Thursday, September 14, 2017

কুরআনের সবচেয়ে বড় আলিম

তাবেয়ী আবুল আহ্ওয়াস রহ. বলেন, আমি হযরত আবু মুসা আশআরী রা.-এর কাছে এলাম। সেখানে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ও আবু মাসউদ রা. উপস্থিত ছিলেন। তারা কুরআন মজীদ পড়ছিলেন। আমরা কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললাম। ইতোমধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সেখান থেকে উঠে কোথাও গেলেন। আবু মাসউদ রা. তখন বললেন, খোদার ক্বসম, যিনি এখন উঠে গেলেন তার চেয়ে বড় কুরআনের আলিম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কাউকে রেখে গেছেন বলে আমার জানা নেই। -সহীহ মুসলিম
তাবেয়ী মাসরূক বলেন, আমি সাহাবীগণকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। এরপর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, তাঁদের সকলের ইলম ছজনের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। তাঁরা হলেন- আলী রা., উমর রা., আব্দুল্লাহ রা., যায়েদ রা., আবুদ্দারদা রা. ও উবাই রা.। এরপর এ ছয় জনকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি যে, তাদের ইলম কেন্দ্রীভূত রয়েছে দুজনের মধ্যে-আলী রা. ও আব্দুল্লাহ রা.।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এ অবস্থানে কীভাবে পৌঁছলেন? আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুআ ও সাহচর্য তাঁকে এই অবস্থানে উন্নীত করেছিল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নবুওয়তপ্রাপ্ত হলেন তখন আব্দুল্লাহ রা.-এর বয়স আঠারো-উনিশ বছর। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও আমানতদারী ছিল লক্ষ করার মতো। সে সময়ের এক বিশেষ ঘটনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলেন। ঘটনাটি ছিল এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর সিদ্দীক রা. মরুভূমি দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। আব্দুল্লাহ তখন মরুর মাঠে ছাগল চড়াচ্ছিলেন। তিনি তখন উকবা ইবনে আবু মুয়াইত নামক এক লোকের ছাগল চড়াতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমার কাছে কি দুধ হবে? বালক বলল, হবে, তবে আমানতদার মনে করেই এগুলো চড়ানোর দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। তাঁর এ উত্তর শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। এরপর তাকে বললেন, তোমার ছাগপালে কি এমন কোনো ছাগল আছে যে এখনও সন্তানধারণের উপযুক্ত হয়নি? (অর্থাৎ যে ছাগলের দুধ দেওয়ার এখনো সময় হয়নি) বালক বলল, জ্বী হাঁ, আছে। সে তার ছাগপাল থেকে একটি ছাগল নবীর খেদমতে পেশ করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাগলটির ওলানে হাত বুলালেন। আল্লাহর কুদরতে সঙ্গে সঙ্গে তা দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এরপর একটি পাথরের পাত্রে সেই দুধ দোহন করা হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করলেন এবং আবু বকর রা.কেও পান করতে দিলেন। এরপর ওলান আবার আগের মতো হয়ে গেল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ মুজিযা দেখে আব্দুল্লাহর মনে ঈমানের বীজ রোপিত হল। তিনি নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং আরজ করলেন, ইয়া রাসূ্লুল্লাহ! আমাকেও ওই কালাম শিখিয়ে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাথায় হাত বুলালেন এবং বললেন, ইন্নাকা গুলাইয়িমুন মুয়াল্লামুন। আল্লাহ তোমাকে রহম করুন, তুমি একজন সুসভ্য বালক। -মুসনাদে আহমাদ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে আব্দুল্লাহ যে সনদ লাভ করলেন তার সে গুণ নবীর সোহবত পেয়ে বিকশিত হল এবং সুবাস ছড়াল।
তাবেয়ী আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াযিদ বলেন, আমরা হযরত হুযাইফা রা.-এর কাছে দরখাস্ত করলাম, আমাদেরকে এমন একজন ব্যক্তিত্বের সন্ধান দিন আচার-আচরণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে যার গভীর মিল রয়েছে। আমরা তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করে উপকৃত হতে চাই। হযরত হুযাইফা রা. বললেন, আমার জানামতে আচার-ব্যবহার, চাল-চলন ইত্যাদি সবকিছুতে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল হচ্ছে ইবনে উম্মে আবদের (এটা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর উপনাম)। সাহাবীগণ জানেন, ইবনে উম্মে আবদই হলেন তাঁদের মধ্যে আল্লাহ তাআলার সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ইসলামের প্রথম দিকেই ঈমান এনেছিলেন। এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, আমি হলাম ষষ্ঠতম মুসলিম। সে সময় ভু-পৃষ্ঠে আমরা ছাড়া আর কোনো মুসলিম ছিল না।
ইসলামের সেই প্রথম দিকের দিনগুলো ছিল বড় কঠিন। ইসলামের জন্য আব্দুল্লাহ অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সোহবত ও খিদমতে এমনভাবে আত্মনিয়োগ করলেন যে, নতুন আগন্তুকরা মনে করত, তিনি নবী-পরিবারেরই সদস্য।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যেতে তাঁর অনুমতির প্রয়োজন হতো না। নবীজি তাকে বলে দিয়েছিলেন, তুমি যেকোনো সময় পর্দা উঠিয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করতে পারবে এবং আমার একান্ত আলোচনাও শুনতে পারবে। -সহীহ মুসলিম
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে গেলে তাঁর জুতা মোবারক তিনিই বহন করতেন। অজুর পানি, মিসওয়াক, বিছানা ইত্যাদি বহনের খিদমতও তিনিই আঞ্জাম দিতেন।
এই ঐকান্তিক খিদমত ও সাহচর্যের ফল কী হয়েছিল এবং ইলম,আমল ও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনে তিনি কতদূর অগ্রসর হয়েছিলেন সে কথাই এখন একটু একটু করে বলছি।
হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন, একবার আমরা ছয়জন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক মজলিসে ছিলাম। এমন সময় কিছু কাফির তাঁর কাছে এল এবং অহঙ্কার করে বলল, এদের এখান থেকে তাড়িয়ে দিন, এরা যেন আমাদের উপর কোনো কথা বলতে না পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তা করছিলেন। ইতোমধ্যে আয়াত অবতীর্ণ হল। অর্থাৎ সূরা আনআম-এর ৫২ ও ৫৩ নম্বর আয়াত, যার তরজমা হচ্ছে-আপনি ওদেরকে দূরে সরিয়ে দিবেন না যারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে সকালে ও সন্ধ্যায়...।
সে ছয় সৌভাগ্যবানের অন্যতম হলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.। -সহীহ মুসলিম
উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে এদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দানের যেন আসমানী নির্দেশ অবতীর্ণ হল। জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মুআল্লিমের সযত্নদৃষ্টি যখন নিবদ্ধ হল তখন মাটির মানুষ সোনার মানুষে পরিণত হলেন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, তাকওয়া ও খোদাভীতিতে তাদের কোনো তুলনা কোথাও রইল না।
কুরআন মাজীদের সঙ্গে হযরত আব্দুল্লাহ মাসউদ রা.-এর ছিল হৃদয়ের সম্পর্ক। সবাই যখন নিদ্রায় অভিভূত হয়ে যেত তখন তার যবান থেকে মৌমাছির গুঞ্জনের মতো কুরআন তেলাওয়াতের ধ্বনি শোনা যেত।
এক রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দুই প্রিয় সাহাবী আবু বকর রা. ও উমর রা.কে সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছেন। মসজিদের এক প্রান্ত থেকে স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ স্বরে কুরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তেলাওয়াত শুনলেন। এরপর বললেন, যে কুরআনকে সজীবরূপে তেলাওয়াত করতে চায়, যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছে তাহলে যেন ইবনে উম্মে আবদের মতো তেলাওয়াত করে।
এদিকে তিলাওয়াতকারী নামায শেষে দুআয় মগ্ন হয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুচ্চস্বরে বললেন, প্রার্থনা কর তোমাকে দান করা হবে। সৌভাগ্যবান দুআকারী সেই শুভ মুহূর্তে না জানি কত কিছু চেয়ে নিয়েছেন। তবে ইতিহাসের পাতায় যতটুকু সংরক্ষিত আছে তারও কোনো তুলনা নেই। তিনি সে দুআয় বলেছেন, ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এমন ঈমান প্রার্থনা করছি, যা কখনো বিনষ্ট হবে না, এমন নিয়ামত প্রার্থনা করছি, যা কখনো নিঃশেষ হবে না, আর প্রার্থনা করছি আপনার নবীর সাহচর্য চিরশান্তির সর্বোচ্চ জান্নাতে।
ওমর রা. বলেন আমি ভাবলাম, এই সৌভাগ্যের সুসংবাদ আমি তাকে দিব। সকালে যখন তাঁর কাছে গেলাম, দেখি, হযরত আবু বকর আগেই তাকে এ সংবাদ জানিয়ে এসেছেন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমরা যখন দশ আয়াত শিক্ষা গ্রহণ করতাম তখন এর মর্ম জানার আগে এবং সে অনুযায়ী আমল করার আগে সামনে অগ্রসর হতাম না।
এই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে হযরত উমর রা. তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং মুহাববত করতেন। একদিনের ঘটনা। যায়েদ ইবনে ওয়াহাব বলেন, আমি ওমর রা.-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. উপস্থিত হলেন। ছোটখাটো মানুষ ছিলেন, হযরত উমরের চার পাশে বসে থাকা লোকদের কারণে তাকে প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না। কিন্তু তার দিকে নজর পড়ামাত্র উমর রা.-এর মুখমন্ডল উজ্জ্বল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে গেল। কিছুক্ষণ তাঁরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করলেন। তার প্রস্থানের সময় যতক্ষণ তাঁকে দেখা যায় উমর রা. একদৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে রইলেন। এরপর বললেন, কুনাইফুন মুলিআ ইলমা। অর্থাৎ জ্ঞানে পূর্ণ এক মহা জ্ঞান-পাত্র!
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ৩২ হিজরীতে মদীনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ ৩৩ হিজরীর কথাও বলেছেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল বাষট্টি কিংবা তেষট্টি বছর।
জীবনের শেষ দিকে হযরত উসমান রা.তাঁকে মদীনায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কুফার অধিবাসীরা বলল, আপনি এখানেই থাকুন। আমরা আপনাকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করব। আব্দুল্লাহ বললেন, তাঁর আদেশ পালন করা আমার জন্য অপরিহার্য। আর অচিরেই কিছু অনভিপ্রেত বিষয় এবং ফিৎনা সৃষ্টি হবে যার সূচনাকারী আমি হতে চাই না। একথা বলে তিনি মদীনায় ফিরে গিয়েছিলেন।

লিংকঃhttp://www.alkawsar.com/article/1635

গুমনাম এক আশেকে মাদানী-ইমদাদুল হক

ম্ভবত ১৪২৪ হিজরীর কথা। আমি তখন আমার প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার উলূমুল হাদীস তৃতীয় বর্ষে পড়ি। হযরত আমীনুত তালীম মাওলানা আব্দুল মালেক ছাহেব হুজুর একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, চৌদ্দগ্রামের মাওলানা আব্দুল মালেক হোসাইনী ছাহেবকে চেনো? আমি বললাম, চিনি না। হুজুর একটি চিঠি দেখালেন। প্রেরকের নাম, আব্দুল মালেক আলহোসাইনী আল-কাসেমী। একটি ইলমী বিষয়ে চিঠিটি লেখা। সেজন্য একটু খুশীও হলাম। আশ্চর্যান্বিতও হলাম। আমাদের এলাকায় এমন লোক আছেন! সঙ্গত কারণেই প্রেরকের প্রতি অন্যরকম একটি আগ্রহের জন্ম হল। পরীক্ষার বিরতিতে যখন বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিলাম তখন আরো লজ্জিত হলাম এবং নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলাম। কারণ তিনি আমাদের গ্রাম থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামের অধিবাসী। তাছাড়া তাঁর বংশীয় মুরুববীদের সাথে আমাদের বংশীয় মুরুববীদের বেশ উঠাবসা ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। পরে তাঁর সাথে যোগাযোগ করে তার বাড়িতে গেলাম। সালাম-মোসাফাহার পর পরিচয় দিলাম, আমাকে না দেখলেও আমার খোঁজ রাখেন বললেন, আববা চাচাদের হালপুরসি করলেন। মারকাযসহ অন্যান্য মাদরাসা সম্পর্কেও কথা হল। এরপর কথা উঠল কিতাবাদি সম্পর্কে। তিনি বিভিন্ন কিতাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছেন, কোনটি তাঁর কাছে আছে, কোনটি নেই তাও বলছেন। আমি একপ্রকার অবাকই হচ্ছি যে, এই সাদাসিধে মানুষটির কাছে এইসব কিতাব আছে!! অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে তাঁর কিতাবগুলো দেখার আবেদন করলাম, তিনি সহাস্যে তা মঞ্জুর করলেন এবং আমাকে কিতাবের কামরায় নিয়ে গেলেন। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে থাকলাম এবং পরবর্তীতে আরো বেশি সময় নিয়ে দেখার আগ্রহ বুকে চেপে ফিরে এলাম।
পুরো বিষয়টি পরে আমীনুত তালীম ছাহেব হুজুরকে জানালাম। হুজুরও তাঁর সাথে মুলাকাত এবং তাঁর কিতাবাদি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। সে উদ্দেশ্যে পরে হুজুরের একটি সফর হয়েছিল।
গত ৭ই ডিসেম্বর ২০১৩ ইং বিকাল ৪টায় ফোন বেজে উঠল। অপর প্রান্তে এক আত্মীয় বললেন, মাওলানা আব্দুল মালেক হোসাইনী ছাহেব গত রাতে
ইন্তেকাল করেছেন, আজ বাদ যোহর জানাযা ও দাফন হয়েছে। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
জীবিতাবস্থায় যতবারই দেখা হয়েছে, মনে হয়েছে একেবারেই সাদাসিধা একজন মানুষ। ইস্ত্রী-বিহীন জামা, মাথায় লম্বা টুপি, পায়ে স্যান্ডেল, কাঁধে রুমাল। পোশাকের মতোই তাঁর চালচলন কথাবার্তা এবং মৌন প্রকৃতির সাদাসিধা রূপ। সেজন্য পরিচিত লোকজন ছাড়া অন্যদের পক্ষে বুঝাই কষ্ট হত যে, তিনি একজন আলেম। ওদিকে সাধারণ আলেম শ্রেণী তাকে আলেম মনে করলেও ভাবতেন,  হয়তো সামান্য পড়াশোনা করেছেন। তিনি নিজের কাজেই নিমগ্ন থাকতেন। মানুষের সাথে অহেতুক মিশতেন না। কারো সাথে সাক্ষাৎ করলে প্রয়োজন সেরেই প্রস্থান করতেন। তাই সবার ধারণা, তিনি একজন শুষ্ক মানুষ। আবেগ-অনুভূতি, অনুরাগ-অভিমান তাঁর মাঝে নেই।
তাঁর ইনতেকালের পর তাঁর কুতুবখানায় আবার গেলাম। একটি একটি করে সবকটি কিতাব দেখার চেষ্টা করলাম। তাঁর ব্যক্তিগত আলমারী, ডায়েরি, কাগজ পত্র দেখতে লাগলাম। আর অবাক হতে লাগলাম এমন সাদাসিধা আত্মভোলা মনীষীর নিকট কীভাবে কোত্থেকে এল এইসব ভান্ডার! এমন শুষ্ক মানুষের মাঝে কীভাবে এই জযবা, এই ইশক!
তাঁর মাকতাবা আয়তনে সুবিশাল না হলেও যা জমা করেছেন তার সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐ বিষয়ে
বুনিয়াদি অথবা দুর্লভ কিতাব। তাঁর এই সুন্দর নির্বাচন থেকে তার ইলমী ও ফিকরী রুচির স্বচ্ছতা ভেসে উঠে। আকাবিরে হিন্দ-এর জীবনী, তাঁদের মালফুযাত-মাকতুবাত, তাঁদের তাফসীর বা অন্য কোনো তাসনীফ, রদ্দে ফেরাকে বাতেলা, তারীখে তাকসীমে হিন্দ, তারীখে দারুল উলূম দেওবন্দ, তারীখে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, বিভিন্ন লাইব্রেরীর কিতাবের তালিকা ইত্যাদি বিষয়ে অনেক বুনিয়াদি ও দুর্লভ কিতাব তিনি জমা করেছেন।
শুধু তাই নয়, বরং ভারত পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ সাপ্তাহিক, পাক্ষিক পত্রিকাগুলোও তিনি নিয়মিত সংগ্রহ করতেন। মাসিক আল কাসিম, মাসিক আলখায়ের (মুলতান), মাসিক আখবারে মদীনা (বিজনৌর), মাসিক আনওয়ারে মদীনা (লাহোর), মাসিক তরজুমানে ইসলাম (লাহোর), মাসিক আল ফিকাহ, মাসিক আনওয়ারে মদীনা, মাসিক আর রশীদ (পাকিস্তান), মাসিক নেদায়ে শাহী, মাসিক ইনসানিয়াত (কলকাতা), মাসিক দারুল উলূম দেওবন্দ, পাক্ষিক আয়েনায়ে দারুল উলূম, দেওবন্দ টাইম্স, নেদায়ে দারুল উলূম, আদ দায়ী, চেরাগে হরম, সাপ্তাহিক পায়ামে মাশরিক, আল জমিয়ত ইত্যাদি বহু পত্রিকা যতদিন আর্থিক সংগতি ছিল তিনি সংগ্রহ করেছেন।
এসব কিছু সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাঁর ভিতর যে তাড়নাটি কাজ করত, তা হল ভালো কিছুর সন্ধান ও তা পড়ার আগ্রহ। জীবিত অবস্থায় তাঁর কিতাবাদি সংগ্রহের বিষয়ে কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারিনি। সে জন্যে এখন আফসোস হচ্ছে। কিন্তু তার রেখে যাওয়া নোট-ডায়েরি সে বিষয়ে অনেক তথ্য দেয় আমাদেরকে।
মাওলানা মনযুর নোমানী রাহ. শাহ ওয়ালী উল্লাহ রাহ. সম্পর্কে মাসিক আল ফুরকানের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন। এ সংখ্যাটি তিনি কীভাবে সংগ্রহ করেছেন তার বর্ণনা মলাটের গায়ে উর্দূতে লিখে রেখেছেন। যার সারমর্ম হল ১৯৪০ সনে মাওলানা মনযুর নোমানী কুরআন হাদীসের মাহির কিছু সাহিত্যিকদের প্রবন্ধ একত্র করে শাহওয়ালী উল্লাহর উপর আল ফুরকানের একটি বিশেষ সংখ্যা তৈরী করেন। দেওবন্দে পড়াশোনাকালীন সময়ে তার সন্ধানে ছিলাম।
বড় বড় উলামায়ে কেরামের নিকট আমার এ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে চিঠি পাঠাতে লাগলাম। তখন মাওলানা নসীম আহমদ রাহ. মেহেরবানী করে ডাক মাধ্যমে আমার ঠিকানায় পত্রিকাটি পাঠিয়ে দেন। আল্লাহ তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন। জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।
উল্লেখ্য, জনাব নসীম আহমদ ছাহেব হযরত মাদানীর ছাত্র। ঐ সংখ্যায় তাঁরও লেখা রয়েছে। সম্ভবত এসব চিন্তাভাবনা করেই তাঁর নিকট পত্র লিখেছেন। তাঁর লেখাটিতে স্পষ্ট যে, তিনি এ সংখ্যাটির জন্য কত ব্যকুল ছিলেন, এবং তা অর্জনের জন্য কত চেষ্টা করেছিলেন। আমি পুরো লেখাটি উদ্ধৃত করিনি। লেখাটির শেষে পুনরায় মাওলানা নসীম আহমদ ছাহেবের জন্য দুআ করেছেন। ঐ সংখ্যায় মাওলানার লেখা যেখানে, সেখানের টিকাতেও তাঁর ইহসানের কথা পুনরায় উল্লেখ করেছেন। এসব কিছুই তাঁর অন্তরে যে প্রাপ্তির আনন্দ ছিল তার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
আরেক জায়গায় তিনি লেখেন, নুযহাতুল বাসাতীন কিতাবটি দিল্লির বেশ কয়েকটি কুতুবখানায় তালাশ করেছি। পাইনি। পরে কানপুরে এক লাইব্রেরীর পুরাতন ছেঁড়া কিতাব-কাগজ সংগ্রহ করে তালাশের সময় একদিন স্বপ্নে দেখি, দেওবন্দ জামে মসজিদের ফটকে রাস্তার দক্ষিণে মুফতিয়ে আযম কেফায়াতুল্লাহ রাহ. উপস্থিত, অত্যন্ত সাধারণ খদ্দর পরিহিত। মুসাফাহার পর জিজ্ঞেস করলাম, হযরত! নুযহাতুল বাসাতীন আপনার লাইব্রেরীতে আছে? তিনি বললেন, নেই। অতপর দিল্লির মাকতাবায়ে রহীমিয়াতে যোগাযোগ করে জানা গেল, তাদের কাছে কিতাবটি আগে ছিল, এখন নেই
একটি কিতাব সংগ্রহের জন্য লাইব্রেরীগুলোতে খোঁজ নেয়া, পরবর্তীতে বুদ্ধি করে পুরাতন ছেড়া বইপত্র সংগ্রহ করা, এরপর এমনভাবে ধ্যানমগ্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া যে স্বপ্নযোগেও তার তালাশ! এসব ঘটনা তাঁর কিতাবের প্রতি শুধু মহববত নয়, ইশকেরই প্রমাণ।
এসব তথ্য পাওয়ার পর ভাবি, একজন হতদরিদ্র মানুষ। তাঁর মধ্যে এ হালত কীভাবে সৃষ্টি হল। আমরা আজকের ছাত্ররা আজ আরো কত ভালো অবস্থায় আছি, কত টাকা পয়সা ব্যয় করি। তারপরও কিতাবের প্রতি আমাদের ইশক তো দূরের কথা, সামান্য টান আছে কি না সন্দেহ। হাঁ, টান বা ইশক আমাদের দিলে থাকে বটে, তবে তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জামা-কাপড় ও জুতার প্রতি।
ওই কিতাবটি যখন খোঁজেন সম্ভবত তিনি তখন দারুল উলূমের ছাত্র। আজ আমাদের শুধু ছাত্রজীবন নয় শিক্ষকতা জীবনের শেষেও কিতাবের প্রতি তেমন কোনো ঝোঁক সৃষ্টি হয় না। আসলে আমরা তালিবুল ইলম হলেও প্রকৃত তলবুল ইলম আমাদের মাঝে নেই। তিনি শুধু কিতাব সংগ্রহই করতেন না, তা পড়তেনও। তাঁর মাকতাবার খুব কম কিতাবই পাওয়া যাবে যেগুলোতে তাঁর টিকা, মন্তব্য, বা গুরুত্বপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা নেই। অনেক কিতাবের মলাটের গায়ে ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইঙ্গিত আছে।
তাঁর পরিবার থেকে জানতে পারলাম সারাদিন মাদরাসার ব্যস্ততা সেরে রাতে এসে কিতাব নিয়ে বসে যেতেন। চারদিকে কিতাব আর কিতাব। এভাবে রাত একটা-দুইটা পর্যন্ত মুতালাআ করে ওভাবেই কিতাবের মাঝে ঘুমিয়ে যেতেন। অনেক সময় চশমাটা পর্যন্ত চোখে থেকে যেত। আবার দিনের বেলায় একটু সময় পেলে তখনো কিতাব নিয়ে বসে যেতেন। তাঁর মেয়েরা বললেন, ঘর ছোট হওয়াতে অনেক সময় এজন্য আমাদের কষ্টও হতো।
কোনো কিতাব মুতালাআর সময় তাঁর কোনো তথ্য বা ঘটনা অন্য কিতাবে থাকলে কিতাবের টিকায় সেগুলোও লিখে দিতেন। কোনো কিতাব বা কোনো মনীষীর নাম আসলে বিশেষভাবে
হিন্দুস্তানী মনীষী হলে তাঁর পরিচয়ও টিকায় তুলে ধরতেন। তার বহু কিতাবে আমি এসব দেখেছি।
কিতাবের কোনো তথ্য বুঝে না আসলে তার জন্য বড়দের নিকট চিঠিপত্র লেখা শুরু করতেন। হিন্দুস্তানের আলেম উলামা, কিতাবাদি ও ইতিহাস মোটামুটি তার কাছে পরিষ্কার ছিল।
কিতাবের প্রতি যত্ন-আত্তিও ছিল দেখার মতো। প্রত্যেকটি কিতাব নিজেই মলাট লাগিয়েছেন। যেগুলো বাঁধাইয়ের প্রয়োজন সেগুলো নিজেই বাঁধাই করতেন। পাতা ছিঁড়ে গেলে কাগজ ও আঠা দিয়ে তা ঠিক করে নিতেন। সবকটি কিতাবের মলাটের ভিতরে এক দুইটি সাদা পাতা সংযুক্ত করে দিয়েছেন। যেন কিতাবের কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখানে টুকে রাখা যায় বা তার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে দেওয়া যায়। এক বাঁধাইতে কয়েকটি কিতাব হলে মলাটের গায়ে সবগুলির তালিকা দিয়ে দিয়েছেন। পত্রিকাগুলোও সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করে বাঁধাই করে সাজিয়ে রেখেছেন। আরো  বিস্ময়ের বিষয়, তিনি হিন্দুস্তানের তৎকালীন বড় বড় লাইব্রেরীগুলোর ক্যাটালগ বা কিতাব-তালিকার বইগুলোও সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলোও বাঁধাই করে রেখেছেন। সেগুলো এত পরিমাণ যে, কয়েক খন্ডে সেগুলো বাঁধাই করতে হয়েছে। একজন ইলম পিপাসুর জন্য এগুলো কত গুরুত্বপূর্ণ তা বলার প্রয়োজন নেই।
এ থেকেও তাঁর কিতাব সংগ্রহের নেশা ও রুচি সহজে বুঝা যায়, আল্লাহ আমাদেরকে তাদের মতো ইহতিরাক লিল ইলম দান করুন। আমীন।
তাঁর রেখে যাওয়া কাগজ-পত্র ও কিতাবাদির টিকা-নোট থেকে বোঝা যায়, দেওবন্দ পড়ার সময় থেকে বড়দের সাথে তাঁর চিঠিপত্রের ধারা অব্যাহত ছিল। আলফুরকান শাহওয়ালী উল্লাহ -সংখ্যায় মাওলানা গীলানী রাহ.-এর প্রবন্ধের শুরুতে টিকায় লেখেন, তিনি আল্লামা গীলানীর নিকট বিভিন্ন বিষয়ে পত্র দিয়েছেন এবং আল্লামা গিলানী অত্যন্ত বার্ধক্য সত্ত্বেও তাঁর পত্রগুলোর উত্তর দিয়েছেন।
ঐ সংখ্যার আরেকটি তথ্যের বিষয়ে লেখেন যে, এ বিষয়ে বড়দের অনেকের সাথে চিঠিপত্র দেওয়ার সুযোগ হয়েছে এবং সবগুলো চিঠি সংরক্ষিতও আছে। সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ মিয়াঁ রাহ. সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী, আসজাদ মাদানী, আরশাদ মাদানী, মাওলানা রশীদ আলওহীদীসহ অনেকের সাথে তাঁর চিঠি পত্র আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু আমি অনেক তালাশ করে তাঁর চিঠি পত্রের সামান্য কিছু পেলেও বড় অংশ উদ্ধার করতে পারিনি। আল্লাহ হয়তো কোনো সময় মিলিয়ে দিবেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শায়খুল ইসলাম হযরত মাদানী রাহ.-এর আশেকে যার ছিলেন। হযরত মাদানী রাহ.-এর ওফাতের বছর তিনি দেওবন্দে দাওরা হাদীস পড়েন। শ্রেণীকক্ষে তাঁর বসার স্থান দূরে পড়ে গিয়েছিল। তাই তিনি হযরত মাদানী-এর কাছে বসার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। বিস্তারিত তিনি সাইয়্যেদ মিয়া রাহ.-এর একটি কিতাবের শুরুতে লিখেছেন। যার সারমর্ম এই- সাইয়েদ মুহাম্মাদ মিয়াঁ সাহেবকে আমি সর্বপ্রথম দেখি ১৯৪৫ সনে হাটহাজারী মাদরাসায় এক জলসায় তিনি আরবীতে ভাষণ দিলেন। আমি তখন জামাতে নাহমে পড়ি, তখনই তাঁর প্রতি মহববত হয়ে গেল। ফতেহপুর মাদরাসার উস্তায মুফতি ইউসুফ ছাহেব হাটহাজারীতে যার বেশ আসা যাওয়া ছিল তাঁর নিকট সাইয়েদ মুহাম্মাদ মিয়া ছাহেবের প্রসিদ্ধ কিতাব ওলামায়ে হিন্দ কা শানদার মাযী-এর নাম শুনি। ধীরে ধীরে মুহাববাত পুরো জমে গেল। ১৯৫৩ সনে যখন দেওবন্দ যাই এবং কানযুদ দাকাইক জামাতে ভর্তি হই তখন সাইয়েদ সাহেবের সাথে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান অব্যাহত ছিল। তার সাথে কিতাবাদির আদান- প্রদান হতো। একদিন তিনি আমার দাওয়াতে আমার কামরায়ও গিয়েছিলেন। সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানী-এর দরসে নিকটে বসার জন্য সুপারিশ নিতে গিয়ে দুবার দিল্লিতে তাঁর সাথে সাক্ষাত করি। তিনি সুপারিশনামা লিখে দিলেন, যার সুবাদে আমি হযরত মাদানীর একদম বাহুর কাছে স্থান পেয়ে যাই। হযরত আমাকে তাঁর ঘর মাদানী মনযিল থেকে আসা যাওয়ার সময় হারিকেন বহনের খেদমত অর্পণ করেন।
এই সাইয়্যেদ সাহেবের কিতাব
صحابہ كرام كا عہد زريں
 একবার ঢাকার সদরঘাটে দেখলাম এবং ক্রয় করলাম। মন ভরে মুতালাআ করলাম। আল্লাহ তাঁকে লাখো রহমত দান করুন।
আরেক স্থানে লেখেন, মৃত্যুর এক সপ্তাহ পূর্বে আমি হযরত মাদানী রাহ.কে কিছু হাদিয়া দিয়ে তার ব্যবহারিত একটি জামার আবেদন করি, তখন তিনি তাঁর ঘরের বারান্দায়। আসাতেযায়ে কেরাম ও বেশ কজন ছাত্র সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হযরত কিছু বললেন না। ঠিক এক সপ্তাহ পর আমি পুনরায় আবেদন করি। হযরত বললেন,بهول گيا ভুলে গিয়েছি। এর এক সপ্তাহ পর হযরতের ওফাত হয়ে গেল। পরবর্তীতে হযরতের আহলিয়া আমাকে জামা দিলেন।
এ জামার কথা তার পরিবারের লোকজনও আমাকে বলেছেন। সেই জামাখানি কোথায় আছে তা আমার জানা নেই। শুধু জামা-ই নয় তাঁর নিকট হযরত মাদানীর একটি জায়নামায ও অজুর বদনাও ছিল। এ জিনিসদুটি এখনো সংরক্ষিত আছে। হযরত আসআদ মাদানী রাহ. তাঁর এখানে আসলে এগুলোর খোঁজ নিতেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী একজন আলেম আমাকে জানিয়েছেন।
হযরত মাদানী রাহ.-এর দাফনের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি লেখেন, হযরতকে মাওলানা আসআদ মাদানী, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা আব্দুর রশীদ ও মাওলানা রাশেদ কবরে রাখেন। আমি অধম কবরের পূর্ব পাশে দাঁড়ানো ছিলাম। সেখানে সাইয়েদ মুহাম্মাদ মিয়াঁ ছাহেব এবং মাওলানা হিফযুর রহমান সিউহারুভী রাহ.-ও ছিলেন। তাঁরা কেঁদে জার জার হয়ে যাচ্ছিলেন। স্বাভাবিক কথা, হযরত মাদানীর জানাযায় মানুষের ঢল নেমেছিল। বড় বড় উলামায়ে কেরামের উপস্থিতি ছিল। একজন সাধারণ ছাত্র তখন কবরের পাশে দাঁড়াতে পারা কত বড় হিম্মত ও ইশকের প্রমাণ বহন করে তা সহজেই অনুমেয়।
হযরত মাদানীর প্রতি তাঁর কেমন ভালবাসা ছিল তা আরেকটি ঘটনা থেকে বুঝা যায়। মাওলানা হুসাইন আহমদ নামে দারুল উলূম দেওবন্দে একজন উস্তায আছেন। তিনি একটি কিতাব লিখেছেন, নাম
مشكل تركيبوں كا حل مع قواعد ونكات
এ কিতাবের মলাটে লেখেন যার সারমর্ম এই -এই কিতাবের লেখকের নাম দেখে সর্ব প্রথম আমি ভয় পেয়ে যাই আমার উস্তাযের নামে তার নাম, অতপর আমি তা আবেগ নিয়ে পড়া শুরু করি এবং কিতাবটি আমার দিলে গেঁথে যায়। ফলে কিতাবটি সংগ্রহ করা ছাড়া আমার মন কোনোভাবেই মানছে না। তাই আমি কিতাবটি ক্রয় করলাম। কেবল লেখকের নামের মহববতের কারণে। হযরত মাদানী রাহ.-এর প্রতি কেমন ইশক ছিল তার চিঠিপত্র ইত্যাদি থেকেও স্পষ্ট বুঝা যায়। কোনো কিতাবে হযরতের নাম এলে, অথবা কোনো বিষয় এলে এর উপর কত টিকা যে লেখেন, কতভাবে লেখেন তা অবাক হওয়ার মতো। এগুলোর সামান্যও উল্লেখ করলে লেখা দীর্ঘ হয়ে যাবে। স্বপ্নযোগে হযরত মাদানীর সাক্ষাতের ঘটনাও বেশ কয়েকবার লিখেছেন, সেগুলো উদ্ধৃত করছি না।
হযরত মাদানী যে বছর ইনতেকাল করেন সে বছরের কিতাবগুলোর স্থানে স্থানে তিনি যে ব্যথা পেরেশানী বিভিন্ন পদ্যে-গদ্যে প্রকাশ করেছেন তা সত্যিই অবাক করার বিষয়। এসব দেখে ভাবি এতসব ব্যথা ও জ্বলন বহন করে কীভাবে একজন মানুষ গুমনাম হয়ে থাকতে পারে।
আমার সামনে হযরত মাদানী রাহ. সম্পর্কে তাঁর যে উক্তিগুলো আছে সত্যিই কলমকে তা থেকে সংবরণ করা মুশকিল। উস্তাযের প্রতি এমন ভালবাসা কীভাবে সৃষ্টি হয়! আসলে এটাই হল মূল পুঁজি এবং এখানেই মূল পার্থক্য। আজ আমরা ধীর গতিতে বস্ত্তবাদের দিকে ধাবিত হয়ে দিন দিন যান্ত্রিক মানুষে ও যান্ত্রিক ছাত্রে পরিণত হচ্ছি। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।
বিষয়টির শেষ প্রান্তে আমি তাঁর একটি উক্তি উদ্ধৃত করেই ইতি টানছি। এক কিতাবের গায়ে লেখেন
تمہارا ذكر تم سے كم نہيں وجہ سكون دل
তাঁর এ ভালবাসা শুধু হযরত মাদানী পর্যন্তই সীমিত ছিল না; বরং হযরতের পুরো পরিবারের সাথে ছিল। ছাত্র সময়ের হযরতের তিন পুত্রের বেশ কিছু চিঠিপত্র তার নিকট মাহফুজ আছে। পরিবার-সূত্রে জানলাম তাঁরা নাকি অনেক হাদিয়া তোহফা পাঠাতেন। আসআদ মাদানী রাহ. ও আরশাদ মাদানী তার বাড়ি ও মাদরাসায় এসেছেন-এটা আমারও জানা। দেওবন্দে পড়ার সময় যে কোনো প্রেক্ষাপটে হযরত আসআদ মাদানী ও হযরত আরশাদ মাদানী দুটি এক রুপির নোট তাকে দিয়েছিলেন। সেগুলো তিনি বরকত হিসেবে রেখে দিয়েছেন এবং আমৃত্যু হেফাজত করেছেন। সেগুলোও আমি নিজে দেখে এসেছি। তিনি তার পরিবারের সদস্যদের বলতেন, এঁরা আওলাদে রাসূল, এঁদের তাযীম করলে জান্নাত পাওয়া যাবে। পরিবারের সদস্যরাও আমাকে এ ধরনের অনেক আবেগ-বিশ্বাসের কথা শুনিয়েছেন।
হযরত মাদানী রাহ. ও তাঁর পরিবারের প্রতি তার এ আসক্তি হিন্দুস্থানেও জানা শোনা ছিল। প্রসিদ্ধ আলেম, সাহিত্যিক লেখক মাওলানা রশীদ আল ওহীদী-যিনি মাদানী রাহ.-এর ভাই সাইয়েদ আহমদ-এর পুত্র ওহীদ আহমদ-এর পুত্র; তিনি মরহুমের ঘনিষ্ঠ সহপাঠি ছিলেন। এক চিঠিতে লেখেন যার অর্থ হল, নিশ্চয় হযরত মাদানী, হযরত আসআদ মাদানী হযরত আরশাদ মাদানী বরং পুরো খান্দানে শায়খুল ইসলামের প্রতি আপনার ইশক আছে, তড়প আছে। বে-পানাহ মহববত আছে। এ মহববত আপনার জন্য আপনার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ সকলের জন্য আখেরাতের পুঁজি হবে। শায়খুল ইসলামের রূহ আপনার প্রতি খুশী হবে।
আমাদের প্রত্যাশা, আল্লাহ তাআলা মাওলানা রশীদ সাহেবের কথা কবুল করেছেন। উস্তায শাগরিদের সহাবস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
মরহুম আব্দুল মালেক হোসাইনী ছাহেব ১৯৩৩ সনে এক সম্ভ্রান্ত ভুঁইয়া পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মৌলভী সুজাআত আলী, দাদা জনাব আকবর ভুঁইয়া। গ্রাম সারপটি, পো: চিওড়া, থানা: চৌদ্দগ্রাম, জেলা: কুমিল্লা। পিতা একজন বিজ্ঞ আলেম, দক্ষ শিক্ষক, রাজনীতিবিদ ও প্রতাপশালী প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। ফেনী তথা দেশের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান দত্তসার মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতাদের মাঝে তিনিও একজন ছিলেন। গুনবতীর এলাকার পাশে তিনি একটি দীর্ঘ রাস্তা তৈরী করেন যা এখনো তাঁর নামে পরিচিত।
মরহুম আব্দুল মালেক ছাহেব গুনবতী জুনিয়র মাদরাসায় পড়াশোনা সমাপ্ত করার পর ১৯৪৫ সনে দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে ভর্তি হন। সেখানে ১৯৫১ সন পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। অতপর ১৯৫২ সনে দারুল উলূম দেওবন্দ ভর্তি হয়ে ১৯৫৭ সনে দাওরায়ে হাদীস ও ১৯৫৮ তে দাওরায়ে তাফসীর সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি ভাইদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসাম গমন করেন। ছাত্র হিসেবে তিনি মেধাবী ছিলেন। হাটহাজারীতে হযরত মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছাহেবের হাতে এবং দারুল উলূম দেওবন্দে হযরত মাদানীর হাতে প্রথম স্থান অধিকারী হওয়ার জন্য পুরস্কারও পেয়েছেন।
আসাম যাওয়ার পর সেখানে ১৯৬৭ সন পর্যন্ত থেকে যান। এ সময় তিনি আসামের কামরুপ জেলার বঙ্গিয়া শহরের বিভিন্ন কলেজে দ্বীনিয়াত বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। একই প্রদেশের গোপালপুর জেলার বালাজানী মাদরাসায় দুই বছর দাওরায়ে হাদীসের কিতাবাদি পড়ান। এসময় তিনি আসামের প্রত্যন্ত অঞ্চল দ্বারকুই গ্রামে দারুল উলূম দারকুচি নামে একটি মাদরাসাও প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৬৫ সনে যখন পাকভারত যুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি আসামের লোকদের সাথে মুয়াল্লিম হিসেবে হজ্বে গমন করেন। ১৯৬৭ সনে প্রথম স্বদেশে আগমন করেন। এসে প্রথমে টাঙ্গাইল জেলার বরুরিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল পদে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে ময়মনসিংহের জামেয়া আশরাফিয়াতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরই মধ্যে তিনি ফুলপুর থানার গোদারিয়া গ্রামে দুশতক জমি নিয়ে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখন দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত উত্তীর্ণ। ময়মনসিংহে দীর্ঘ দশ বছর কাটিয়েছেন অতপর নিজের এলাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তিনি তিনটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনটিই স্বগতিতে দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। এ তথ্যগুলি মরহুম নিজেই লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন।
এতগুলো মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা কম পরিশ্রমের কথা নয়। তাই তাকে সব সময় ব্যস্ত দেখা যেতো। বিভিন্ন মানুষের কাছে যেতে হতো। এতে তিনি মোটেই সংকোচ করতেন না। কখনো কেউ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করলে তার প্রতি ভ্রুক্ষেপও করতেন না। বলতেন, সবসময়ই আলেম উলামা এসবের শিকার হয়েছেন। চালচলন কথাবার্তায় নিজেকে পূর্ণ মিটিয়ে দিতেন। তিনি যে হযরত মাদানীর ছোহবতপ্রাপ্ত এবং একজন সাবেক মুহাদ্দিস এসব বোঝার কোনো উপায় ছিল না।
মাদরাসায় যতক্ষণ থাকতেন ততক্ষণ কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতেন। হয়ত পড়ানো, না হয় নিজস্ব মুতালাআ অথবা তেলাওয়াত কিংবা কিতাব বাঁধাই, গাছ লাগানো অথবা কোনো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা।
ছাত্রদেরকে খুব মহববত করতেন। বিশেষভাবে এতিমদেরকে। এমনকি  কোনো এতিম যদি তাঁর মাদরাসার ছাত্র না-ও হয় তবুও তার প্রতি থাকতো তাঁর সীমাহীন সহানুভূতি। এ বিষয়ে তাকে বিভিন্ন অভিযোগেরও সম্মুখীন হতে হয়েছে। মৃত্যুর পূর্বেও তিনি ওসিয়ত করে এতিমকে কিছু টাকা দিতে বলে গিয়েছেন।
তার সাংসারিক জীবন ছিল খুবই কষ্টের। তার মেয়ে এক লেখাতে এভাবে লিখেছেন, 
বাবা দ্বীনের প্রতি এতই অনুরাগী ছিলেন যে, সংসারের প্রতি বাবা ছিলেন উদাসীন। আমার মামা আমাদের সংসারটাকে কোনো রকম চালিয়ে নিতেন। অভাব অনটন ছিল নিত্য সঙ্গী। এই সংসারে মাকে কত কষ্ট, কত দুঃখ, কত যাতনা ভোগ করতে হয়েছে তার হিসেব নেই। কিন্তু এতকিছুর পরও বাবার প্রতি মায়ের অভিযোগ দেখিনি।
কত সময় যে উপোস ছিলাম তার হিসেব নেই। অনাহারে অর্ধাহারে জীবনের এতটুকু পথ পেরিয়ে এসেছি। তারপরও কখনো আমরা তিন ভাইবোন বাবা- মায়ের উপর অভিযোগ তুলিনি। কেন আমাদের এ বিচিত্র জীবন? বাবা তার নিজের সম্পদ এবং আমার মায়ের সম্পদ বিক্রি করেও দ্বীনের খেদমত করেছেন। সেজন্য মা কখনো আফসোস করেননি।
মরহুম স্বয়ং তাঁর জীবন বৃত্তান্তের শেষে লেখেন,
আমার জীবনে মেহনতই মেহনত, সুখের মুখ দেখি নাই। 
মৃত্যুর সময় তিনি এক ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে যান। স্ত্রী ২০০৪ সনে দীর্ঘ ৭বছর প্যারালাইসিসে ভুগে ইনতেকাল করেন। ১৯৭১ সনে তার প্রথম সন্তান আব্দুল্লাহর জন্মের সপ্তাহ খানেক পর তাঁকে যুদ্ধাপরাধীরঅপবাদ দিয়ে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁর বুকে গুলি করবে -এমন সময় তাঁকে শেষ ইচ্ছার কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ৮ বছর পর একটা পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছে। তার চেহারা পর্যন্ত দেখিনি। আমার সন্তানটা  এতীম হয়ে যাবে। মানুষ ও দেশের বিরুদ্ধে আমি কিছুই করিনি। আমাকে দেশের  সেবা করার সুযোগ দিন। তখন তারা তাকে ছেড়ে দেয়।
কিছুদিন পূর্বে তাঁর একমাত্র ছেলের ফুসফুসে ক্যন্সার ধরা পড়ে। এতে তিনি খুব ভেঙ্গে পড়েন। ৪ ডিসেম্বর তার জন্য খতমে ইউনুস-এর এন্তেযাম করেন এবং ৭ ডিসেম্বর রাত সাড়ে বারোটায় ইহকাল ত্যাগ করেন। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পূর্বে ওসিয়ত নামা লেখেন। তাতে কয়েকজন আলেমকে নিজ আলমারী হতে কিছু হাদিয়া দিতে বলেন এবং একজন এতীমকে নিজের বেতনের সব টাকা দিতে বললেন। শেষে লেখেন এটা বোধ হয় আমার শেষ লেখা, আমার অপরাধকে মাফ করবেন। কত ছাত্রকে মেরেছি গাল দিয়েছি খোদার ওয়াস্তে মাফ করবেন অতপর কে জানাযা পড়াবেন তার নাম লেখেন। নিজের নোটবুক খুলে ঘনিষ্ঠদের নিকট ফোন করে দুআ ও ক্ষমা চেয়েছেন। অতপর উপস্থিত সকলকে নিয়ে দুআ করে কালিমা পড়তে পড়তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার জীবনের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত আরো অনেক দিক আছে যা বাস্তবেই ঈর্ষণীয় ও অনুসরণীয়। সময় ও স্থানের আয়তন চিন্তায় সেদিকে যাওয়া যাচ্ছে না। আল্লাহ আমাদেরকে সাদেকীন ও ছালেহীনের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।
পাঠকদের নিকট তাঁর পরিবারিক শান্তি-স্বাচ্ছন্দ ও বিশেষভাবে অসুস্থ ছেলেটির জন্য দুআর অনুরোধ রইল।

প্রখ্যাত আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব আল্লামা যুবাইর আহমদ চাটগামী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী

প্রখ্যাত আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব আল্লামা যুবাইর আহমদ চাটগামী পরপারে চলে গেলেন - মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী
উপমহাদেশের বিখ্যাত আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব, শায়খুল হাদীস কুতুবে আলম হযরত আল্লামা হাফেজ মোহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলবী সিদ্দীকি মুহাজেরে মদনী (রহ.) এর শাগরিদ, খাছ খাদেম ও বিশিষ্ট খলীফা পীরে কামেল, হাদীয়ে জামান, মুরশিদে বরহক হযরত আল্লামা মোহাম্মদ যুবাইর আহমদ চটাগামী গত ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইংরেজি শুক্রবার সকাল ৮ টায় রাজধানী সাভার আশুলিয়ার দেলমাস্থ খানেকায়ে যাকারিয়া ও মুযাহেরুল উলুম মাদ্রাসায় ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বাদে জুমা তাঁর নামাযে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন হুজুরের ছাহেবজাদা মাওলানা ওবাইদুল্লাহ সাহেব। অতঃপর মাদ্রাসা মসজিদের পার্শ্বে তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি ১স্ত্রী, ৪ ছেলে রেখে গেছেন। দেশ বিদেশে তাঁর বহুসংখ্যক ভক্ত, মুরিদ, শাগরিদ এবং কিছুসংখ্যক খলিফা রয়েছেন।
জন্ম ও শিক্ষালাভ: তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার দক্ষিণ চেচুরিয়া বৈলছড়ি খন্দকার পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে বাঁশখালী হাইস্কুল ও সরকারী মাদ্রাসায় অতঃপর কৈয়গ্রাম হেমায়াতুল ইসলাম মাদ্রাসায় প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা লাভ করেন। এরপরে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের অন্যতম দ্বীনি বিদ্যাপিঠ সাহারানপুর মোজাহেরুল উলুম মাদ্রাসায় গমন করেন। ১৯৪৮/৪৯ শিক্ষাবর্ষে দাওরায়ে হাদীস সমাপন করে সনদ লাভ করেন। তাঁর হাদীসের প্রধান উস্তাদ ও পীর ছিলেন শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)। তিনি দীর্ঘকাল শায়েখ যাকারিয়া (রহ.) এর খাছ খাদেম ছিলেন। শায়েখ (রহ.) এর প্রথমযুগের খলীফাগণের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এবং তিনি নয় নম্বর খলীফা ছিলেন।
শায়েখ যাকারিয়া (রহ.) এর নির্দেশে তিনি এক বছর তাবলীগে সাল লাগান। তিনিই প্রথম আলেম যিনি তাবলীগে ১ বছর সাল লাগান। আরব-আজম বহু দেশে তিনি তাবলীগ জামাত নিয়ে সফর করেন। ক্রমান্বয়ে তিনি ১২ বছর তাবলীগ জামাতে সালে সময় লাগান। পাকিস্তানের রায়ভেন্ড, বাংলাদেশের ঢাকা কাকরাইল এবং চট্টগ্রাম লাভলেইনে তাবলীগি মারকাজ প্রতিষ্ঠা ও মোজাহাদাকারী প্রথমযুগের মুরুব্বীগণের অন্যতম ছিলেন তিনি। কাকরাইল ও লাভলেইন তাবলীগি মারকাজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিরাট অবদান রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরস্থ জামেয়া মাদানিয়া কাশেফুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায়ও তাঁর রয়েছে বিরাট অবদান।
একজন পৃথিবী বিখ্যাত পীরে কামেল হওয়া সত্ত্বেও তিনি খুবই সরল জীবন যাপন করতেন। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি বাসে, সি এন জিতে সফর করতেন। সর্বদা নিজেকে আত্নগোপন করে রাখতেন। নিজের প্রচার-প্রসারে অগ্রণী হতেন না। সবসময় জিকির-আজকার, রিয়াজত-মুজাহাদা ও তাবলীগি কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকতেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো প্রায় ১০০ বছর। আমাদের গবেষণামতে বর্তমানে তিনিই ছিলেন আকাবির-বুযুর্গগণের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ও প্রবীণ বুযুর্গ আলেম। আকাবির এর ইলম-আমল, তাক্বওয়া-তাহারাত ও দাওয়াত-তাবলীগের প্রবীণ আমানতদার ছিলেন তিনি।
হযরতজ্বী মাওলানা ইউসুফ (রহ.) এর দীর্ঘ সংস্পর্শ তিনি লাভ করেছিলেন। শায়খুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.), হযরত মাওলানে আবদুল কাদের রায়পুরী (রহ.), মুফতীয়ে আজম মুফতী ফয়জুল্লাহ (রহ.), পটিয়ার বড় মুফতী শাহ আজিজুল হক (রহ.) প্রমুখ বুযুর্গগণকে নিকট থেকে তিনি দেখেছালেন। তাঁদের সান্নিধ্য ও স্নেহ-মমতা লাভ করেছিলেন। শায়খুল হাদীস যাকারিয়া (রহ.) এর খাছ খাদেম হবার কারণে পৃথিবী বিখ্যাত বহু আলেম, পীর-মাশায়েখগণের সাথে তাঁর পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে উঠে। জানা যায় যে, পবিত্র হাতিমে কা'বায় শায়খুল হাদীস (রহ.) এর সাথে সফরে থাকাকালে হযরত খিজির আলাইহিস সালামের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। মাঝে মাঝে তাঁর সাথে সাক্ষাতও হতো। আমাকে ( প্রবন্ধকার) একবার তিনি ঢাকায় বিশ্ব ইজতেমার উলামাগণের খাছ বয়ানের পর বলেছিলেন-"হযরত খিজির আলাইহিস সালামও এই ইজতেমায় এসেছেন।"
তাঁর অনেক কাশফ কারামতের ঘটনাও রয়েছে। বিশ্বের বড় বড় ওলী-বুযুর্গদের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তিনি এগুলো কাউকে বুঝতে দিতেন না। সাধারণত: এসব ব্যাপারে কারো সাথে কথাও বলতেন না। কিন্তু যারা তাঁর সাথে চলাফেরা করত তাঁরা কিছু বিষয় বুঝে নিতেন। ঘটনাক্রমে মাঝে মাঝে দু এক কথা বলতেন। চট্টগ্রামে মাদানী একাডেমীর মাসিক ইজতেমায় তিনি কয়েকবার এসে সংক্ষিপ্ত বয়ানও করেছিলেন। ব্যাক্তিগতভাবে আগ্রহীদের দিক-নির্দেশনা দিতেন বেশী। প্রতিবছর রমজান মাসে মাসব্যাপী এতেকাফে থাকতেন। সাথে থাকতেন সালেকীনরা। সালেকীনদের এসলাহ করতেন। প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করতেন।
হযরত মাওলানা যুবাইর চাটগামী (রহ.) ছিলেন প্রাচীন পীর বুযুর্গের নমুনা। নিজের যশ, খ্যাতি, সম্মান, অর্থ, আরাম-আয়েশের পরোয়া করতেন না। সবর ও শোকর ছিল জীবনের পাথেয়। প্রায় শতাধিক বছর বয়সেও কষ্ট পরিশ্রম করে দ্বীন প্রচার করতেন। একজন খাঁটি দায়ী ও মুবাল্লিগের গুণ ছিল তাঁর মধ্যে। তাঁর সংসর্গ প্রভাব বিস্তার করত অন্যের মাঝে। তিনি সহজে কাউকে মুরিদ করতে চাইতেন না। পরিপূর্ণ আগ্রহ তৈরী হলে তবেই মুরিদ করতেন। অতঃপর আমল-আখলাক তৈরী করতে অনুপ্রাণিত করতেন। হযরত শায়খুল হাদীস (রহ.) এর তাসাওউফ এর বই কিতাব অন্যান্য কিতাবাদী পড়তে বলতেন। মাসিক ইসলাহী ইজতিমা ও শবগুজারির আসলে সেখানে জরুরী হেদায়াত ও পরামর্শ প্রদান করতেন। শরীয়ত ও সুন্নাত মোতাবেক চলতে হেদায়াত দিতেন। তাবলীগের মেহনত এবং দাওয়াত, তালীম ও তাজকিয়ার কাজ একসাথে চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিতেন। দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গতার ব্যাপারে তিনি খুবই সচেতন ছিলেন। কোন প্রকার সংকীর্ণতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। সত্য কথা বলতে তিনি কারো পরোয়া করতেন না। দ্বীনের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সঠিক কথা বলতেন। কখনো কখনো কোন তিক্ত কথা কারো অপছন্দ হলেও তার কোন পরোয়া করতেন না। আলেম সমাজের মর্যাদাকে উর্ধ্বে স্থান দিতেন।
ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব সুয়াবিল তালিমুল ইসলাম বালিকা মাদ্রাসা ও খানেকাহে এমদাদিয়া এর মাহফিলে তিনি কয়েকবার তাশরীফ এনেছিলেন। সংক্ষিপ্ত বয়ান ও দোয়া করেছিলেন। আমাদের সান্নিধ্য প্রদান করে ধন্য করেছিলেন।
হযরত মাওলানা যুবাইর আহমদ সাহেব (রহ.) এর খলীফাগণের তালিকা:
১. হযরত মাওলানা আবদুল মাবুদ সাহেব (রহ.), হ্নীলা, কক্সবাজার। ২. মাওলানা কাজী জহুরুল ইসলাম সাহেব, খান বাহাদুর বাজার, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম। ৩. মাওলানা আবুল কাশেম শরীফ (গোপালগঞ্জী), শনিরআখড়া, রায়েরবাজার, ঢাকা। ৪. হযরত মাওলানা গোলাম কাদের সাহেব, (সাতকানিয়ার হুজুর) সাবেক উস্তাদ, মেখল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম। ৫. হযরত মাওলানা এহসান সাহেব, পোকখালী ঈদগাহ, কক্সবাজার। ৬. মাওলানা আবদুল হামিদ সাহেব, (খুলনা) মুহাদ্দিস, জামেয়া রহমানিয়া মুহাম্মদপুর, ঢাকা। ৭. মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ শাহনগরী সাহেব, মুহতামিম-শাহনগর দারুল উলুম মাদ্রাসা, ফটিকছড়ি। ৮. মাওলানা মোহাম্মদ এমদাদ সাহেব, পোকখালী ঈদগাহ, কক্সবাজার। ৯. মাওলানা হাফেজ নুরুল হুদা সাহেব, পোকখালী ঈদগাহ, কক্সবাজার। ১০. হাফেজ মাওলানা কাসেম সাহেব, ফাজেলে দারুল উলুম দেওবন্দ, চকরিয়া, কক্সবাজার। ১১. মাওলানা মোহাম্মদ নোমান সাহেব, পিতা-মাওলানা মুখতার আহমদ সাহেব, পোকখালী ঈদগাহ কক্সবাজার। ১২. অধ্যাপক মোহাম্মদ যায়েদ সাহেব, ঢাকা। ১৩. হাজী মোহাম্মদ ইসহাক সাহেব, ঢাকা। ১৪. মাওলানা আল আমীন সাহেব, ঢাকা। ১৫. জনাব মোহাম্মদ শফিক, খুলনা ১৬. জনাব মোহাম্মদ মুনির, বরিশাল ১৭. সাহেবজাদা মাওলানা ওবাইদুল্লাহ সাহেব, খানেকাহে যাকারিয়া ও মাদ্রাসায়ে মুজাহেরুল উলুম, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা। ১৮. মুফতী যুবায়ের আহমদ সাহেব, মিরপুর, ঢাকা। ১৯. মুফতী সালিম বর্মী, মালেশিয়া। ২০. মাওলানা ওসমান, মালেশিয়া। ২১. মাওলানা জাকওয়াল, মালেশিয়া। ২২. মাওলানা জামাল উদ্দিন, মালেশিয়া। ২৩. মাওলানা অলি আহমদ, (মহিষখালী) মালেশিয়া। ২৪. মাওলানা হোসাইন বিন আবদুল কাদের বর্মী, মালেশিয়া। ২৫. মাওলানা মোহাম্মদ ইদ্রিস বর্মী, মালেশিয়া।
লেখক: প্রবীণ ইসলামি চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত জীবনী লেখক ও গবেষক, সহ-সভাপতি- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, সম্পাদক- সাপ্তাহিক জমিয়ত, প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম: পূর্ব সুয়াবিল তালিমুল ইসলাম বালিকা মাদ্রাসা ও খানেকাহে এমদাদিয়া, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম। মোবাইল:-০১৮১৭-৫৩২৭০৯

হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-হযরত মাওলানা মুফতি তকী উছমানী

গত (জানুয়ারী ২০১৭) মাস এ উপমহাদেশের জন্য বরং সমগ্র ইসলামী বিশ্বের দ্বীনী পরিম-লের লোকদের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ- শাইখুলকুল (সকলের মুরুব্বী) হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেবের ওফাতের সংবাদ। হযরতের ইন্তেকালের কারণে উম্মতে মুসলিমাহ্র এমন সকল ব্যক্তির অন্তর দুঃখ ও বেদনায় ডুবে গেছেযে ব্যক্তিই হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহির সাথে কোন না কোন সম্পর্কে সম্পৃক্ত ছিলেন।
হযরত রাহমাতুল্লাহি আলাইহির অস্তিত্ব বর্তমান সময়ে উপমহাদেশের উলামায়ে কেরাম ও দ্বীনী পরিম-লের জন্য বিশেষভাবে দ্বীনী মাদরাসাসমূহের জন্য আল্লাহপাকের রহমতের বিশাল সামিয়ানা ছিল। যাঁর কথা কল্পনা করলেই এ ফিতনার যুগে অন্তর সান্ত¡না লাভ করত। এ মাসেই (জানুয়ারী ২০১৭) আমরা মহান এ আশ্রয়স্থল হারিয়ে ফেললাম।
اِنَّا لِلّٰهِ وَ اِنَّا اِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
এ পৃথিবীতে কেউই চিরদিন থাকার জন্য আসে না। এখানে আগত সকলেরই মৃত্যুর মুখোমুখী হতে হয়। কিন্তু কোনো কোনো মহান ব্যক্তিত্বের বিদায়ের বেদনা কেবল তাঁর পরিবার-পরিজন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে নাবরং তাঁদের বিদায়ে সমগ্র পৃথিবী ব্যথিত হয়। শোকাহত হয়।
وما كان قيس هلكه هلك واحد
ولكنه بنيان قوم تهدما
তাঁর মৃত্যু তো কেবল ব্যক্তি মাত্রের মৃত্যু নয়।
তার মাধ্যমে তো কওমের প্রাচীরই ধ্বসে গেল।
আমাদের শ্রদ্ধেয় উস্তায হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এমন ব্যক্তিত্বদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আমি হযরত রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে দাফনের সময় দেখেছি বড় বড় উলামায়ে কেরাম একে অন্যকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। একে অন্যের প্রতি শোক প্রকাশ করছেন। এমনটিই হওয়ার কথা। হযরত এই পৃথিবীতে এ অধমের সর্বশেষ জীবিত উস্তায ছিলেন। আমার অন্য সকল উস্তায হযরতের পূর্বেই দুনিয়া ত্যাগ করেছিলেন। কারো কোনো মুরুব্বী বা উস্তাযের ছায়া মাথার উপর থাকার ফলে যে মহাপ্রশান্তি ও স্বস্তি লাভ হতে থাকেহযরতের ওফাতের কারণে আজ আমার সেই প্রশান্তি ও স্বস্তির পরিসমাপ্তি ঘটল।
আল্লাহ পাক হযরত রাহমাতুল্লাহি আলাইহির দ্বারা অনেক বড় বড় কাজ নিয়েছেন। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ারূপে হযরতের বিশাল কীর্তি সকলের সামনে বিদ্যমানযা আলহামদু লিল্লাহ্! কালের ফিতনা ও ষড়যন্ত্রের ঘূর্ণাবর্তের মধ্যেও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থেকে নিজ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে এক বিশাল মহিরূহ আকারে আমাদের সম্মুখে বিদ্যমান আছে। যার ছায়ায় সকলে মিলে বসে স্বস্তি ও প্রশান্তি লাভ করে থাকি।
 এক্ষেত্রে হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর ব্যক্তিত্বতাঁর কীর্তিসমূহ ও অবদানের পূর্ণ বিবরণ সংক্ষিপ্ত কোনো লেখায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে আশা করি যেএ বিষয়ে প্রমাণসিদ্ধবিস্তারিত কোনো লেখা অচীরেই এমন কোন মহান ব্যক্তিত্বের কলম থেকে আসবে ইনশাআল্লাহযিনি এর যথাযথ হক আদায় করে লেখার যোগ্যতা রাখেন।
এখন অবশ্য আমার কিছু বিক্ষিপ্ত স্মৃতিকথা লিখতে আগ্রহ হচ্ছে। নিম্নে এ সম্পর্কিত সামান্য কিছু কথা লেখার সৌভাগ্য অর্জন করছি।
আমি আমার শ্রদ্ধেয় উস্তায হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের পবিত্র নাম সর্বপ্রথম ১৩৭৬ হিজরী (মোতাবেক ১৯৫৭ ঈসায়ী) সনে (তখন আমার বয়স ছিল চৌদ্দ বছর) আমার ভগ্নিপতি ও দারুল উলূম করাচীর সাবেক নাযেম হযরত মাওলানা নূর আহমাদ ছাহেব রাহ.-এর মুখ থেকে ঐ সময় শুনেছিযখন আমাদের দারুল উলূম (পুরাতন করাচীর) নানকওরা নামক এলাকা হতে (করাচী শহরের পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্তেসে সময় শহর এলাকা হতে অনেক দূরে) শরাফীঘোট নামক স্থানের কাছাকাছি নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হচ্ছিল। ঘটনাক্রমে ঐ বছরই হযরত মাওলানা ইউসুফ বান্নূরী রাহ. মাদরাসা আরাবিয়া ইসলামিয়া নামে করাচীর নিউ টাউন জামে মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় নতুন একটি মাদরাসা স্থাপন করেন। এ সময় আমাদের বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য সুযোগ্য উস্তায (যেমন হযরত মাওলানা মুফতী ওলী হাসান রাহ.হযরত মাওলানা ফযল মুহাম্মাদ ছাহেব রাহ.) শহরের বাহিরে (বেশ দূরে অবস্থিত) দারুল উলূমের নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হওয়ায় সেখানে গিয়ে খেদমত করাটা নিজেদের জন্য অসুবিধাজনক মনে করছিলেন এবং হযরত বান্নূরী রাহ.-এর আহ্বানে নিউ টাউন মাদরাসায় যোগদান করতে মনস্থ করেছিলেন। এ সকল মুরুব্বী ও উচ্চপর্যায়ের উস্তাযের চলে যাওয়ার কারণে দারুল উলূমের উচ্চশ্রেণীতে শিক্ষক সংকট দেখা দেয়ার সম্ভাবনা ছিল। যদিও আব্বাজান রাহ.-এর সব সময়ের নীতি এটাই ছিল যেকোনো উস্তাযকে অন্য কোনো মাদরাসায় খেদমতরত থাকা অবস্থায় সেখানের দায়িত্ব ছেড়ে নিজের প্রতিষ্ঠানে আসার দাওয়াত দিতেন না। তিনি এ প্রসঙ্গে বলতেন, “এক মাদরাসাকে বিরাণ করে অন্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই উচিত নয়। কিন্তু এ সময়ে হযরত মাওলানা নূর আহমাদ ছাহেব রাহ. জানতে পারলেন যেকয়েকজন মুরুব্বী ও উচ্চ পর্যায়ের উস্তায নিজেরাই পুরানো জায়গা ছেড়ে অন্যত্র যেতে চাচ্ছেন। কাজেই তাদেরকে দারুল উলূমে আসার দাওয়াত দিতে কোনো ক্ষতি নেই। এ সময় তিনি যে সকল উস্তাযকে দারুল উলূমে এসে শিক্ষকতা করার জন্য দাওয়াত দিলেনতাদের মধ্যে হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ ছাহেব রাহ.হযরত মাওলানা আকবার আলী ছাহেব রাহ.হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন হযরত মাওলানা নূর আহমাদ ছাহেব একথাও বলেছিলেন যেহযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেব থানাভবনের নিকটবর্তী এলাকা জালালাবাদের লোক। তিনি (সিন্দের) ট্যান্ডোল্লাইয়ার মাদরাসা থেকে ইস্তফা দিয়ে দারুল উলূম আসবেন।
১৩৭৬ হিজরীর শাওয়াল মাসে দারুল উলূমের নতুন ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হচ্ছিল। সে সময় দারুল উলূমের এ জায়গা জনবসতিহীন প্রায় মরুঅঞ্চল ছিল। পশ্চিম দিকে সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত বালুর ছোট ছোট টিলা ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। দক্ষিণ দিকে বর্তমান কোরঙ্গীর এলাকা বন-জঙ্গল ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ ক্ষেত্র ছিলো। পূর্ব দিকে বর্তমান লান্ডি এলাকা পর্যন্ত ফসলিজমি ও বাগান ছিল। কেবলমাত্র পূর্ব-উত্তর প্রান্তে শরাফীঘোট নামক বসতি এলাকা ছিল।
যে সকল নতুন উস্তাযকে শিক্ষাবর্ষের শুরুতে এখানে শিক্ষকতার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল তাদের বসবাসের জন্য দারুল উলূমের ভেতরেই ছোট ছোট কিছু কাঁচা এবং কিছু পাকা বাড়ী নির্মাণ করা হয়েছিল। এ সকল মহান ব্যক্তিবর্গ এই বিরানভূমিতে থেকেই দারুল উলূমের শিক্ষকতার খেদমত আরম্ভ করলেন।
এ বছর আমি ও আমার বড় ভাই হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ রফী উসমানী ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম হেদায়া আখেরাইন-এর জামাতে পড়ছিলাম। আমাদের যে সকল কিতাব পড়ানো হচ্ছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল হেদায়া আখেরাইনতাওযীহমায়বুযীমুল্লা হাসানসিরাজী ও তাসরীহ। হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর সাথে এ শিক্ষা বর্ষের প্রারম্ভে সর্বপ্রথম সাক্ষাৎ হয়। হযরত রাহ. সে সময় একেবারে যুবক ছিলেন। সুন্দর ও বিকশিত মুখ-ম-ল। আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি। সাদাসিধে আড়ম্বরহীন জীবন-যাপন পদ্ধতি। এ সকল গুণাবলী খুব দ্রুতই হযরত রাহ.-এর সাথে আমাদের একটি প্রীতিকর সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিল। এ বছর আমাদের দুটি কিতাব হযরতের নিকট ছিল। একটি হল, ‘মায়বুযীআর অপরটি হলো, ‘হেদায়া আখেরাইন
উস্তাযুল আসাতিযা হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেব রাহ. সে সময় টগবগে তরুণ ছিলেন। তিনি শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হোসাইন আহমাদ মাদানী রাহ.-এর শিষ্য ও ছাত্র ছিলেন। আমার দ্বিতীয় শায়েখ মাসীহুল্লাহ খান ছাহেব রাহ.-এর মাদরাসা মিফতাহুল উলূম জালালাবাদে দীর্ঘদিন শিক্ষাদানের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছায় পাকিস্তান তাশরীফ এনেছিলেন।
যদিও ঐ বছর আমাদের দুটি সবক (১. হেদায়া আখেরাইন২. মায়বুযী) হযরত রাহ.-এর দায়িত্বে ছিল। কিন্তু এখন যতটুকু মনে পড়ছেপ্রথম দিন সকালে সকল জামাতের ছাত্রদের একত্র করে শিক্ষাবর্ষের প্রথম সবক দান অনুষ্ঠানের পর আর সময় ছিল না। আর বিকালে হযরত রাহ.-এর নিকট আমাদের মায়বুযীর র্দস ছিল। এজন্য হযরত রাহ.-এর নিকট জীবনের প্রথম সবক মায়বুযী পড়েছিলাম। আমার যেহেতু স্বভাবগতভাবেই মানতেক ও ফালসাফাহ (দর্শনশাস্ত্র)-এর প্রতি তেমন আকর্ষণ ছিল নাঠেকায় পড়েই (নেসাবভুক্ত) মানতেকের কিতাব পড়তাম। অবশ্য দর্শনের এটাই প্রথম এবং এটাই শেষ কিতাব ছিল। কিন্তু হযরত রাহ.-এর প্রতি আল্লাহ পাকের বিশেষ অনুগ্রহ ছিল। তিনি প্রথম দিন প্রথম সবকই আমাদেরকে এমন আকর্ষণীয় আঙ্গিকে পড়ালেন যেকিতাব এবং উস্তায উভয়ের সাথে এমন গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হল যেআমি বিগত বছরগুলোর বিপরীত পূর্ণ বছর মায়বুযী কঠোর পরিশ্রম করে অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনাসহ পড়তে থাকলাম। হযরত রাহ.-এর নিকট আমাদের দ্বিতীয় সবক ছিল হেদায়া আখেরাইন। সে কিতাব মাশাআল্লাহ হযরত খুবই আকর্ষণীয় আঙ্গিকে পড়ালেন। হযরত রাহ. এ কিতাব দারুল উলূম দেওবন্দে শাইখুল আদব ওয়াল ফিক্হ হযরত মাওলানা ইযায আলী আহ.-এর নিকট পড়েছিলেন। এজন্য তিনি অত্যন্ত আগ্রহভরে নিজ শায়েখের অনুসরণ করতেন। তিনি সকালের প্রথম ঘণ্টায় এ কিতাব পড়ানোর জন্য সর্বদা সময় মতো উপস্থিত হতেন। লাগাতার দুই ঘণ্টা পড়াতেন। এই দীর্ঘ সময়ে স্বীয় হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ও আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গিতে আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ বানিয়ে রাখতেন। এত লম্বা সময়েও আমরা কখনো ক্লান্তি অনুভব করিনি।
পরবর্তী বছর আমরা মওকুফ আলাইহি (মেশকাত শরীফ)-এর ছাত্র ছিলাম। এ বছর আমাদের কোনো সবক হযরত রাহ.-এর নিকট ছিল না। কিন্তু গত বছর হযরত রাহ.-এর সাথে যে বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিলএ বছর সবক না থাকা সত্ত্বেও তার ভিত্তিতে তাঁর সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক পূর্ববৎ বহাল ছিল। (আমাদের আরেক উস্তায) হযরত মাওলানা শামছুল হক ছাহেব রাহ. হযরতের বিশেষ ও অন্তরঙ্গ শিষ্য ছিলেন। তিনি যদিও হযরতের ছাত্র ছিলেন কিন্তু হযরত রাহ. তাঁর সাথে বন্ধুসুলভ আন্তরিক আচরণ করতেন। আর হযরত মাওলানা শামছুল হক ছাহেব রাহ.-এর সাথে আমাদের সম্পর্কও অনেকটা ঐ ধাঁচেরই ছিল। এজন্য এ দুই বুযুর্গের হৃদ্যতাপূর্ণ সোহবত দ্বারা আমরা সর্বদা সিক্ত হতে থাকতাম। এর পরের বছর যখন আমরা দাওরায়ে হাদীসে পৌঁছলামএ বছরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিতাব জামে তিরমিযী পড়ানোর দায়িত্ব হযরত রাহ.-এর নিকট ছিল। হযরত রাহ. আমাদেরকে এ সবক অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাহকীকসহ পড়িয়েছেন। হযরত রাহ. এ কিতাব পড়ানোর সময় ফিক্হ ও উলূমে হাদীসের আলোচনা বিস্তারিতভাবে করতেন। ছাত্রদের উপকারার্থে বক্তব্য লেখাতেন। লেখানোর কারণে যেহেতু কিছুটা বিরতি পাওয়া যেতএজন্য আমি হযরত রাহ-এর পাঠ আরবীতে লিখতাম। হযরতের এ সকল দরসী তাকরীর এতই সাজানো-গোছানো হত যেসংশ্লিষ্ট বিষয়ের সকল দিক সুবিন্যস্তরূপে একত্রিত হয়ে যেত। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যে সকল কথা হাদীস শরীফের বিভিন্ন ভাষ্যগ্রন্থে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পাওয়া যায়সে সকল আলোচনা হযরতের দরসে স্বাভাবিক বিন্যাসে সাজানো-গোছানো অবস্থায় পাওয়া যেত। হযরতের সে সকল দরসী তাকরীরের লিখিত কপি এখনো আমার নিকট সংরক্ষিত আছে। সে সময় তো হযরত রাহ.-এর এ সকল সুবিন্যস্ত আলোচনার মূল্য ঐভাবে অনুভূত হয়নিকিন্তু পরবর্তীতে যখন হাদীস শরীফের বিভিন্ন ভাষ্যগ্রন্থ অধ্যয়ন করার সুযোগ আসলো তখন বুঝলাম হযরত রাহ. এ সকল বিক্ষিপ্ত আলোচনাকে কত কষ্ট করে একত্রিত করে সুবিন্যস্তরূপে আমাদেরকে লিখিয়েছেন। হযরতের মেহনতের ফলে এ সকল সাজানো-গোছানো বক্তব্য আয়ত্ব করা ও স্মরণ রাখা আমাদের জন্য কতই না সহজ হয়ে গিয়েছিল।
এটাও জানা কথা যেছাত্রদেরকে বক্তব্য লিখিয়ে দিতে গিয়ে সময় অনেক লেগে যেত। ফলে সবকের গতিও মন্থর ছিল। বছর প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ কিতাব মাত্র আরকানে আরবাআ (অর্থাৎকিতাবুস সালাতকিতাবুস সাওমকিতাবুয যাকাত ও কিতাবুল হজ্ব) পর্যন্ত পৌঁছলো। অপরদিকে তিরমিযী শরীফের ২য় খণ্ড হযরত রাহ. লেখানো ছাড়াই পড়াতেন। ফলে সেটা অনেক বেশী পড়ানো হয়েছিল। বছর যখন প্রায় শেষ হতে চললতখন হযরত রাহ. বললেনএখন সামনে যে সকল হাদীস আসবে তার অধিকাংশই তো বুখারী শরীফনয় তো মুসলিম শরীফ বা আবু দাউদ শরীফ ইত্যাদি কিতাবে চলে গেছে। কাজেই বাকী অংশ রেওয়ায়াতান (অর্থাৎ শুধু হাদীসের শব্দ) পড়ানো হলেও যথেষ্ট হবে। এজন্য তিনি দরসের বাহিরেও (রাতে) অতিরিক্ত সময় দিয়ে কিতাব শেষ করার পদক্ষেপ নিলেন। এভাবেও যখন প্রায় একশত পৃষ্ঠা অবশিষ্ট থাকলোতখন তিনি একদিন পুরো রাত সবক পড়ালেন। সে রাতের জন্য হযরত স্টোভ (চুলা) দরসগাহে এনে বিরতি দিয়ে দিয়ে চা বানিয়ে নিজেও পান করতে থাকলেন এবং ছাত্রদেরকেও পান করাতে লাগলেন। এভাবে সম্ভবত এক বা দুরাতেই কিতাব সমাপ্ত করলেন।
আমরা আমাদের এ মহান উস্তাযের পাঠদানের আগ্রহ-উদ্দীপনা সে সময় দারুল উলূমে (করাচী) খুব প্রত্যক্ষ করেছি। সে সময় এটাও অনুভব করেছি যেহযরত রাহ. কেবল আগ্রহভরে পড়ান তা-ই নয় বরং উস্তায গড়ার ব্যাপারেও হযরত রাহ.-এর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। হযরত রাহ.-এর বিশেষ এই আগ্রহের দিকের বাস্তব রূপ প্রথম তো জামেআ ফারুকিয়ার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে যেদেখতে দেখতে অতি অল্প সময়ের মধ্যে এই দ্বীনী শিক্ষালয় দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে একটি জায়গা করে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত হযরত রাহ.-এর সার্বিক ও কল্যাণকর এই বিশেষ যোগ্যতার বিকাশ পূর্ণ মাত্রায় তখন ঘটেছেযখন তাঁকে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সর্বোচ্চ পদে সমাসীন করা হয়। বেফাকুল মাদারিস যদিও অনেক পূর্ব হতে প্রতিষ্ঠিত ছিলবড় বড় উলামায়ে কেরাম ও বুযুর্গানে দ্বীন এ প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত রাখার এবং সচল রাখার জন্য নিজেদের সামর্থ্য ব্যয় করেছেনকিন্তু এ ক্ষেত্রে যে বিশাল ও গভীর প্রভাব অর্জিত হয়েছে তা নির্দ্বিধায় ও নিঃসঙ্কোচে বলা যায়সেটা হযরত মাওলানা সালীমুল্লাহ খান ছাহেব রাহ.-এর অক্লান্ত পরিশ্রমঅব্যাহত মেহনত ও চেষ্টামাদরাসা ও দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের মেযায-রুচি-প্রকৃতির বাস্তবসম্মত অনুধাবনসংশোধনের বিপুল আগ্রহ ও অব্যাহত চেষ্টারই ফল।
হযরত রাহ.-এর অসীম সাহসিকতা ও হিম্মত আমাদের মতো লোকদের জন্য সর্বদাই ঈর্ষণীয় বিষয় ছিল। হযরত রাহ. যে মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কাজে নেমে পড়তেনসেক্ষেত্রে কোনো প্রকার কষ্টও পরিশ্রম তার লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারত না। তিনি যে প্রকারের কঠিন থেকে কঠিনতর পরিশ্রম ও কষ্ট হাসিমুখে বরণ করে নিতেনতা আমাদের মত লোকদের সর্বদা লজ্জায় ফেলে দিত। বেফাকুল মাদারিসকে সুসংগঠিত করার জন্য এবং তার প্রভাববলয় সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য হযরত রাহ. স্বয়ং মারাত্মক কষ্টকর সফর করে এমন গ্রাম-পাড়া ও দুর্গম এলাকায় পৌঁছেছেন যেএ উদ্দেশ্যে হযরতের পূর্বে সেখানে কেউ গমন করেনি। এই কষ্ট ও কুরবানীর এমন বরকত আল্লাহ পাক দান করলেন যেবেফাকুল মাদারিস এখন বিশাল মহিরূহের আকার ধারণ করেছে। শত ষড়যন্ত্র ও বিরুদ্ধাচরণের মারাত্মক ও ভয়াবহ তুফানের মধ্যেও আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে দৃঢ়পদ থেকে খেদমত করে যাচ্ছে। আল্লাহ পাক হযরত রাহ.-এর এই ফয়েযকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখুন- আমীন।
হযরত রাহ. আকাবির উলামায়ে দেওবন্দের মাসলাকের ব্যাপারে অতি কঠোর হওয়া সত্ত্বেওদ্বীনী মাদরাসাসমূহের কল্যাণে অন্য ঘরানার লোকদের সাথে মিলে-মিশে কাজ করার ক্ষেত্রে এই কঠোরতাকে বাধা হতে দেননি। আর এটা হযরতেরই বিজ্ঞজনোচিত প্রজ্ঞা ও চেষ্টার ফল ছিল যেবিভিন্ন ঘরানার মাদরাসাসমূহের একটি সম্মিলিত প্লাটফর্ম ইত্তিহাদে তানযিমাতে মাদারেসে দ্বীনিয়া নামে কেবল একটি সংগঠন অস্তিত্বই লাভ করেনিবরং এই সংগঠন সম্মিলিতভাবে দ্বীনী মাদরাসাসমূহের বিরুদ্ধে যত ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং যত প্রকারের প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে সবকিছু অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করে মাদরাসাসমূহের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখেছে এবং আমার এই প্রবন্ধ লেখা পর্যন্ত আলহামদু লিল্লাহ সফলভাবে নিজ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
হযরত রাহ. যে সকল আকাবির থেকে তালীম ও তারবিয়াত (শিক্ষা ও দীক্ষা) হাসিল করেছিলেন এটা তাদেরই প্রভাব ছিল যেদ্বীনী আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে তিনি কোনো প্রকার শৈথিল্য সহ্য করতে পারতেন না। ফলে তিনি যা সত্য ও হক মনে করতেনতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কোনো দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিতেন না।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হযরতের জন্য চলা-ফেরা করাটা তো অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার ছিলই বরং কথা বলাটাও অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। এতদসত্ত্বেও দ্বীনী অঙ্গনে ঘটিত ঘটনাবলীর প্রতি গভীর দৃষ্টি রাখতেন। এক্ষেত্রে যেখানে প্রয়োজন মনে করতেন নিজ মতামত মৌখিক বা লিখিতভাবে প্রকাশ করতেন। আলহামদু লিল্লাহ! এ সকল ব্যাপারে হযরত আমার মতো তাঁর অযোগ্য শিষ্যকেও অংশগ্রহণের সৌভাগ্যে ধন্য করতেন। জাতীয় ও ধর্মীয় বিষয়ে হযরত রাহ.-এর নির্দেশনা মৌখিক বা লিখিতরূপে আমার কাছে পৌঁছতে থাকত। অনেক সময় এ সকল ব্যাপারে হযরত রাহ. আমাদের সাথে পরামর্শও করতেন। আমি যদি কখনো ছাত্রসূলভ কোনো পরামর্শ দিতাম হযরত রাহ. সেটা গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করতেন।
শেষ দিকে এসে হযরতের শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতার কারণে দেখা-সাক্ষাৎও কম হত। এ সময়ে হযরতের সাথে বেশীরভাগ সময় ফোন ও পত্রের মাধ্যমেই যোগাযোগ হত। কিন্তু ইন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে বেফাকুল মাদারিস (-এর গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত এমন একজন বুযুর্গকে কেন্দ্র করে মারাত্মক এক অচলাবস্থা সৃষ্টি হলযিনি তার যোগ্যতার সবটুকু উজাড় করে বেফাকুল মাদারিসের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছিলেন)-কে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনের জন্য এক সপ্তাহের মধ্যেই অনেকবার হযরত রাহ-কে দেখার এবং সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ হয়েছে। সৃষ্ট ঐ অচল অবস্থা নিরসনের জন্য হযরত রাহ. বেফাকুল মাদারিসের আকাবিরদের যে বৈঠক ডেকেছিলেন সে বৈঠকে এই অকর্মণ্যকে কেবল বিশেষভাবে দাওয়াত দিয়েই ক্ষান্ত হননিবরং ঐ বৈঠকের সভাপতির দায়িত্ব হযরত মাওলানা ডক্টর আবদুর রাজ্জাক ইস্কান্দার ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের উপর দিয়েআমাকে নির্দেশ দিলেন আমি যেন সভাপতি সাহেবের নায়েব হিসেবে তাঁর সহযোগিতায় এই সভা পরিচালনা করি। আলহামদু লিল্লাহ! হযরত রাহ. এ বৈঠকের ফলাফলে আশ্বস্ত হয়েছেনসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ সময় আরেকবার হযরত রাহ.-এর হস্তচুম্বন করার সৌভাগ্য লাভ হয়েছে। সে সময় তো কোনভাবেই বুঝতে পারিনি যেএটাই হযরতের সাথে অধমের শেষ সাক্ষাৎ হবে।
এর কয়েকদিন পর হযরতের অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে তাঁর চিকিৎসক ও ছেলেদের সাথে বরাবর যোগাযোগ রাখছিলাম। কখনো কিছুটা সুস্থ হওয়ারআবার কখনো অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার সংবাদ পাচ্ছিলাম। এ সময় হযরত রাহ. কিছুটা সুস্থতা অনুভব করায় হাসপাতাল থেকে বাসায়ও এসেছেন। কিন্তু ১৬ই রবিউস সানী ১৪৩৮ হিজরী (১৫ জানুয়ারী ২০১৭ ঈসায়ী) রবিবার দিন রোগের প্রকোপ বেড়ে যায় এবং হৃদযন্ত্রের কষ্ট আরম্ভ হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই ১৭ রবিউস সানী হযরতের নির্ধারিত ক্ষণ এসে যায়। তিনি আসল মালিক আল্লাহ পাকের সান্নিধ্যে চলে যান।
إنا لله و إنا إليه راجعون، اللهم أكرم نزله ووسع مدخله، وأبدله دارا خيرا من داره، وأهلا خيرا من أهله، ونقه من الخطايا كما ينقى الثوب الأبيض من الدنس، وأسكنه بحبوة جنانك يا أرحم الراحمين. ولا تحرمنا أجره ولا تفتنا بعده.
ভাষান্তর : মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান মাসিক আলবালাগ
জুমাদাল উলা ১৪৩৮ হিজরী সংখ্যা