Thursday, January 5, 2017

খাজা উসমান হারূনী রাহ.

ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সিলসিলা প্রচলিত ছিল এবং এখনও আছে। এসব সিলসিলার মাঝে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে চিশতিয়া সিলসিলা। এই সিলসিলার সূচনা করেছিলেন শায়খ আবু ইসহাক শামী রাহ. (মৃত্যু : ৯৪০ হিজরী)। কিন্তু সিলসিলাটিকে সুখ্যাতির চুড়ায় পৌঁছানো ও বিস্তৃতি দানের কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন হযরত খাজা মঈনুদ্দীন আজমিরী রাহ.।
এই পূত সিলসিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কড়া হচ্ছেন হযরত খাজা উসমান হারূনী রাহ.। তিনি ছিলেন হযরত খাজা আজমিরী রাহ.-এর পীর ও মুর্শিদ। যদিও তিনি শুধু একবার ভারত উপমহাদেশে আগমন করে এ অঞ্চলকে ধন্য ও সম্মানিত করেছিলেন তবুও পরোক্ষভাবে তাঁর অবদান গোটা ভারতবর্ষেই ছড়িয়ে আছে। কেননা তাঁরই নির্দেশে খাজা আজমিরী ভারতে তাশরীফ এনেছিলেন এবং মানুষকে ইসলাহ করেছিলেন।
হযরত খাজা উসমান হারূনী রাহ. ছিলেন হযরত আলী রা.-এর বংশধর। এগারটি ধাপের মধ্যস্থতায় হযরত আলী রা.-এর সঙ্গে তাকে সম্পর্কযুক্ত করা হয়। তার মাতৃভূমি ছিল খোরাসানের বরূন নামের একটি প্রদেশ।
প্রধম জীবন থেকেই তিনি ইবাদত-আমলের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। নয় দিনে ও এক রাতে পবিত্র কুরআন খতম করতেন। সত্তর বছর পর্যন্ত কঠিন মুজাহাদা করে জীবন কাটিয়েছেন। কখনো তৃপ্ত হয়ে খানাও খাননি, পানিও পান করেননি।
তাঁর দুআ সব সময় কবুল হয়ে যেত। মুখে তিনি যা বলতেন বাস্তবে তা-ই ঘটে যেত। তাঁর দৃষ্টির ছিল পরশ পাথরতুল্য প্রভাব। সে দৃষ্টি যার ওপর একবার পড়ত আধ্যাত্মিকতার ধাপসমূহ অতিক্রম করে উর্ধ্ব মাকামে পৌঁছে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়ে যেত।
হযরত খাজা উসমান হারূনী রাহ.-এর পীর ও মুর্শিদ ছিলেন হাজী শরীফ জিন্দানী রাহ.। আধ্যাত্মিকতা ও সুলূকের ক্ষেত্রে তিনি তার যুগের শীর্ষ মাশায়েখদের মাঝে অতুলনীয় উদারহণশূন্য প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। ওই যুগের সব আলেম-ফাযেল বিশেষত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বরা তাঁর দিকে ধাবিত ছিলেন। হযরত খাজা উসমান হারূনী রাহ. যখন তাঁর খেদমতে হাজির হয়ে তার মুরীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন তখন তিনি খাজা উসমানের প্রতি পূর্ণ অনুগ্রহের আচরণ করলেন। তাকে বাইআত করে ধন্য করলেন এবং নিজ হাতে তাঁর গায়ে খিরকা পরিয়ে দিলেন। অবশেষে তাকে নসীহত করে বললেন, হে উসমান! যেহেতু তুমি দরবেশীর খিরকা দিয়ে শরীরটাকে সজ্জিত করেছ তাই এখন থেকে চারটি বিষয়ে তোমাকে কঠোরভাবে আমল করতে হবে। এক. দুনিয়া এবং দুনিয়ার অপরিহার্য অনুষঙ্গগুলো থেকে দূরে থাকো ও সংযত থাক। দুই. লোভ-লালসা ত্যাগ কর। তিন. নফসের প্রবৃত্তিসমূহ থেকে দূরে থাক। চার. রাত জাগ এবং আল্লাহর যিকিরে নিমগ্ন হও। কেননা বুযুর্গদের ফরমান হল, দরবেশীর খিরকা ওই ব্যক্তিই তার মাথার উপর রাখতে পারে যে আল্লাহ ব্যতীত দুনিয়ার সব জিনিসকে বর্জন করেছে। আমিও এর উপরই আমল করেছি। তুমিও এই ধারারই আনুগত্য কর। দ্বিতীয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, আল্লাহর সৃষ্টজীবের সঙ্গে দয়া ও কোমলতার সঙ্গে আচরণ কর।
খাজা উসমান হারূনী রাহ. তার পীর ও মুর্শিদের এই নসীহতগুলোকে জীবনের পণ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং নিজের গোটা জীবনকে আল্লাহর ইবাদত ও সৃষ্টির খেদমতে বিলিয়ে দেন। এভাবেই তিনি কৃতিত্ব ও পূর্ণতার উচ্চ শিখরে পৌঁছে যান।
হযরত খাজা উসমান হারূনী রাহ.-এর জীবনে বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনার নজির পাওয়া যায়। সিয়ারুল আউলিয়া গ্রন্থে লেখা আছে যে, খাজা মুঈনুদ্দীন হোসাইন সাঞ্জারী বলেন, একবার আমি খাজা উসমান হারূনী রাহ.-এর সঙ্গে সফরে ছিলাম। যখন আমরা দজলার পারে এসে পৌঁছলাম তখন সেখানে কোনো নৌকা ছিল না। খাজা উসমান হারূনী রাহ. বললেন, তুমি তোমার চোখ দুটো সামান্য সময়ের জন্য বন্ধ করে রাখ। আমি তাই করলাম। এরপর যখন চোখ খুললাম তখন আমি আমাকে এবং খাজা উসমানকে দজলার ওপারে আবিষ্কার করলাম। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি এটা কীভাবে করলেন? তিনি বললেন, পাঁচবার সূরা ফাতিহা পাঠ করেছি।
একবার এক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি হযরত খাজা উসমান হারূনী রাহ.-এর খেদমতে হাজির হল। ওই বৃদ্ধ লোকটির চেহারায় ছিল দুশ্চিন্তা, দুঃখ ও পেরেশানীর স্পষ্ট ছাপ। খাজা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন : কী ব্যাপার?
বৃদ্ধ লোকটি নিবেদন করল, চল্লিশ বছর ধরে আমার বড় ছেলেটি নিখোঁজ। সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তা-ও জানি না। আমি আপনার খেদমতে দুআর জন্য উপস্থিত হয়েছি। শুনেছি, আপনার দুআ সব সময় কবুল হয়। হযরত খাজা উসমান তখন ক্ষণিকের জন্য মুরাকাবা করে হাজিরীনে মজলিসকে বললেন, কয়েকবার সূরা ফাতিহা পড় যেন এই মুসাফির লোকটির ছেলে ফিরে আসে। হাজিরীন সূরা ফাতিহা পাঠ করলেন। এরপর খাজা ওই লোকটিকে বললেন, যাও তোমার ছেলে বাড়ি ফিরে এসেছে। বাড়ি ফিরার আগেই পথে এক ব্যক্তি তাকে খরব দিল, তোমার ছেলে বাড়িতে ফিরে এসেছে।
হযরত খাজা উসমান হারূনী রাহ. শেষ বয়সে মক্কা মুয়াজ্জমায় ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন। সেই পবিত্র শহরেই ৬শাওয়াল ৬০৭হিজরীতে তিনি আল্লাহর সাক্ষাতে চলে যান। #
[হযরত মুফতী ওলী হাসান টোংকী রাহ.কৃত আওলিয়ায়ে পাক ও হিন্দ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত]   

মুল লিংকঃ http://www.alkawsar.com/article/679

আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রাহ. : মহৎ মানুষ, আদর্শ পুরুষ

শীতকাল। সকাল দশটা। সূর্য ওঠেছে আজকের আকাশেমৃদু রোদদেহ-মন প্রশান্ত করা আবহাওয়া। জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের দফতর-কক্ষের সামনে একটি চেয়ারে বসে আছেন একজন প্রৌঢ় ব্যক্তিত্ব। হাতে লাঠি। গায়ে ধবধবে সাদা সুতি পাঞ্জাবী। তার ওপর হাল্কা আকাশী রংয়ের সদরিয়া। রোদের আলোয় চশমার ফ্রেমটা চিকচিক করছে। চেহারায় চিন্তার ছাপ। কী যেন ভাবছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রখ্যাত বহু আলিমে দ্বীন তাঁর শাগরিদ কিংবা নাতি-শাগরিদ। কওমী মাদরাসাগুলোতে মাতৃভাষা বাংলায় পাঠদান আন্দোলনের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব তিনি। বহু কালজয়ী গ্রন্থের লেখকঅনুবাদক ও সম্পাদকও তিনি। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় কী ভাবছেন এই মহান পুরুষ?! প্রায়-ই তো বলেনএক পা কবরে চলে গেছে। আরেকটি পা যেন নিরাপদে-সালামতে কবরে রাখতে পারি সে-ই দুআ করো।
আহামৃত্যুর আগেই মৃত্যুর ফিকিরপরকাল-ভাবনা। সুন্দর হবে তো আমার ওই পারের জীবন!
হযরত এখনো এগুলোই ভাবছেনকিংবা ভাবছেন ছাত্র-সমাজ এবং আম জনতাকে নিয়ে। হুযুর-পত্নী আম্মাজানই তো ওই দিন বললেনতোমাদের হুযুর ঘরে আসলেও শান্তিতে থাকেন না। অস্থির এবং বে-চাইন হয়ে পড়েন। ছটফট করতে থাকেন। বলেনআল্লাহই জানেনএই ছাত্রদের হক্ব আদায় হচ্ছে কি নাকিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে এই আমানতের কী জওয়াব দিব?
হুযুরও একদিন বলছিলেনএই বুড়োটাকে যে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াচ্ছেমাদরাসার কিংবা ছাত্রদের কী ফায়দা হচ্ছে আমার দ্বারাতোমরা আমাকে মাফ করে দিয়ো।
সুবহানাল্লাহ! বাহ্যিকভাবে যার কারণে আজকের এই জামিয়াতিনি তো বলবেনহামারি খূন ভী শামিল হ্যয় ইস গুলশান মেঁএই পুষ্পোদ্যান তো আমাদের রক্তেই নির্মিত।
এ কি! এই সাধক বলেন কি?! ক্ষমা চাইছেন তিনি। সৃষ্টির উল্লাসে তৃপ্তি ও প্রাপ্তির আনন্দে উল্লসিত না হয়ে অপরাধবোধ ও কৃতজ্ঞতার অশ্রু চোখে নিয়ে তিনি সিজদায় নতশির! এ যে কুরআনী শিক্ষার-ই বাস্তব রূপায়ন।
শুধু ছাত্র-শিষ্য কেনজনতাকে নিয়েও তো তিনি এভাবে ভাবেন। জামিয়া মালিবাগের ৩০ বর্ষের কৃতী ছাত্রদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের এক প্রস্তুতি সভায় তিনি বলছিলেনঅমুক অমুককে আমরা নাস্তিক বলে বলে শুধু দূরে সরিয়ে দেই। কদিন গিয়েছি তাদের কাছেযান না তাদের কাছে। আলাপ করুন। তাদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরুন। বেচারারা তো সারাজীবন ওই পরিবেশে কাটিয়েছেইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায়নি। তাদের কাছে না গিয়ে-ই আপনি তাদের ব্যাপারে ঢালাও মন্তব্য করবেনএতে তো লাভের চাইতে ক্ষতি-ই বেশি হবে। তারা আরো উদ্ধত হবে। আল্লাহ না করুনএকপর্যায়ে তাদের নাস্তিকতার দায় কিছুটা হলেও আপনাকে বহন করতে হতে পারে। আল্লাহ হিফাযত করুন।
উম্মতের জন্য ফিকিরমান্দ এই মহান ব্যক্তিত্বের নাম হযরত মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রাহ.।
শীতের ওই সকালেই হুযুরের সাথে আমার প্রথম মুলাকাত হয়েছিল । দুরুদুরু বুকে ক্ষীণ পদে হুযুরের সামনে গিয়ে হাযির হলাম। ভীত-বিহ্বল কণ্ঠে সালাম দিলাম। হুযুর মাথা ওঠালেন এবং স্বভাব-সুলভ দরায কণ্ঠে সালামের জবাব দিলেন। নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। পরিচয় জানার পর হুযুর বললেনও আচ্ছামাওলানা রশিদুদ্দীন আহমদ রাহ.-এর নাতি আপনি
হঠাৎ সম্বোধন পরিবর্তন। তুমি থেকে আপনি। প্রথমে ভেবেছিলামএমনিতেই হয়ত আপনিকরে বলছেন। কিন্তু পরেও যখন কখনো দাদাজান রাহ.-এর প্রসঙ্গ এসেছে তখনো ঘটেছে সম্বোধন পরিবর্তনতুমি থেকে আপনি
বড়রা এভাবেই বড়দের সম্মান জানান। কিন্তু বড়দেরকে সম্মান জানাতে গিয়ে মাঝের কেউ যদি সম্মান-প্রাপ্ত হয় তাহলে কখনো কখনো মাঝের ওই ব্যক্তিটি ধোকায় পড়ে যায়। মনে করে তাকেই হয়ত সম্মান জানানো হয়েছে। অথচ এই সম্মান তো মধ্যস্থ ব্যক্তিটিকে দান করা হয়েছে বড় ওই ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে। কথাগুলো আমি আব্বাজান থেকে শুনেছি।
এ প্রসঙ্গে আব্বাজান প্রায়ই একটি ঘটনা বলেনতিনি যখন পাকিস্তান পড়তে যান তখন দাদাজান রাহ. তাঁর হাতে একটি চিঠি দিয়েছিলেন হযরাতুল আল্লাম মাওলানা ইউসুফ বানূরী রাহ.-এর নামে। চিঠি হাতে পেয়ে তিনি বললেনআরেআপ ওনকে ছাহেব যাদেঁ হেঁইয়াহাঁ বেঠিয়ে একথা বলে বানূরী রাহ. আব্বাজানকে তাঁর পাশের সোফায় বসতে দিলেন। আব্বাজান বলেনতখন বুঝিনি। এখন বুঝিএ আমার প্রাপ্য ছিল নাআব্বাজান রাহ.-এর বরকতে এ ছিল আমার প্রাপ্তি এবং বানূরী রাহ.-এর শরাফত ও মহানুভবতা।
কাজী ছাহেব হুযুরের কাছ থেকেও ছাত্ররা এমন অনেক কিছু পেতপ্রাপ্য হিসেবে নয়বরং প্রাপ্তি এবং হুযুরের মহানুভবতা হিসেবে।
জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া তেজগাঁও-এ হুযুর একবার গিয়েছিলেন বুখারীর শেষ দরস্ প্রদান করার জন্য। মাদরাসার অধিকাংশ  উস্তায হলেন হুযুরের মায়ায়েনায ও প্রবীণ শাগরিদ। মালিবাগ থেকে হুযুরের সাথে সেখানে গিয়েছিল হুযুরের এক নবীন ছাত্র। হুযুর প্রবীণদের সাথে ওই নবীনকে পরিচয় করালেন প্রায় সাড়ে তিন মিনিট ধরে। ছাত্রটি সেদিনের ঘটনা বলতে গিয়ে বলেনওই সময় আমার যে কী অবস্থা। লজ্জায় চোখ-মুখ লাল হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হুযুর কোনো প্রকার তাকাল্লুফ বা কৃত্রিমতা ছাড়াই আমার কথা বলে যাচ্ছিলেন। নিজেকে ছোট মনে করেন যিনিমুজাস্সাম তাওয়াযু যিনিতিনি তো এমন হবেন-ই।
অনেক সময় ছাত্রদের সাথে হুযুরের আচরণ দেখলে ভ্রম হতহুযুর কি তার শাগরিদদেরকে ছাত্র মনে করেননাকি সম্মানের পাত্র মনে করেন। এক তাফসীর মাহফিলে হুযুর বলছিলেনশরীর অসুস্থ। মাত্র ডাক্তার দেখিয়ে এলাম। বন্ধুবর মাওলানা আব্দুল আখির সাহেবের মনোতুষ্টির জন্যই হাযির হয়েছি। হুযুরের আলোচনা শেষে মাওলানা আব্দুল আখির ছাহেব বললেনহুযুরআসলেই কি আমি আপনার বন্ধুআমি তো আপনার এক নগণ্য ছাত্র। হুযুর বললেনআচ্ছা আপনি যদি আমার বন্ধু না হন তাহলে কি শত্রু?
প্রকৃতপক্ষে হুযুরের হাস্য-রসিকতা থেকেও বিনয় ও তাওয়াযু পরিস্ফুটিত হত এবং অনেক শিক্ষা পাওয়া যেত।
মালিবাগ থেকে ফারিগ হওয়ার পর যখনই হুযুরের সাথে দেখা করতে যেতাম হুযুর আব্বার কথা জিজ্ঞেস করতেন এবং আব্বার পরিচালনাধীন জামিয়া মাদানিয়া কোলাপাড়ার খোঁজ-খবর নিতেন। হুযুর ওই মাদরাসার মজলিসে শূরার সদস্যও ছিলেন।
একবার আব্বার সাথে গেলাম হুযুরের সাথে দেখা করার জন্য। আব্বাজানও হুযুরের ছাত্র। আব্বাজানকে হুযুর তুমি করেই বলতেন। কিন্তু সেবার আপনি করে বলেছিলেন।
মজলিস শেষে আব্বাজান আমাকে বললেনহুযুরের আদতই এমনছাত্রের সামনে যদি তার ছেলে কিংবা ছাত্র থাকে তাহলে হুযুর আপনি করে বলেন যেন ওই ছেলে বা ছাত্রের মনে বাবা/উস্তাযের তাজীম আরো বৃদ্ধি পায়। এ ছিল হুযুরের উত্তম আখলাকের একটি দৃষ্টান্ত।
লেখালেখির জগতের অনেকের মাঝে বিনয়ের অভাব দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে ওই পাড়ার প্রয়াত লেখক-বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেনপরবর্তী জেনারেশনের মধ্যে বিনয় জিনিসটা নাই। কিছু বলতে গেলে -এর মত চিৎকার করে। এভাবে চলতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে এখানে কোনো মহৎ সৃষ্টি আশা করা যায় না। তবে অসাধারণ প্রতিভাবান অথচ বিনয়ী -এমন উপমা খুঁজতে দিল্লি যেতে হবে না। বৈচিত্রময় প্রতিভাধর মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহই এর চড়ান্ত উপমা। বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সুর গ্রন্থের আঁতুরকথনে তিনি বলেছেনআমি কবি সাহিত্যিক  নই। লেখার অভ্যাসও নেই। তাই ভাষার মান ও বর্ণনাভঙ্গি পাঠকদের পীড়া দেবে। শুধু প্রেমের টানেভালবাসার তাগিদে আমি পাঁচ বছর এ নেশায় বুঁদ হয়ে ছিলাম। এভাবে শুধু হুযুরের বিনয়ের ঘটনাগুলোই জমা করে বড় কলেবরের একটি কিতাব তৈরি হতে পারে।
হুযুরের ইশকে মাদানী (হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ.)-এর বিষয়টি তো ছিল সুপ্রসিদ্ধ। মাদানী রাহ. নাম যখন বলতেন তখন মনে হতহুযুর বুঝি তার প্রেমাষ্পদের নাম উচ্চারণ করছেন। শায়খুল আরব ওয়াল আজম হুসাইন আহমদ মাদানী নাওওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু এভাবে পুরো নাম উচ্চারণ করতেন। হুযুরের অন্যান্য আসাতিযায়ে কেরামকেও হুযুর অনেক মুহাব্বত করতেন। তাঁদের কারো আলোচনা এলে হুযুর ভক্তি ও শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে যেতেন।
আব্বাজান বলেনএকবার আব্বার সাথে গেলাম যাত্রাবাড়ি মাদরাসায়। দফতরে আব্বাজান রাহ. শায়খ তাজাম্মুল আলী রাহ.-এর সাথে কথা বলছিলেন। কিছুক্ষণ পর কাজী ছাহেব হুযুর দফতরে আসেন। উস্তায তাজাম্মুল আলী রাহ. এবং তাঁর সহপাঠী রশিদুদ্দীন আহমদ রাহ.-কে কথা বলতে দেখে কাজী ছাহেব হুযুর দরজার পাশেই আত্তাহিয়্যাতুর ছরতে বসে পড়েন ।
উস্তায-পুত্রদের সাথে হুযুরের আচরণ দেখলে মনে হত ইনি-ই বুঝি হুযুরের উস্তায।
একবারের ঘটনাহযরত কাজী ছাহেব রাহ. উস্তায-পুত্র সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানীর ইস্তেকবালের জন্য বিমান বন্দরে গেলেন। অভ্যর্থনা পর্ব শেষেই হুযুরের মাদরাসায় ফেরার কথা। আরশাদ ছাহেবের সাথে মুসাফাহা করা মাত্র তিনি হুযুরকে বললেনইনশাআল্লাহদস্তরখান পর বাত হো-গী। হুযুর বললেনজ্বী আচ্ছা। বয়সে কাজী ছাহেব হুযুর কত বড়! শরীরও খারাপ। ওযর করতে পরতেন। কিন্তু উস্তায-পুত্র বলেছেনদস্তরখানে কথা হবে। হুযুরের অবস্থা দেখে মনে হলযেন উস্তাযই আদেশ করেছেন। গাড়িতে ওঠে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেনكلام الملوك ملوك الكلام   উস্তায-পুত্রের কথা কি টালা যায়?
আসলে আমাদের আকাবিরের মাঝে উস্তায-ভক্তিটা ছিল এমনই। আব্বাজানের কাছে শুনেছিস্বাধীনতার পর আসআদ মাদানী রাহ. যখন প্রথমবার বাংলাদেশ সফরে আসেন তখন তিনি জোয়ানই ছিলেন। অথচ যাত্রাবাড়ি মাদরাসায় আমরা দেখেছিমাদানী রাহ.-এর প্রধান বয়োবৃদ্ধ শাগরিদরাও আসাআদ মাদানী রহ. -এর সামনে বসেছিলেন আত্তাহিয়্যাতুর ছরতেযেন উস্তাযের সামনেই বসে আছেন।
হুযুরকে আমরা পেয়েছিলাম হুযুরের একেবারে শেষ বয়সে। এ সময়েও তিনি মুতালাআ করতেন নিয়মিত। দীর্ঘদিন সহীহ বুখারী পড়িয়েছেন। তা সত্তে¡ও  মুতালাআ ছাড়া দরসে যেতেন না।
শেষ বয়সে হুযুরের চোখে সমস্যার কারণে অপারেশন করানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু কোনো কোনো ডাক্তারের পরামর্শ ছিলএত ডায়াবেটিস নিয়ে অপারেশ করানো ঠিক হবে না। তবুও হুযুর অপারেশন করাতে চাচ্ছিলেন। মালিবাগ জামিয়ার নায়িবে মুহতামিম উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা আনোয়ার শাহ ছাহেব একদিন হুযুরকে জিজ্ঞেস করলেনহুযুরএই অবস্থায় অপারেশন করানোর কী দরকারহুযুর বললেনহাদীস পড়াতে হবে নামুতালাআ ছাড়া কীভাবে পড়াবোশাহ ছাহেব বললেনহুযুরের কি এখন আর মুতালাআ করা লাগেহুযুর জবাব দিলেনকোনো দিন মুতালাআ ছাড়া দরসে যাইনি। কোনো কারণে যদি সময় না পাই তাহলেও কমপক্ষে ফয়যুল বারীটা দেখা হলেই তবে দরসে যাই।
হুযুরের উপস্থাপনাভঙ্গিও ছিল অসাধারণ। কখনো কখনো দরসে বলতেনকিতাবখানা বন্ধ কর। এরপর নাতিদেরকে গল্প বলার মত করে সামনের হাদীসটি ব্যাখ্যাসহ শুনিয়ে দিতেন। কিতাব খোলার পর দেখা যেতহাদীসের কিছু অংশ হয়ত ওখানে আছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই হুযুর বুখারীর সকল বর্ণনা জমা করে আমাদের শুনিয়ে দিয়েছেন। ফলে ইশকাল পয়দা হওয়ার সম্ভাবনা যেখানে থাকত তাও দূর হয়ে যেত। হুযুরের দরস এতটাই শানদার ও মযাদার ছিল যেহুযুর নিজেই বলতেনআমার দরস ছাত্ররা চেটে-পুটে খায়।
হুযুর এক সময় মুনাযারাতেও যেতেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের হয়ে বিভিন্ন মুনাযারায় শরীক হয়েছেন। হুযুরের কাছেই শুনেছিজমিয়তের পক্ষ থেকে নরসিংদীতে একবার আমাকে পাঠানো হলজামাতে ইসলামীর সাথে মুনাযারা করার জন্য। আমার গঠন-গড়ন দেখে কেউ কেউ বলে ওঠেএই পুচকারে দিয়ে কী হবেএরপর যখন আমি টানা আড়াই ঘণ্টার আলোচনায় জামাতে ইসলামীর স্বরূপ ব্যাখ্যা করি এবং তাদের আসল চেহারা উন্মোচন করে দেই তখন উপস্থিত জনতার অনেকে বলাবলি শুরু করে দেয়পিচ্চি মরিচে দেখি অনেক ঝাল।
মাদীনাতুর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি হুযুরের দিলে যে টান ছিল স্বাভাবিক অবস্থায় তো তা বুঝা যেত না। কিন্তু একদিন আমরা তা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। ১৪৩০ হিজরী সনে হুযুর সর্বশেষ হজ্বে যান। হজ্বে যাওয়ার আগে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা জাফর ছাহেব হুযুরসহ অন্যান্য আসাতিযায়ে কিরাম মূল্যবান কিছু নসীহত পেশ করেন। সবশেষে কাজী ছাহেব হুযুর বললেনআমি একটা হাশিয়া যোগ করবআলাদা কোনো ওয়াজ করব না। এই সফরে যাওয়ার আগে আমি সে-ই দুআ করি যে দুআ করতেন হযরত ওমর রা.। আপনারাও আমার জন্য সে-ই দুআ কইরেন
 اللهم ارزقني شهادة في سبيلك واجعل قبري في بلد حبيبك
হুযুর যেভাবে এ কথা কটি বলেছিলেন তা তো আর আমার পক্ষে কাগজে কলমে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর এ কটি কথা শুনেই মজমার অনেকের চোখে পানি চলে এসেছিল।
এক বিকালে কি সন্ধ্যায় হুযুর আগের এক হজ্বের স্মৃতিচারণ করছিলেন-
কাঠফাঁটা রোদ। এর মধ্যেই সবাই তওয়াফ করছে। তওয়াফ শেষে আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আল্লাহ প্রেমিকদের পবিত্র দৃশ্য। অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল,
 لو رأى هذا المنظر أحد من المشركين لصاح بقول لا إله إلا الله 
(অর্থ: কোনো মুশরিক যদি দেখত এ দৃশ্য তাহলে চিৎকার করে বলে ওঠতলা ইলাহা  ইল্লাল্লাহ. (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।) পাশেই ছিলেন একজন আরব শায়খ। আমার কথা শুনে বলে ওঠলেনসত্যই বলেছসত্যই বলেছ
হাদীস এবং ফিকহের কিতাবে নামাযের যে বর্ণনা দেয়া আছে হুযুরের নামায ছিল তার জীবন্ত রূপ। দেখলে মনে হতসত্যি যেন হুযুর তাঁর রবের সাথে কানাকানি করছেন। ইজতেমায়ী দুআর সময় হুযুরের নিঃশব্দ বোবা১ কান্না ও রোনাযারীর এত বেশী তাসীর হত যেপুরো মজমা জারজার হয়ে আল্লাহর দরবারে চোখের পানি ঝরাতো।
হুযুর যখন কুরআনে কারীমের কোনো আয়াত তিলাওয়াত করতেন মনে হতহয়ত আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে হুযুরকেই সম্বোধন করেছেন। কখনো কখনো এভাবে বলতেনএই যে দেখেনআল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে বলেছেনএই কাজী মুতাসিম বিল্লাহকেই বলেছেন,
وَ اعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِیْعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوْا
আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবিচ্ছিন্ন হয়ো না। -সূরা আলে ইমরান : ১০৩
জাতির বিভিন্ন সমস্যার কারণ হিসেবে হুযুর প্রায়ই সেই হাদীসটিই উদ্ধৃত করতেন, (কিয়ামতের একটি আলামত হল)إعجاب كل ذي رأي برأيه প্রত্যেকে নিজের মতটাকেই প্রাধান্য দিবে। (সুনানে  ইবনে মাযাহহাদীস ৪০১৪) নিজেরটাকেই সাব্যস্ত করতে চাইবে। অন্যের কারো রায়কে কোনো গুরুত্ব দিবে না। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা-সহমর্মিতা থাকবে না।
বাস্তবেও বর্তমানে দেশ-বিদেশের চিত্র তা-ই। হয়ত এজন্যই হুযুরের আদত  ছিলতিনি অন্যের মতকে খুব-ই গুরুত্ব দিতেন। চাই সে ছোট হোক না কেন।
ব্যক্তিগত জীবনে হুযুর ছিলেন মিতব্যয়ীঅপচয় কখনো পছন্দ করতেন না। তবে আপ্যায়ন এবং মেহমানদারির ক্ষেত্রে হুযুর ছিলেন অসাধারণ এবং উদারহস্ত। দেশের বাড়ি যশোর থেকে আনা কাঁঠাল তো হুযুরের অনেক শাগরিদ-ই খেয়েছে। আমাদের যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল হুযুরের গ্রামের বাড়ি ঝুমঝুমপুরযশোরে। হুযুরেরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে অপারগতা প্রকাশ করেন। তখন আমরা বললামসফরে যদি হুযুরের সঙ্গ-ই না পাই তাহলে আর সফর করে কী লাভখালি বাড়িতে গিয়ে আমরা কী করব। তার চে ভালএখানে থেকে বন্ধের এ কটা দিন হুযুরের পরশ গ্রহণ করি। হুযুর বললেনআরে বেওকফ! তোমরা তো হুযুরের বাড়িতেই যাচ্ছ। বুঝেছিমরলে পরে আর এই বুড়োটার কোনো খোঁজখবর নিবে না। আমরা লজ্জিত হলাম এবং আদেশ অনুযায়ী দুআ নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলাম। রাতের ট্রেনে সফর করে ফজরের কিছুক্ষণ পর হুযুরের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম। বাড়িতে ছিলেন হুযুরের বড় ছেলে ও তাঁর পরিবার। যেভাবে তাঁরা আমাদের আদর-যত্ন করলেন তা দেখে মনে হলনা জানি আমরা তাদের কত পুরনো আত্মীয়। এত আয়োজন করা সত্তে¡ও হুযুর-পুত্র বললেনআব্বা তো আরো ওই ওই জিনিসের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সময়ের অভাবে পারলাম না। কথাগুলো তিনি বলেছিলেন এমনভাবে যেন ওযর পেশ করছেন। মহৎ মানুষেরা হয়ত তার আশপাশটাকেও এভাবে মহৎ করে তোলেন।
ছাত্ররা যেন এসব গুণাবলী অর্জন করতে পারে সে-ই লক্ষ্যে হুযুর ইসলাহী তাআল্লুকের ব্যাপারে খুব জোর দিতেন। ছাত্রদেরকে উৎসাহিত করতেন। কিন্তু আল্লাহর এ বান্দা নিজে কাউকে বায়আত করতে চাইতেন না। অন্যান্য ক্ষেত্রের মত এ ক্ষেত্রেও নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করতেন। প্রকাশ করতে চাইতেন না। এমনকি হুযুর মাদানী রাহ.-এর ওফাতের পর কার হাতে বায়আত হন এবং কার কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন সে বিষয়টিও ছিল অনেকের অজানা। আমরা শুধু এটুকু জানতামহুযুর মাদানী রাহ.-এর হাতে বায়আত হয়েছিলেন। শেষদিকে মাদানী রাহ. তাঁকে যে সবক দিয়েছিলেন তা আদায় করতে কখনো কখনো হুযুরের আট ঘণ্টার মত সময় লেগে যেত। এ প্রসঙ্গে আমরা এতটুকুই শুনেছিলাম হুযুরের কাছ থেকে।
এ দিকে মালিবাগ জামিয়ার ৩০ সালা দস্তারবন্দী উপলক্ষে প্রকাশিত ডায়েরী আল মুতাসিম-এ জামিয়ার আসাতিযায়ে কিরামের মধ্যে কে কার থেকে খেলাফত লাভ করেছেন তার একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। হুযুর কার মুজায সে বিষয়টি যেহেতু অজানা ছিলতাই ওই তালিকায় হুযুরের নাম অলিখিতই থেকে যায়। হুযুর তালিকাটি দেখে মৃদু হেসে বললেনআমি কী দোষ করলাম?
সে সময়েই আমরা জানতে পেরেছিলামহুযুর তাঁর উস্তায মাওলানা তাজাম্মুল আলী রাহ.-এর কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেছিলেন। এরপর আমরা রাত জেগে তালিকায় কাজী ছাহেব হুযুর এবং শায়খ তাজাম্মুল আলী রাহ.-এর নাম সংযোজন করি এবং ওই ভুলটির সংশোধন করি।
নিজেকে হুযুর এভাবেই আড়াল করেছিলেন। ১৪৩০ হিজরী পর্যন্ত সারা জীবনে হুযুর মাত্র একজনকে বায়আত করেছিলেন। মালিবাগের দস্তারবন্দীর সময় সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী যখন বায়আত করছিলেন তখনো হুযুর বায়আত হওয়ার জন্য অনেককে উৎসাহ দান করেন।
আমাকে বায়আত হতে না দেখে  জিজ্ঞাসা করলেনকী রে বায়আত হলে না যেচুপ করে রইলাম এবং মনে মনে বললামবায়আত তো আপনার হাতেই হব।
১৪৩১ হিজরী-এর খতমে বুখারীর পরদিন বাদ ফজর আল্লামা আহমদ শাফী ছাহেবের কাছে অনেকে বায়আত হল। বায়আত চলাকালীন কাজী ছাহেব হুযুর বসেছিলেন দফতরের সামনে একটি চেয়ারে। আমি হুযুরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এবারো হুযুর জিজ্ঞাসা করলেনকীরে বায়আত হলে না যেএবার সাহস করে বলেই ফেললাম। হুযুর! বায়আত তো আপনার হাতে হব। হুযুর মৃদু হেসে বললেনআমি কি কাউরে বায়আত করি রে? বললামহুযুর যে বায়আত করেন না তা তো জানি। কিন্তু একজনকে তো করেছেন। হুযুর বললেনতাহলে কি আপনাকেও বায়আত করতে হবেআমি হাসি হাসি মুখ নিয়ে চুপ করে রইলাম।
দাওরা পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। সুযোগ পেলেই হুযুরকে বিরক্ত করতে লাগলাম। হুযুর আপনার হাতে বায়আত হব। অনেকেই উৎসুক ছিল হুযুরের হাতে বায়আত হওয়ার জন্য। অবশেষে হুযুর মোট পাঁচজনকে বায়আত করে নেন।
বায়আতের ওই মজলিসে হুযুরের একজন বিশিষ্ট খাদিমেরও থাকার কথা ছিল। কিন্তু কোনো কারণে তাঁর আসতে একটু বিলম্ব হয়ে যায়। হুযুর তাঁকে বলে দিলেনএখন এ মজলিসে আসা যাবে নাতুমি দেরি করেছ। তাই এটা তোমার শাস্তি। বায়আত চলাকালীন মালিবাগ জামিয়ার নায়িবে মুহতামিম উস্তাযে মুহতারাম আনোয়ার শাহ ছাহেব হুযুরও এসেছিলেন। হয়ত কোনো কাজেকিন্তু হুযুর বায়আতের কাজেই মশগুল থাকেন। বুঝলামবায়আতের গুরুত্ব হুযুরের কাছে অনেক এবং রসবোধ সম্পন্ন এই ব্যক্তিটি নীতিতেও অত্যন্ত কঠোর।
দৃঢ়তা এবং নীতিতে কঠোরতা প্রসঙ্গে হুযুরের আরেকটি ঘটনা মনে পড়ছে। হুযুরের মুখেই শুনেছিলাম। সে সময় হুযুর ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্পাদনা বিভাগের সদস্য। ই.ফা.বা এক কিতাবের টীকায় একটি বিষয় সংযোজন করতে চাচ্ছিলযা ছিল হুযুরের তাহকীক মতে ইসলাম-বিরোধী। হুযুর ই.ফা.বা-এর লোকদেরকে প্রকাশ্যে জানিয়ে দেন যদি এটা করা হয় তাহলে আগামী শুক্রবার বাদ জুমা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ বায়তুল মুকাররমে জনসমাবেশ করবে। এতে ই.ফা.বা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।
তাকওয়া-তাহারাতইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতবিনয় ও তাওয়াযু এবং আখলাক ও চরিত্রে এমনই অনন্যঅসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন আমাদের হযরত কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রাহ.। হুযুরের সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার অল্প কিছুদিন। গ্রহণ করবার মত যোগ্যতা থাকলে এই অল্প কিছু দিনেও অনেক কিছু গ্রহণ করা যেত। কিন্তু পাত্র ছিল ছিদ্র। তাই ঝুলিতে কিছু রাখতে পারিনি। হুযুর আজ আমাদের মাঝে নেই। আছে তাঁর চিন্তা-চেতনা এবং কর্ম ও আদর্শ। আল্লাহ তাআলার দরবারে ফরিয়াদ জানাইতিনি আমাদের আদর্শ পূর্বসূরীর উত্তম উত্তরসূরী হবার তাওফীক দান করুন এবং হযরতকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সুউচ্চ মাকাম নছীব করুন।  আমীন।

মুল লিঙ্কঃ http://www.alkawsar.com/article/1654

তা‘লীমের সাথে তাবলীগের এক বাস্তব উদাহরণ : হযরত মাওলানা আবদুল আযীয রাহ.

বৃহত্তর নোয়াখালীর যে কোনো মাদরাসায় শর্শদী মাদরাসার লাকসামের হুযুরকে চেনে না বা তাঁর নাম শোনেনিএমন আলেম বা ছাত্র মনে হয় খুব কমই পাওয়া যাবে। তাঁর আসল নাম হয়ত অনেকেই জানে নাকিন্তু লাকসামের হুযুর বললে মানসপটে যে ছবিটি ভেসে ওঠে তা একজন নিরলস মোবাল্লেগ উস্তাযের ছবি। আমাদের অনেকেই মাদরাসার উস্তায হিসেবে খেদমত করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন এবং উস্তায হিসেবে সফলতাও অনেকে লাভ করেছেন। আবার অন্যদিকে আমাদের অনেকে তাবলীগের সাথে জড়িত হয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজও ভালোভাবে হয়ত আঞ্জাম দিচ্ছেনকিন্তু তালীম ও তাবলীগের সফল সমন্বয়ের বিষয়টি খুবই বিরল। আমার জানামতে শর্শদী মাদরাসার মরহুম হযরত মাওলানা আবদুল আযীয ছাহেব (লাকসামের হুযুর) বড় সমন্বয়ধর্মী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যিনি তাঁর শিক্ষকতার মহান দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তাবলীগ ও দাওয়াতের কাজটিও আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। তাঁর শিক্ষকতা জীবনের পুরো ৪৫/৪৬ বছর একই মাদরাসায় কাটিয়ে দিয়েছেন। এই সুদীর্ঘ তালীমি জীবনে তিনি মনে হয় একটি দিনও তাবলীগ বা দাওয়াতী কাজ ব্যতীত ব্যয় করেননি। তালীম-তাদরীসই তার প্রধান কাজ ছিল। সঙ্গে তাবলীগের কাজেও যুক্ত থাকতেন। আমার বক্তব্যে মনে হয়’ শব্দটি বলতে হল এজন্য যেকখনো আমার শর্শদী মাদরাসায় পড়ার সুযোগ হয়নি। তবে ফেনীর প্রসিদ্ধ দুই বড় মাদরাসার অন্যতম ওলামাবাজার মাদরাসায় দীর্ঘ ছটি বছর পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। ফলে শর্শদী মাদরাসার খবরা-খবর আমরা সবসময় পেয়েই যেতাম। শর্শদী মাদরাসায় পড়া-লেখার সুযোগ হলে হয়ত মনে হয়’ শব্দটি উচ্চারণ না করে নিশ্চিত ধরনের কোনো শব্দ প্রয়োগ করতে পারতাম।

লাকসামের হুযুরের খুব প্রিয় ছাত্র মরহুম মাওলানা আবদুল কাইয়ুম ছাহেব শর্শদী মাদরাসায় মেশকাত বা উলার জামাত সমাপ্ত করে সেখানে দাওরা বা তাকমীল না থাকায় দাওরা পড়ার জন্য ওলামাবাজার মাদরাসায় ভর্তি হয়েছিলেন। আমি তাঁর দু/এক জামাত নিচে থাকলেও তাঁর সাথে আমার খুব আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। লাকসামের হুযুর সম্পর্কে সর্বপ্রথম মনে হয় তাঁর কাছ থেকেই জানতে পেরেছি। তিনি তাঁর ঐ ছাত্রজীবনেই তাঁর প্রিয়তম উস্তাযের হুবহু অনুসারী ছিলেন। তিনিও তাবলীগের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দাওরার সবকের এত ব্যস্ততার মাঝেও দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ তাঁর কখনো ছুটত না। আমার স্পষ্ট মনে পড়ছেএকবার বৃহত্তর নোয়াখালীর মারকায চৌমুহনী মারকাযে তাবলীগের জোড় ছিল। আবদুল কাইয়ুম ছাহেব আমাকে নিয়ে এশার পর ওলামাবাজার মাদরাসা থেকে পায়ে হেঁটে চৌমুহনী রওয়ানা করেছিলেন। নদী পার হয়ে দাগনভুঁইয়া যখন আমরা এসে পৌঁছিততক্ষণে বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়াতে দাগন ভুঁইয়া থেকে পাকা রোড ধরে আমরা দুজন সোজা চৌমুহনী চলে যাই। নিশিরাতে জোড়ে নাম কা ওয়াস্তে শরীক হয়ে আবার দুজন পাকা রোড ধরে হাঁটা আরম্ভ করলাম। ওলামাবাজার থেকে চৌমুহনী ঐ পথে ২৫ মাইলের কম হবে না হয়ত। আমরা দুজন ২৫ মাইল করে আসা-যাওয়াতে প্রায় ৫০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে জোড়ে শরীক হয়ে আবার ফযরের আগেই মাদরাসায় উপস্থিত হয়েছিলাম। কারণফজরের পর পরই তাঁর দাওরায়ে হাদীসের সবক ছিল। ছাত্র যদি এমন হয়,  তাহলে তাঁর প্রিয় ওস্তায কেমন ছিলেন তা সহজেই অনুমান করা যায়।

মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ভাই সারাটি জীবন এ শর্শদী মাদরাসায়ই শিক্ষকতা করেন। উস্তায-শাগরেদ মিলে তালীম ও তাবলীগের কাজ সবসময় চালিয়ে গেছেন। দু-এক বছর পূর্বে ফেনীতে মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছাহেবের ছেলের সাথে পরিচয় হওয়াতে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারলামকয়েক বছর আগে তিনি তাঁর মাওলাপাকের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রিয় উস্তাযের পূর্বেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। মহান আল্লাহ পাক তাঁর মাগফিরাত নসীব করুন এবং বেহেশতে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।
লাকসামের হুযুরের অভ্যাস ছিলপ্রতিদিন আছর অথবা ফজরের নামায এলাকার কোনো না কোনো মসজিদে গিয়ে পড়া এবং সেখানের মুসল্লীদের নিয়ে দ্বীনী আলোচনা করা এবং দাওয়াতী কাজে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা। সমগ্র জীবনটাই তাঁর এভাবে কেটে যায়। ফলে তাঁর এলাকায় দূর-দূরান্ত পর্যন্ত গণমানুষের সাথে তাঁর একটা আত্মার সম্পর্ক হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ তো বটেইচোরবদমাইশ-গুণ্ডা পর্যন্ত তাঁকে দেখলে অন্তর থেকেই সম্মান প্রদর্শন করত। ফলে গণমানুষের ওপর দ্বীনের একটা প্রভাব সবসময় বিস্তার করে থাকত। মানুষের সাথে দ্বীনী এই সম্পর্কের কারণে মাদরাসার সাথেও মানুষের একটা সুসম্পর্ক সবসময় বিদ্যমান থাকত।
তালীম জরুরিনাকি তাবলীগ বেশি জরুরি- এ বিষয়ে মাজালিসে হাকীমুল ইসলাম’ গ্রন্থে হাকীমুল ইসলাম ক্বারী তৈয়ব ছাহেব রাহ.-এর সুদীর্ঘ এক আলোচনা কয়েক পাতাব্যাপী বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে হযরত রাহ.-এর ভাষণের যে নির্যাস বেরিয়ে এসেছে তা হচ্ছেতালীমের মাকসাদ বা উদ্দেশ্য হচ্ছে তাবলীগ। আর তাবলীগের উদ্দেশ্য হচ্ছেতালীম। যে তালীমের পরে তাবলীগ থাকবে না তা সত্যিকারে তালীম নয়। আর যে তাবলীগের পরে তালীম আসবে না তাও সত্যিকারের তাবলীগ হবে না। অর্থাৎ তালীম আর তাবলীগ একে অপরের সম্পূরক বিষয় এবং একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।[1]
তাবলীগের অন্যতম মুরব্বী মরহুম হযরত মাওলানা লুৎফুর রহমান ছাহেবের সাথে একদিন কাকরাইল মসজিদে বসে আলোচনা করছিলাম। আমি বললামহুযুর! তালীম-তাবলীগ দুটিই যখন জরুরী তখন প্রতিটি মাদরাসায় এমন করলে কেমন হয়যখন মাদরাসায় বেতন-ভাতা দিয়ে মোহাসসেল বা চাঁদা উসুলকারী রাখার নিয়ম রয়েছে তখন প্রতিটি মাদরাসায় একজন করে মোবাল্লেগ রাখলে ক্ষতি কীচার মাস-তিন চিল্লা করে একেকজন চিল্লা শেষ হলে আরেকজন বেরিয়ে পড়বেন। যিনি তাবলীগে যাবেন তার কিতাবগুলো অতিরিক্ত শিক্ষক বা মুইনুল মুদাররিসের দ্বারা চালানো হবে। তাহলে বাই রোটেশন’ একটি মাদরাসার প্রতিটি উস্তাযেরই তাবলীগের সাথে জড়িত হবার সুযোগ হয়ে যাবে। এতে করে তাবলীগে আসা সাধারণ মানুষ যেমন এই আলেমের মাধ্যমে উপকৃত হবে তেমনি ঐ আলেম ছাহেবেরও তাবলীগি দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। সাথে সাথে সাধারণ মানুষ ও আলেম সমাজের মাঝে একটা দ্বীনী সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এখন তো আমরা নিজ দেশে থেকেও পরবাস জীবন অতিবাহিত করছি প্রায়।
আমার প্রস্তাব শোনার পর হযরত মাওলানা লুৎফুর রহমান ছাহেব বললেনআমরা তো হুব-হু এটাই চাই। তবে তিন চিল্লার পরিবর্তে এক বৎসরের কথা বলি। কারণএকজনের কিতাব অন্যজন পড়ালে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বলিএক বৎসরের জন্যই একেকজন বেরিয়ে যাকতাতে কিতাবের সমস্যা যেমন থাকবে না তেমনি প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ এক বৎসরের জন্য আরেকজন শিক্ষকের নিয়োগও দিতে সক্ষম হবেন। এভাবে একেকজন করে একেকটি মাদরাসার সব কজন উস্তাযই তাবলীগের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন।
আমার এই প্রস্তাব দু একটি বড় মাদরাসায় বাস্তবায়ন করার ব্যাপারেও আমি বলেছিলাম। দক্ষিণ চট্টগ্রাম হীলা বড় মাদরাসার মাননীয় মুহতামিম মরহুম মঞ্জুর ফকির ছাহেবকে বলায় তিনি খুব খুশি মনেই তা বাস্তবায়ন করার প্রোগ্রাম হাতে নেবেন বলে আমাকে জানান। তাঁর মৃত্যুর পর এখন তা কী অবস্থায় আছে তা আমার জানা নেই।[2] ইদানিং আমার এই প্রস্তাবের ওপর দলিলও পেয়ে গেলাম। আমার পড়ার টেবিলে আমার মুতালাআয় যে কিতাবটি আছেতা হচ্ছে হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর বয়ান-বক্তব্যের সংকলন আল ইলমু ওয়াল উলামা’ কিতাবটি। সময় পেলেই সেখান থেকে পড়তে থাকি। কদিন আগে দেখলামহযরত থানভী রাহ. অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বেশ কয়েকটি বক্তব্য বলেছেন। প্রতিটি মাদরাসায় নিয়োগপ্রাপ্ত একজন মুবাল্লেগ থাকা জরুরি। যার কাজই হবে শুধু আম-জনতাকে  দ্বীনের দিকে আহ্বান করা ও তাদেরকে দ্বীন শেখানো। এই ওয়াজ বা তাবলীগের জন্য কোনো রকম বিনিময় তো দূরের কথা হাদিয়া-তোহফাও নেয়া উচিত হবে না। এমনকি মাদরাসার জন্য চাঁদা বা টাকাও উসূল করা ঠিক হবে না। কেউ যদি স্বেচ্ছায় মাদরাসায় দান করতে চায় তাকে মাদরাসার ঠিকানা বলে দেবে এবং সরাসরি মাদরাসায় পাঠিয়ে দেয়ার কথা ঐ মোবাল্লেগ ছাহেব বলে দিবেন। এতে মাদরাসার চাঁদা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিময় ছাড়া তাবলীগ করার কারণে জনগণের ওপর তার প্রভাব পড়বে অনেক বেশি। মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে মনে করতে হবেএই মোবাল্লেগ ছাহেবও মাদরাসারই একজন উস্তায। অন্যরা হলেন খাছ কিছু ছাত্রদের উস্তায। আর তিনি হলেন আম-জনতার উস্তায। এটাও মাদরাসার উদ্দেশ্যের মধ্যেই শামিল। বরং পঠন-পাঠন তো এ-ই তাবলীগেরই ভমিকা স্বরূপ। আসল মাকসাদ তো তাবলীগ। যা সমস্ত নবী-রাসূলদের সুন্নত।
হযরত রাহ. আরো বলেনচাঁদা উসুলকারী মুহাসসেল আলাদাভাবেই থাকবে। আর এই মুবাল্লেগ আলাদা থাকবে। মাদরাসা যদি বড় হয়যেমন দেওবন্দ মাদরাসাতাহলে মাদরাসার পক্ষ থেকে প্রতিটি এলাকায় একাধিক মুবাল্লেগ থাকা চাই। হযরত আরো বলেনএটা একটা প্রভাব বিস্তারকারী কার্যকরি ফর্মূলা। মাদরাসার চাঁদা বেশি হওয়ার ব্যাপারে কারো সন্দেহ থাকলে তা বাস্তবায়ন করে পরীক্ষামূলকভাবে  হলেও দেখতে পারেন। যদি কার্যকরি না হয় তবে বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার তো আছেই। -আল ইলমু ওয়াল উলামা পৃ. ১০৬-১০৮
প্রস্তাবের স্বপক্ষে হযরত থানভী রাহ.-এর এই জোরদার বক্তব্য দেখে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করলাম।
আমাদের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব হযরত লাকসামের হুযুর রাহ. আরো একধাপ ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি ভমিকা ও উদ্দেশ্য দুটোকে একসাথে চালিয়ে দেখিয়ে গেছেন। [3]
কাকরাইল মসজিদ ও বিশ্ব ইজতেমার মাঠে ওলামাদের ক্যাম্পে মাত্র কয়েকবার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। বড় সদালাপীআকর্ষণীয় হাসি দিয়ে মানুষের সাথে তিনি কথা বলতেন। হৃদয়ের পুরোটাই শুধু দরদেভরা মনে হত। অনর্গল আরবীতেও কথা বলতে পারতেন এবং বয়ানও করতেন।
আমাদের আলেমদের মধ্যে যাঁরা শুধু তালীমি দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন তাঁদের পক্ষে যদি লাকসামের হুযুরের মত তালীম ও তাবলীগের মধ্যে সফল সমন্বয় করা সম্ভব নাও হয়তবে কমপক্ষে তালীমি দায়িত্বের পাশাপাশি তাবলীগের কাজে সহযোগিতা ও সহমর্মিতা তো আমরা অবশ্যই করতে পারি। হযরত মুফতী ফয়যুল্লাহ ছাহেব রাহ. তাবলীগ জামাতের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একদিনের জন্যেও কোথাও শরীক হয়েছিলেন কি না সন্দেহ আছেকিন্তু মুফতী ছাহেব রাহ. তাঁর লেখনী ও বক্তব্য দ্বারা এই জামাতের পূর্ণ সমর্থনই শুধু করেননিহক জামাত হিসাবে এই কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য সকলকে রীতিমত উদ্বুদ্ধ করে গেছেন।
শায়খুল আরব ওয়াল আযম হযরত সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ. আযাদী আন্দোলনসহ বিভিন্নমুখী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁর স্কন্ধে থাকা সত্তে¡ও হযরতজ্বী মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর ডাকে যে কোনো সময় সাড়া দিতেন। হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর আন্তরিকতা ও লিল্লাহিয়াত দর্শনে তিনি তাঁর শত ব্যস্ততার মাঝেও বড় ভাই ও মুরব্বী হিসাবে দ্বীনের এই প্রচেষ্টার প্রতি পূর্ণ সমর্থন দান করে এর পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা দানে এগিয়ে আসেন।
১৯৩৩ সালে কন্কনে শীতের প্রকোপ উপেক্ষা করে ২০০ জন মেওয়াতী হযরত মাওলানার দাওয়াতে উদ্বুদ্ধ হয়ে দুই মাসের জন্য সময় নিয়ে বের হন। বিভিন্ন এলাকার জন্য কয়েকটি জামাতে তাদের ভাগ করে দেয়া হয়। শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা মাদানী রাহ. দিল্লী জামে মসজিদে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর অনুরোধে এদেরকে বিদায়ী দিক-নির্দেশনা দান করেন। হযরত মাদানী রাহ. ঐ নির্দেশনায় আবেগের সাথে বলেন, ‘আপনারা যে কাজের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তার ফলে বাতেল খতম হয়ে যাবে। ভারতবর্ষ থেকে বৃটিশের শাসন-শোষণের অবসান ঘটবে। দিল্লীর লালকেল্লার ওপরে যে ইন্ডিয়ান জ্যাক পতাকা উড়ছে সে পতাকা পড়ে যাবে।’ হযরত মাদানী রাহ.-এর এ কথা বলার সাথে সাথে কাকতালীয়ভাবে আকস্মিক লালকেল্লার পতাকাটি নিচে পড়ে যায়। জামে মসজিদ লোকে-লোকারণ্য ছিলতারা এই অস্বাভাবিক কারামতি-ব্যাপার দেখে সকলে জোরে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে ওঠে। হযরত মাদানী রাহ. জোরের সাথে ভর্ৎসনা করে বললেনআজকাল লোকেরা সব জোশ-জযবা নারা’ লাগানোর মাঝে শেষ করে দেয়। একটি দ্বীনী আমলের কথা বলছি তা মনযোগ সহকারে শুনুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন। -বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সুর পৃ. ৫৭৮তাবলীগ তাহরীকের সূচনা এবং মূলনীতি পৃ. ২৬,২৭; সীরাতে শাইখুল ইসলামমাওলানা নাজমুদ্দীন এসলাহীকৃত ২য় খণ্ডপৃ. ৪০৭-৪০৮
হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর একান্ত বিশ্বস্ত সহকর্মী হযরত মাওলানা এহতেশামুল হাসান কান্ধলভী রাহ. আল জমিয়ত শায়খুল ইসলাম-এর বিশেষ সংখ্যার ৪৬ পৃষ্ঠায় তাঁর নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যেহযরত মাদানী রাহ.-এর প্রতি হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. অন্তরে যে শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন তা ছিল অতুলনীয়। প্রায়শই তিনি বলতেন, ‘যদি এই তাবলীগি কাজের যিম্মাদারী না থাকত তাহলে হযরত মাদানীর হাতে বাইয়াত হয়ে তাঁর কাজে শরীক হয়ে যেতাম। যদি কখনো কোনো কারণে এই তাবলীগের কাজ ছুটে যায় তখন আমি হযরত মাদানীর নেতৃত্বে কাজ করব। অনুরূপ কখনো কোনো কারণে যদি হযরত মাদানী রাহ. রাজনীতি ছেড়ে দেন তাহলে তখন তিনি এ কাজই করবেন।
দেখুন! হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর দৃঢ়তা কত! হযরত মাদানী রাহ.-এর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ছুটে গেলে তিনি তখন তাবলীগের কাজই করবেন বলে দাবী করছেন। তাই বলছিলামতাবলীগ আসলেও অত্যন্ত গুরুত্ব বহনকারী একটি জরুরি কাজ।
হযরত মাওলানা আব্দুল আযীয (লাকসামের হুযুর) রাহ. যে সমন্বয়ের নমুনা আমাদের সামনে রেখে গেছেন তার রাজপথ ধরে চলা আমাদের জন্য খুব একটা কঠিন কাজ না। আল্লাহ আমাদের সকলকেই তালীম ও তাবলীগের জন্য কবুল করুন। আমীন। 
                                                          ------------------
[1] ১একথা শতভাগ সত্য। কিন্তু তাবলীগ হল তালীমের উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যএকমাত্র উদ্দেশ্য নয়। এছাড়া হেদায়েতের নূর ব্যাপক করার জন্য তাবলীগের মত তালীমেরও ব্যাপক প্রসার ঘটানো দরকার। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে তার বর্তমান অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে তাবলীগের কাজ যতই ব্যাপক করা হোক আসল মাকসাদ হাসিল হবে না। প্রয়োজন হলএর সাথে সাথে প্রত্যেক শ্রেণীর উপযোগী তালীম-তারবিয়াতেরও ব্যবস্থা করা। কারী তায়্যিব ছাহেব রাহ.-এর বক্তব্যের উদ্দেশ্যও এটাই। (আবদুল মালেক)
[2] ২ উবাইদী ছাহেব যীদা মাজদুহুম-এর এ প্রস্তাবনা তো মাদরাসা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে। কাকরাইলে তিনি ঐ প্রস্তাবনা পেশ করতে পারতেনযা হযরত মাওলানা আবদুল হাই পাহাড়পুরী দামাত বারাকাতুহুম সেখানের কোনো মুরব্বীর সামনে পেশ করেছিলেনতিন চিল্লা দিতে আসা ব্যক্তি তৃতীয় চিল্লা অথবা তিন চিল্লার পর চতুর্থ চিল্লা মাদরাসায় লাগাবে। এই চিল্লা সে কুরআন সহীহ করানামাযের মশ্কহালাল হারামের ইলমআল্লাহর হক বান্দার হকের ইলমসহ ফরযে আইন ইলম অর্জনের পিছনে ব্যয় করবেন। (আবদুল মালেক)
[3]তালীমকে শুধু ভমিকা বলা ঠিক নয়তালীম স্বতন্ত্র মাকছদ (উদ্দেশিত বিষয়) এবং প্রত্যেক দ্বীনী কাজের রূহ। (আবদুল মালেক)

মুল লিঙ্কঃ http://www.alkawsar.com/article/1688