্য জিনিসের জন্য দলীলের প্রয়োজন হয়না। ইচ্ছা স্পষ্ট জিনিস, যা মানুষ সহ পশু জগত অনুভব করে। দেখনা, কুকুরকে যদি লাঠি দ্বারা মারা হয়। তাহলে সে আক্রমন ঐ মানুষের উপর করে। লাঠির উপর নয়। সেও জানে কে ইচ্ছাধিন, আর কে ইচ্ছাধিন নয়। প্রত্যেকে যেন তার অনুভূতি শক্তি যাচাই করে দেখে। যখন সে কোন অন্যায় কাজ করে। তখন লজ্জিত হয়। নিজেকে অসহায় বা বাধ্য মনে করলে লজ্জিত কেন হয়। লজ্জা নিজের ইচ্ছাধিন কাজের উপর হয়। সুতরাং এটা নিশ্চিত কথা। মানুষ ইচ্ছাধিন জিব। আর এই ইচ্ছার ব্যপারটা এত স্পষ্ট। প্রত্যেক মানুষ নিজের মধ্যে তা সভাবগত ভাবে অনুভব করে। "জবরিয়া" যে সম্প্রদায় আছে, তারা শুধু মুখে মুখে জবরিয়া। অন্যথায় অনুভূতি গত ভাবে তারাও ইচ্ছাকে স্বীকার করে। অস্বীকার করার উপায় তাদের নেই। দ্বিতীয় কথা হল, এই বিষয়টির মূল রহস্য কারো জানা নেই। তাজানা সম্ভব নয়। তবে কোনো জিনিসের মূল প্রকৃতি জানা না থাকার অর্থ এই নয়। ঐ জিনিসের অস্তিত্ব নাই। আলোর মূল প্রকৃিত কারো জানা নাই। কিন্তু তার অস্তিত্ব স্পষ্ট ব্যপার। কেউকি তা অস্বীকার করতে পারে? হযরত মাওলানা রুমী রহঃ অত্যন্ত সাদামাঠা ভাষায় এই ইচ্ছা ও অসহায়ের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন। (কান্না কাটি করা হল জোর জবরদস্তি ও অপারগ হওয়ার দলীল। আর লজ্জিত হওয়া হল, ইচ্ছাধিন হওয়ার দলীল) অপারগ যদি না হবে তাহলে কান্নাকাটি কেন? আর ইচ্ছা যদি না থাকবে। তাহলে নিজের কর্মের জন্য লজ্জা কেন? মোটকথা মানুষ না সম্পূর্ণ ভাবে ইচ্ছাধিন। আরনা সম্পূর্ণ ভাবে অপরাগ। সম্পূর্ণ ভাবে ইচ্ছাধিন না হওয়ার অর্থ হল। তার ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার আওতায় থাকে। স্বতন্ত্র ভাবে তা কার্যকারী নয়। মোটকথা মানুষ ইচ্ছাধিন হওয়ার ব্যপারটা অকাট্য। অবস্থা যখন এই, নিজের সংসোধণের জন্য ঐ ইচ্ছাকে ব্যাবহার করা উচিত। যতক্ষণ তা নাকরা হবে ততক্ষণ সংসোধণ সম্ভব নয়। যেমন কারো মধ্যে যদি কৃপনতার সভাব থাকে। তাহলে এসভাব শুধু জিকির শোগল, শায়েখের দোয়া ও মনোযোগ দ্বারা দূর হয় না। এ কুসভাব নফসের সাথে যুদ্ধ করার দ্বারা দূর হয়। তবে জিকির শোগল ইত্যাদি তাকে সাহায্য অবশ্য করে। কিন্তু যুদ্ধ ব্যতীত শুধু জিকির শোগল যথেষ্ঠ নয়। হযরত শায়েখ আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গুহী রহঃ তার চিঠি পত্রের মধ্যে জাগায় জাগায় বলেছেন। "কাজ কর, কাজ কথার আগে চলে। বিশেষ করে তাছাউফের জন্য কাজের মত কাজ হওয়া দরকার।"কাজ করার দ্বারা কাজ হয়। শুধুমাত্র তামান্না বা দোয়ার দ্বারা কিছু হয়না।
প্রশ্নঃ হযরত! অনেক বুযুর্গের দ্বারা বড় বড় পাপীর ইসলাহ হয়েছে?
উত্তরঃ এটা এক ধরণের আত্নিক শক্তি। এ ধরণের আত্নিক শক্তি মানুষের ইচ্ছাধিন নয় এবং বুযুর্গীর জন্য কোন জরুরী বিষয় নয়। অনেক বুযুর্গদের মধ্যে মোটেও পাওয়া যায় না। উপরন্তু তার প্রতিক্রিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থায়ী হয় না। কিছু দিন পরে আগের অবস্থায় চলে যায়। পক্ষান্তরে সাহস ও আমলের মাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা স্থায়ী হয়। মনোযোগের প্রভাবের দৃষ্টান্ত হল
। যেমন, কেউ চুল্লির কাছে গিয়ে বসল। যতক্ষণ সেখানে থাকে সারা শরীর গরম থাকে। কিন্তু যখন সেখান থেকে চলে যায় শরীর ঠান্ডা হয়ে যয়। আর আমল দ্বারা যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তার দৃষ্টান্ত হল, যেমন কেউ ঔষধ সেবন করে শারীরিক উত্তাপ সৃষ্টি করে। সে এখন পাহাড়ের চুড়ায় গেলেও তার উত্তাপ যথাবস্থায় বিদ্যমান থাকে। আর আসল উপকারী জিনিস ঐটা যা স্থায়ী হয়।
মোটকথা শুধুমাত্র দোয়া ও মনোযোগের উপর ভরসা করে বসে থাকা। নিজের সংসোধন নিজে না করা। অপরিপক্ক ধ্যান ধারণা ছাড়া আর কিছূ নয়। অতঃপর হযরত রসিকতার ছলে বললেন। আমি এই মহা চিকিৎসা পত্র লোকদের জন্য পেশ করছি। আর তোমরা চাচ্ছ, তার পাতার উপর কাগজ লাগিয়ে দিয়ে তার বিষয় বস্তুকে লুকিয়ে রাখতে।
প্রশ্নঃ হযরত! মানুষের খাসলত পরিবর্তন হয়না। তাহলে জন্মগত কুসভাব সংসোধন করার ব্যাপারটা মানুষের ইচ্ছাধিন কেমনে?
উত্তরঃ তাজ্জবের ব্যপার,এখনও এব্যপারে তোমার সন্দেহ রয়েছে। আচ্ছা বলদেখি, মূল ধাতু সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, না কাজ কারবার ও সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য? এটা আমি মেনে নিলাম, মূল ধাতু মানুষের ইচ্ছাধিন নয়। কিন্তু তার কাজ কারবার ইচ্ছাধিন। এটাতো সৃষ্টিগত সভাব নয়। মূল ধাতু অবশ্য দূর হয় না। তবে তার দাবী পুরণ করা ইচ্ছাধিন ব্যপার। আর মানুষ এর আদেশ প্রাপ্ত। ঐ মূল ধাতুর দাবীর সাথে বারবার যুদ্ধ করতে থাকলে এক পর্যায় তা দূর্বল হয়ে যায়। অতঃপর হযরত বলেন, এগুলো কাজের কথা। মূলতঃ এ সমস্ত কথা তালীমের যোগ্য। কিন্তু আমি দেখি, এসমস্ত বিষয়ের আলোচনা আজকাল কোথাও নেই। না ওলামাদের মজলিসে আর না মাশায়েখদের হালকায়। তাছাউফের একটা নকল ছবি বানিয়ে রাখা হয়েছিল। এজন্য অনেক দিন যাবৎ তার মূল প্রকৃতি লুকায়ীত ছিল। তবে আলহামদুলিল্লাহ এখন তা স্পষ্ট হল। কোন সংশয় এখন তার মধ্যে নেই। তাছাউফের কোন মাসআলার মধ্যে সামন্যতম সন্দেহ হয় না। না ছালেকের অবস্থার হাকীকত জানতে কোন প্রকার সমস্যা হয়। আর না তার সংসোধণের জন্য তদবীর নির্ধারণ করতে। যতবড় জটিল হালাত হোক না কেন। তার সমাধাণ দিতে কোন সমস্যা হয়না। এজন্য আমি কল্যাণকামী হয়ে আরজ করছি। এই জামানার এই স্পষ্ট অবস্থাকে গণীমত মনে করে তার কদর করা উচিত। এর দ্বারা উপকৃত হওয়া উচিত। সংকলক সাহেব বলেন। একদা জনৈক ছালেক হযরতের কাছে এসে আরজ করল। হযরত! আমার মধ্যে ওমুক ওমুক দোষ রয়েছে। সংসোধনের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছি। আপনি কোন পরামর্শ দিন। তখন হযরত কুদ্দিসা সিররুহু তার জন্য শুধুমাত্র হিম্মত ও এস্তেহজারের সিদ্ধান্ত দিলেন। এতে সে খুব উপকৃত হল। এস্তেহজারের ছুরত অনেক আছে। শায়েখ যার জন্য যা নির্ধারণ করেন। তার জন্য তা কার্যকারী হয়। যেমন, কোন ত্রুটি হলে প্রত্যেক ভুলের জন্য দশ রাকাত বা তার চেয়ে বেশী বা কম নফল নামাজ জরিপানা স্বরূপ আদায় করা। যাতে করে দ্বিতীয় বার যখন ত্রুটি দেখা দিবে। তখন জরিপানার ভয়ে এস্তেহজারের অবস্থা সৃষ্টি হয়। আর যখন এস্তেহজার হয়। তখন সাথে সাথে হিম্মত দ্বারা কাজ নিবে। নফসের চাহিদাকে পরাজীত করবে। এস্তেহজার ও হিম্মতের উপর আমল করলে ইনশাআল্লাহ ত্রুটি ও উদাসীনতা থেকে মুক্ত থাকবে। ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ সংসোধণ হবে। ঐ ছালেকের জন্য উল্লেখিত জরিপানা ছাড়া আমি প্রতিদিন "নুঝহাতুল বাছাতীন" নামক কিতাব পড়ার সিদ্ধান্ত দিয়ে ছিলাম। যার মধ্যে ওলী আল্লাহদের এক হাজার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এর দ্বারা অনেক উপকৃত হলেন। অধম সংকলক হযরতের ঐ হিম্মত ও এস্তেহজারের সিদ্ধান্ত সীমাহীন উপকারী হওয়ার কারণে একটা কবিতার মধ্যমে তা সাজিয়েছি, এখন প্রমাণ পূর্ণ হয়েছে।
আছ্ছাল ছাবীলের পরিপূরক স্বরূপ কিছু বর্ধিত অংশ যার নাম দেয়া হয়েছে আলইয়াম্মু ফিছছাম্মি (সুচের ছিদ্রে মহা সাগর)এটা পূর্বের বক্তব্যের জন্য সারসংক্ষেপ ও একটা চিঠির উত্তর। যেই চিঠির মধ্যে এমন ওজীফা বা তরীকা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। যার দ্বারা ইবাদতের মধ্যে উন্নতি হয় এবং গুনাহ থেকে বাচা সহজ হয়। তার উত্তর নিম্নে দেয়া হল। ইবাদত ও নাফরমানী, এই উভয়টা ইচ্ছাধিন জিনিস। ওজীফার কোন প্রকার দখল তার মধ্যে নেই। তরীকা ইচ্ছাধিন বিষয়ের ক্ষেত্রে ইচ্ছার প্রয়োগ ব্যতীত অন্য কোন ব্যবস্থাপত্র নেই। তবে হ্যাঁ ইচ্ছা প্রয়োগ যাতে সহজ হয়। তার জন্য মুজাহাদা করা জরুরী। আর মুজাহাদা হল, নফসের সাথে যুদ্ধকরা। এটা করতে থাকলে ধীরে ধীরে আমল করা সহজ হয়। এ বিষয়ের সবকিছু লিখে দিয়েছি।
নোটঃ সামনে শায়খের দুটি কাজ থেকে যায়। এক. কিছু আত্নীক রোগের পরিচয় জানা। দুই. মুজাহাদার জন্য কিছু নিয়ম নির্ধারণ করা। যা হবে ঐ সমস্ত রোগের ঔষধ। আশরাফ আলী
والله الموفق لما يحب ويرضى وصلى الله تعالى على خير خلقه سيدنا مولانا محمد واله واصحابه وبارك وسلم تسليما كثيرا كثيرا برحمتك يا ارحم الراحيم؛
No comments:
Post a Comment